যুবলীগ নেতার চাঁদার মুল্লুক, ভারতে বসে অপরাধ সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ!

চাঁদাবাজদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন কারওয়ানবাজারের ব্যবসায়ীরা। কেউ চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে বা প্রতিবাদ করলে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা তুলে নিয়ে যায়। কাউকে কাউকে করা হয় এলাকাছাড়া। চাঁদার টাকা পরিশোধের মাধ্যমে কারও কারও মুক্তি মেলে। চাঁদাবাজরা এতটাই ক্ষমতাধর যে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর, ডিএমপি কমিশনারসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ জানানোর পরও থামছে না তাদের দৌরাত্ম্য।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কারওয়ান বাজারের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছেন ঢাকা মহানগর উত্তরের ২৬ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক লোকমান হোসেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল কারওয়ানবাজারে দাঁড়িয়ে চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িতদের হুশিয়ারি দিয়ে মাস তিন আগে বলেছিলেন, কোনো চাঁদাবাজ কারওয়ানবাজারে থাকতে পারবে না। যারা চাঁদাবাজি করবেন, কারওয়ানবাজার ছেড়ে চলে যাবেন। যে চাঁদাবাজি করবে, তার বিরুদ্ধেই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন হুশিয়ারিও কোনো কাজে আসেনি।

চাঁদাবাজদের আক্রমণের শিকার হয়ে গত ১৪ নভেম্বর মো. শাহাদাত হোসেন সর্দার নামে কারওয়ানবাজারের কিচেন মার্কেটের এক ব্যবসায়ী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর, ডিএমপি কমিশনারসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ জানান। মো. জসিম পাটোয়ারী নামে আরেক ব্যবসায়ীও একই অভিযোগ করেন। চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে তেজগাঁও থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ছাড়াও মৌখিক অভিযোগ জানিয়েছেন ৮ থেকে ১০ ব্যবসায়ী। কিন্তু চাঁদাবাজি বন্ধ হচ্ছে না।

আমাদের সময়ের অনুসন্ধান ও স্থানীয় থানাসহ বিভিন্ন দপ্তরে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের দেওয়া অভিযোগ থেকে জানা যায়, ভারতে বসে কারওয়ানবাজারের অপরাধ সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে শীর্ষসন্ত্রাসী আশিক ওরফে সৌমেন খান। তার হয়ে কাঁচাবাজারকেন্দ্রিক চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে চক্রের অন্যতম সদস্য মো. লোকমান হোসেন। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর ২৬ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং প্রগতি ক্লাবের সহ-সভাপতি।

এ ছাড়াও মিজান, সায়েম, হেলালসহ দেড়শ চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসী এক রকম জিম্মি করে রেখেছে সাধারণ ব্যবসায়ীদের। চক্রটি কারওয়ানবাজারের ১৭ পট্টির ছোট-বড় হাজারো ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রতিমাসে হাতিয়ে নিচ্ছে কমপক্ষে ৭ কোটি টাকা। রাস্তায় ঘাটে-ঘাটে মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতে হয় পণ্যবাহী যানবাহনগুলোকেও। এসব কারণে সবজিসহ অন্য কাঁচামালের দামে সব সময় হেরফের হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে ক্রেতাসাধারণের ওপর। কিন্তু কর্তৃপক্ষ দেখেও না দেখার ভান করে গোপনে চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে ফায়দা লুটছে।

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী শাহাদাত হোসেন সর্দার জানান, অন্তত দেড় শতাধিক সন্ত্রাসীর একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কারওয়ানবাজারে চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত। প্রগতি ক্লাবে বসে এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন স্থানীয় যুবলীগ নেতা লোকমান হোসেন ও তার বাহিনী। সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হান্নানের ভগ্নিপতি আমির চেয়ারম্যান, হান্নানের চাচাতো ভাই তাজু, হান্নানের ভাতিজা শাহীন ও মিন্টু, নাজমুল আলম রনি, হান্নানের সাবেক ফর্মা দাড়িওয়ালা বাশার, শীর্ষ সন্ত্রাসী আলীর ছোট ভাই চাকমা আক্তার, খালেদ রানা, ফাহিম, মো. আলী, সবুজ, নাডা জসিম, টিপু সুলতান, আক্তার, হুমায়ুন, বিএসসি ফারুক, জসিম, আমজাদ হোসেন খান, বাদল ব্যাপারী, কালা মোস্তফা, রাজিব হোসেন জয়, হান্নান, মফিজ মাঝির চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা।

তিনি আরও বলেন, যুবলীগ নেতা লোকমানের ক্যাডাররা গত ৮ আগস্ট তার সন্তানদের অপহরণের হুমকি দিয়ে স্ত্রীর নামে থাকা ১৬১ নম্বর কিচেন মার্কেটের দ্বিতীয় তলার পাইকারি মুদি দোকানটি ২৬ লাখ টাকায় বিক্রি করে। তারা ১৫ লাখ টাকা স্ত্রীকে বুঝিয়ে দিয়ে জোর করে দলিলে স্বাক্ষর নেয়। বাকি ১১ লাখ টাকা ও তার দোকানের বাকি ৩৫ লাখ টাকাসহ ৪৬ লাখ টাকার কিছুই দেয়নি। পরে লোকমানের কাছে টাকা চাইলে এ বিষয়ে বাড়াবাড়ি না করতে হুমকি দেন। গত ১২ নভেম্বর এ বিষয়ে ব্যবসায়ী শাহাদাত হোসেন সর্দার তেজগাঁও থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে গেলে পুলিশ জিডি নেয়নি। উপরন্তু ধমক দিয়ে থানা থেকে বের করে দেন বলে অভিযোগ তার।

সন্ত্রাসীরা তেজগাঁও থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি মো. আব্দুর রশিদ কুট্টির কাঁচামালের আড়তেও হামলা করে তার ব্যবসা বন্ধ করে ১ লাখ টাকা অগ্রিম ও মাসে ৫০ হাজার টাকা ভাড়া হিসেবে চাঁদা দাবি করে। বিষয়টি আব্দুর রশিদ কুট্টি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জানিয়েছেন। ২৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক নুরুন নবীকে কারওয়ানবাজার মসজিদের সামনে মারধর করে তার ব্যবসাস্থল দখল করে নেয় চক্রটি।

শীর্ষ সন্ত্রাসী আশিকের পরিচয়ে ফোন করে খুনের হুমকি দিয়ে অগ্রিম ও মাসিক চাঁদা আদায় করে আসছে তারা। এভাবে কারওয়ানবাজারের ফলপট্টি, ওয়াসাপট্টি, এরশাদপট্টি, সিটি করপোরেশনের সামনে, হোটেল ঝাড়–পট্টি, জুতাপট্টি, আলীপট্টি, রেলওয়েপট্টি, কিচেনপট্টি, মুরগিপট্টি, সুরমাপট্টি, মুড়িপট্টি, একুশে টিভিপট্টি, পেপেপট্টি, লাল বিল্ডিংয়ের পূর্ব ও দক্ষিণ পট্টি, মসজিদপট্টি ছাড়াও কয়েকটি পট্টি থেকে লোকমান বাহিনী অগ্রিম বাবদ প্রায় ৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। প্রতিমাসে ৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করছে লোকমান ও তার ক্যাডার বাহিনী। প্রতিরাতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে কাঁচামাল নিয়ে কারওয়ানবাজারে আসা সহস্রাধিক ট্রাক থেকে ৫০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করে এই চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট।

গত ৩ আগস্ট ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের দপ্তরে কারওয়ানবাজারের ৯১ জন ব্যবসায়ীর নাম-ঠিকানা ও কোন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে মাসিক কত টাকা হারে চাঁদা নেওয়া হয় তা উল্লেখ করে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে একটি অভিযোগ করেন চাঁদাবাজির শিকার ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের কার্যকরী কমিটির সদস্য মো. জসিম পাটোয়ারী।

অভিযোগে বলা হয়, জসিম কাওরানবাজার এরশাদ বিল্ডিংয়ের পশ্চিম-দক্ষিণ পাশে সবজির আড়তের ব্যবসা করেন। তার কাছে ১ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে যুবলীগ নেতা লোকমান। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে চলতি বছরের ১৭ আগস্ট মধ্যরাতে জসিমকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে আড়ত থেকে উঠিয়ে কিচেন মার্কেটের তৃতীয় তলায় লোকমানের অফিসে নেওয়া হয়। ওই টর্চার সেলে জসিমকে নির্যাতন করে তার পরিবারের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। তাকে এক মাসের মধ্যে টাকা দিতে হবে, অন্যথায় প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। টাকা জোগাড় করতে পারেননি তাই ভয়ে দোকানে যেতে সাহস পাচ্ছেন না ওই ব্যবসায়ী।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ডিএমপি কমিশনারের দপ্তরে লিখিত অভিযোগে ব্যবসায়ীরা জানান, কারওয়ানবাজার কিচেন মার্কেটের নিচতলা থেকে তিন তলা পর্যন্ত ৪৫০ দোকান থেকে দোকানপ্রতি মাসে ১ হাজার ১৫০ টাকা করে চাঁদা নেয় লোকমান ও তার বাহিনী। ওয়াসা গলির ব্যবসায়ী সেলিমের কাছ থেকে অগ্রিম নেওয়া হয় ১ লাখ টাকা; মাসে আদায় করা হয় ২৫ হাজার টাকা। এ বিষয়ে সেলিম গত ১৪ অক্টোবর তেজগাঁও থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন, যার নম্বর-৭৭০। ওয়াসা গলির আজিজ অগ্রিম ১ লাখ টাকা দিলেও মাস শেষে জোর করে তার কাছ থেকে আদায় করা হয় আরও ৩৫ হাজার টাকা। আজিজুল এই বিষয়ে গত ২৯ সেপ্টেম্বর তেজগাঁও থানায় একটি জিডি করেন। নম্বর-১৭০৮। এরশাদ বিল্ডিংয়ের পশ্চিম পাশে আবু সাইদের মার্কেটের পূর্বপাশে জনৈক আব্দুর রশিদকে আড়ত দেওয়ার কথা বলে ৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে মারধর করে এলাকাছাড়া করা হয়।

পূর্ব-পশ্চিম কাওরানবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ফারুক প্রধানিয়া বলেন, চাঁদাবাজদের কাছে এক প্রকার জিম্মি কারওয়ানবাজারের সাধারণ ব্যবসায়ীরা। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হুশিয়ারির পর এখন কিছুটা কমেছে তাদের দৌরাত্ম্য। কেউ চাঁদা চাইলেই বিষয়টি জানাতে বলা হয়েছে প্রত্যেক ব্যবসায়ীকে। তার পরও কেউ নীরবে সন্ত্রাসীদের চাঁদা দিলে সে ক্ষেত্রে আমাদের কী-ইবা করার আছে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে গতকাল যুবলীগ নেতা লোকমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) বিপ্লব বিজয় তালুকদার আমাদের সময়কে বলেন, পুলিশি তৎপরতার কারণে বর্তমানে কারওয়ানবাজার এলাকায় চাঁদাবাজি নেই বললেই চলে। গত পরশুদিনও (বুধবার) আমি নিজেই ওই এলাকা পরিদর্শন করেছি; ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেছি। তবে এ বিষয়ে কেউ অভিযোগ তোলেনি। তার পরও কারওয়ানবাজারকেন্দ্রিক চাঁদাবাজির বিষয়ে অভিযোগ পেলে দায়ী যে-ই হোক না কেন, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

Comments

comments