সরকারের বাজার ব্যবস্থাপনা কি ব্যর্থ?

বাংলাদেশে পেঁয়াজের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলার ক্ষেত্রে সরকারের পরিকল্পনা বা বাজার ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি ছিল বলে মনে করছে ক্রেতা অধিকার সংগঠনগুলো।

তারা বলছে, পেঁয়াজ, চাল বা ডালসহ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার পর্যালোচনা করে সঠিক সময়ে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

পেঁয়াজের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করতে অনেক দেরিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে মনে করছে তারা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ক্ষেত্রে সরকারের বাজার ব্যবস্থাপনা ব্যর্থ হয়েছে, যদিও সরকার এ অভিযোগ মানতে রাজি নয়।

এ নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে জোরপূর্বক বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।

কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী যোগান দেয়ার ক্ষেত্রে ‘সতর্কতার কিছুটা অভাব’ তিনি দেখছেন বলে মত দেন তোফায়েল আহমেদ।

পেঁয়াজের দাম নিয়ে বাজার যখন চরম অস্থির, এরই মধ্যে আবার বাড়ছে চালের দাম – যে পরিস্থিতি সমালোচনার মুখে ফেলছে সরকারকেই।

এমন প্রেক্ষাপটে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের বাজারে সরকারের ব্যবস্থাপনায় ঘাটতির অভিযোগ তুলছেন অনেকেই। সরকার কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে, সেই প্রশ্নও আসছে।

তবে ব্যবসায়ী নেতাদের অনেকে বলছেন, মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে কোন পণ্যের চাহিদা এবং যোগানের ওপর তার বাজার নির্ভর করে, সেখানে সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।

কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বা ক্যাব এর সভাপতি গোলাম রহমান বলেছেন, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ঘাটতি পর্যালোচনা করে তাতে যোগান দেয়ার জন্য কর্তৃপক্ষ আগাম পরিকল্পনার মাধ্যমে বাজারে হস্তক্ষেপ করবে। এই ব্যবস্থাপনাতেই ঘাটতি আছে বলে তিনি মনে করেন।

তিনি আরও বলছিলেন, “মুক্তবাজার অর্থনীতি এই নয় যে ব্যবসায়ীর ওপর সব ছেড়ে দেবো, যা হওয়ার তাই হোক, তা তো হতে পারে না। সরকারকে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অবশ্যই রাখতে হবে। “

“শুধু রেফারির ভূমিকা নয়,অনেক সময় সক্রিয় পার্টিসিপেন্ট এর ভূমিকা পালন করতে হবে। পেঁয়াজের ক্ষেত্রে এটা বড় বিলম্বে হয়েছে।”

“মুক্তবাজার অর্থনীতি সঠিক। কিন্তু মার্কেট যদি ফেল করে, তখন সরকারকে ইন্টারভেন করতে হবে, সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে” – বলেন তিনি।

নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের বাজার মনিটরিংয়ের একটা ব্যবস্থাও আছে। সারাদেশে আছে মনিটরিং কমিটি।

কিন্তু সেই মনিটরিং ব্যবস্থার কোন প্রভাব বাজারে নেই বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএস এর নাজনীন আহমেদ বলছিলেন, গুরুত্ব না থাকায় মনিটরিং ব্যবস্থা কোন কাজে আসছে না।

“মনিটরিং ব্যবস্থা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খুব দূর্বল অবস্থায় চলে। যেমন ঢাকার বেশ কয়েকটি বাজারে নিয়মিত দাম মনিটর হওয়ার কথা। এক দিনের থেকে আরেকদিন দাম অস্বাভাবিক হলেই সরকারের ব্যবস্থা নেয়ার কথা। কিন্তু তা হচ্ছে না।”

“সরকারের একটা মজুদ আইনও আছে। এই আইনে বলা আছে, চাল, ডাল বা শস্যের ক্ষেত্রে একজন ব্যবসায়ী কতদিন এবং কি পরিমাণ মজুদ করতে পারবেন। কিন্তু মুশকিলটা হচ্ছে, এই আইন বাস্তবায়নের জন্য জনবল নেই।”

সাবেক বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এখন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

তিনিও মনে করেন, এবার ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করার পর যখন দাম বাড়ছিল, তারও অনেক পরে মিশর বা তুরস্ক থেকে আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এখানে আগাম সতর্কতা ছিল না বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

মি: আহমেদ বাণিজ্য মন্ত্রী থাকার সময়ের তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেছেন, “আমরা যেটা করতাম, ভোজ্য তেল, পেঁয়াজ, রসুন বা আদা সহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের চাহিদা, উৎপাদন এবং কতটা আমদানি করতে হবে, এসব বিষয়ে বছরের প্রথমেই পর্যালোচনা করে পরিকল্পনা নিতাম।”

“সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী যেটার ঘাটতি থাকতো, সেটা আমরা চার পাঁচ মাস আগেই আমদানি শুরু করতাম। তার ইতিবাচক প্রভাব বাজারে পড়তো।”

সরকারের এই ব্যবস্থাপনা কি তাহলে এবার ‘ফেল করেছে’ কিনা – এমন প্রশ্নে তোফায়েল আহমেদের বক্তব্য হচ্ছে, “আমি ফেল বলবো না। আমাদের সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। আমাদের সময় বুঝে ব্যবস্থা নিলে ভাল হতো।”

“যেমন এখন টিসিবি আমদানি করছে এবং আমরা কার্গো বিমানে করে পেঁয়াজ আনতে পারছি। এটা বাজারে এখন ভাল প্রভাব ফেলবে।”

“আমি একটা কথা বলি, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে জোরজবরদস্তি করা ঠিক না। এতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতংক তৈরি হয়। আমরা বড়-ছোট সব ধরণের আমদানিকারক, পাইকারি বা খুচরা বিক্রেতা সবাইকে একসাথে নিয়ে বসে আলোচনা করতাম। তাতে ভাল ফল হতো।”

এদিকে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা পেঁয়াজের এখনকার বাজারকে একটা আকস্মিক পরিস্থিতি হিসেবে বর্ননা করছেন।

নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের বাজার নিয়ে সরকারের ব্যবস্থাপনায় কোন ঘাটতি নেই বলেই তারা দাবি করছেন।

তারা এখন সারাদেশে টিসিবির মাধ্যমে কমদামে পেঁয়াজ বিক্রির বিষয়কে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছেন। বড় বড় কোম্পানিকে দিয়ে ভারত ও মিয়ানমার ছাড়া অন্যান্য দেশ যেমন মিশর, তুরস্ক থেকে পেঁয়াজ আনার পদক্ষেপের কথাও তারা উল্লেখ করছেন।

তবে এই পদক্ষেপগুলো সঠিক সময়ে নেয়া হয়নি এবং সেটাকেই সরকারের ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

সূত্র: বিবিসি

Comments

comments