গাফিলতির বলি এতগুলো প্রাণ!

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মন্দভাগে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন শতাধিক যাত্রী। গতকাল ভোর প্রায় ৩টার দিকে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা আন্তঃনগর তূর্ণা-নিশীথা সিলেট থেকে চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্সপ্রেসের একটি বগিতে প্রচণ্ডগতিতে আঘাত হানে। এতে উদয়নের ওই বগিটি কাগজের মতো দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় আরেকটি বগি। তূর্ণা-নিশীথার ইঞ্জিনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘটনার জন্য তূর্ণা-নিশীথার চালককে দায়ী করছেন সবাই। উদয়ন তূর্ণাকে পাস দিতে পাশের লাইনে সরে যেতে থাকে।

শেষ দিকের ৩টি বগি বাকি থাকতেই ওই ৩ বগির মধ্যেরটিতে আছড়ে পড়ে তূর্ণার ইঞ্জিন। এতে বগিটি দুমড়ে মুচড়ে যায়। এই দুর্ঘটনার পর চট্টগ্রামের সঙ্গে ঢাকা ও সিলেটের ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ৮ ঘণ্টা পর দুপুর ১২টার দিকে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা আন্তঃনগর ট্রেন ঢাকাগামী তূর্ণা-নিশীথা মঙ্গলবার ভোর রাত ২টা ৪৮ মিনিটে শশীদল রেলওয়ে স্টেশন অতিক্রম করে মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশনের দিকে রওনা করে। মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার স্টেশনে প্রবেশের আগেই আউটারে থামার জন্য লালবাতি জ্বালিয়ে সংকেত দেয় তূর্ণা-নিশীথাকে (ট্রেন নম্বর ৭৪১)। অপরদিকে সিলেট থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্সপ্রেস (ট্রেন নম্বর ৭২৪) কসবা রেলওয়ে স্টেশন ছেড়ে মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশনে প্রবেশ পথে স্টেশন মাস্টার তাকে মেইন লাইন ছেড়ে দিয়ে ১ নম্বর লাইনে আসার সংকেত দেন। ওই ট্রেনের ইঞ্জিনসহ ৬টি বগি ১ নম্বর লাইনে প্রবেশ করার পর পেছনের ৩টি বগি মেইন লাইনে থাকতেই তূর্ণা-নিশীথার চালক সিগনাল (সংকেত) অমান্য করে দ্রুত গতিতে এসে ওই ট্রেনের শেষ ৩টি বগির মধ্যেরটিতে আঘাত করে। এতে উদয়ন ট্রেনের তিনটি বগি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই ওই বগির ১০ যাত্রীর মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় বিভিন্ন হাসপাতালে নেয়ার পর মারা যায় আরো ৬ জন। আহত হন আরো একশ’ যাত্রী। কিন্তু ইঞ্জিন ছাড়া তূর্ণা-নিশীথার কোনো ক্ষতি হয়নি। ট্রেনের সব বগি অক্ষত অবস্থায় মেইন লাইনে ছিল। মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার মো. জাকের হোসেন চৌধুরী বলেন, নিশীথা ট্রেনটিকে আউটারে মেইন লাইনে থামার সংকেত দেয়া হয়েছিল। উদয়ন ট্রেনটিকে মেইন লাইন থেকে ১নং লাইনে আসার সংকেত দেয়া হয়েছিল। সেই হিসাবে উদয়ন ট্রেন ১ নম্বর লাইনে প্রবেশ করছিল। এসময় নিশীথা ট্রেনের চালক সংকেত অমান্য করে উদয়ন ট্রেনের উপর উঠে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়।

দুর্ঘটনার পরপরই আশেপাশের লোকজন ছুটে গিয়ে উদ্ধারকাজ শুরু করে। ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন রেলপথমন্ত্রী। তার আগে সেখানে ছুটে আসেন রেলসচিব। ঘটনার খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে উদ্ধার কাজ তদারকি করেন জেলা প্রশাসক হায়াত-উদ- দৌলা খান ও পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আনিসুর রহমান। আখাউড়া ও লাকসাম থেকে উদ্ধারকারী ট্রেন ছুটে আসে দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেন উদ্ধারে। সকাল ৭টা থেকে শুরু হয় উদ্ধারকাজ। এদিকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে মরদেহগুলো স্থানীয় বায়েক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রাখা হয়। এরপরই পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের সদস্যরা নিহতদের হাতের আঙুলের ছাপ নিয়ে তাদের পরিচয় শনাক্ত করার কাজ শুরু করে। খবর পেয়ে তাদের আত্মীয়-স্বজনরা ছুটে আসেন সেখানে। তারাও লাশ শনাক্ত করেন।

নিহতদের মধ্যে ৭ জন পুরুষ, ৬ জন মহিলা ও ৩ জন শিশু
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ৭ জন পুরুষ, ৬ জন মহিলা ও ৩ জন শিশু। তাদের মধ্যে ১৫ জনের লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক। নিহতরা হচ্ছেন- চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের রাজারগাঁও গ্রামের মজিবুর রহমান (৫৫), অজ্ঞাত মহিলা (৩২), হবিগঞ্জ সদরের অজ্ঞাত মহিলা (৪১), অজ্ঞাত মহিলা, হবিগঞ্জ, চুনারুঘাটের সুজন আহমেদ (২৪), হবিগঞ্জ সদরের ইয়াছিন আরাফাত (১২), রিপন মিয়া (২২), মৌলভীবাজার শ্রীমঙ্গলের গাজীপুর গ্রামের জাহেদা খাতুন (৩০), চাঁদপুর হাজীগঞ্জের কুলসুম বেগম (৩০), হবিগঞ্জের মদনমূড়কের আল আমিন (৩০), অজ্ঞাতনামা শিশু (৪), হবিগঞ্জ পৌরসভার আলী মোহাম্মদ ইউসুফ (৩২), হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ের আদিবা (২) ও সোহামনি (৩), নোয়াখালী মসজিদপাড়ার রবি হরিজন (২৫) ও চাঁদপুরের ফারজানা (১৫)।

আহত যারা: আশুগঞ্জের তারুয়ার শুভ (৪৫), আখাউড়া গোলখারের বোরহান (১৭), চাঁদপুরের মাহিমা (৪), সিলেট বালাগঞ্জের রুবেল (৩৫), হবিগঞ্জের আলমগীর (৪০), নবীগঞ্জ মাঠবাজারের লোকমান (২২), আফসা (১৪), আসমা (২৪), ১ বছর বয়সী শিশু ওহাল, হবিগঞ্জ বলুলার আলমগীর (৪৩), বানিয়াচংয়ের আশিক মিয়া (৩২), সুব্রত (৪৫), মিম (৭), নাজমা (৩০), রেনু, চুনারুঘাটের রাজন (২৮), মাধবপুরের আনোয়ারা (৩৩), হবিগঞ্জ সৈয়দপুরের রায়হান (২০), বাগলখাল গ্রামের ধলাই (৬৫), খালিশপুর গ্রামের রাকিব (২৮), দীঘলবাঁশ গ্রামের হাসান আলী (৭০), নারায়ণপুর গ্রামের আবুল কালাম (৫২), চুনারঘাটের জনি (২৪), সিলেট জৈন্তাপুরের আক্তার আলী (৬০), শ্রীমঙ্গল গাজীপুরের ইমন (১৮), সুমি (২১), কুমিল্লা দাউদকান্দির বোরহান (৪০), মনির (৪০), মঈন (৩৫), ব্রাহ্মণবাড়িয়া ধোপখলার বৃষ্টি (১৪), বাকাইলের শাহবুদ্দিন (৫০), উত্তর কালিসীমার মিতু (২৫), সাহিদা (৪০), আখাউড়ার সুরাইয়া (২৬), নোয়াখালী মাইঝদির নারায়ণপুর গ্রামের তারা সুরাইয়া (৩০), চাঁদপুর সাতরাশি গ্রামের রহিমা (৪৫), কুমিল্লা চৌদ্দগ্রামের আবুল কাশেম (৪০), ঢাকা গাজীপুরের ইমন (১৮), নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের সৈকত (৩৫), আখাউড়া ধরখারের লিটন (৪২), নোয়াখালীর সোনাপুর গ্রামের অলিউল্লাহ (৩৬)। এ ছাড়াও কুমিল্লা হাসপাতালে ১৩ জন, কসবা ও আখাউড়া হাসপাতালে ৪ জন আহত ভর্তি হন।

এদিকে নিহতদের প্রত্যেককে রেল মন্ত্রণালয় ১ লাখ টাকা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসন ২৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেয়। আহতদের উদ্ধার করে জেলা সদর হাসপাতাল, কসবা, আখাউড়া ও কুমিল্লা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জন মো. শাহআলম জানান, জেলা সদর হাসপাতালে ৪৪ জন, কসবা ও আখাউড়ায় ৪ জন এবং কুমিল্লা হাসপাতালে ১৩ জনকে ভর্তি করা হয়। তাদের মধ্যে গুরুতর আহত ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতাল থেকে ৩ জনকে ঢাকায় পাঠানো হয়। জেলা সদর হাসপাতালে মৃত্যু হয় ২ জনের।

কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কে.এম হুমায়ুন কবির জানান, কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তিনজন মারা গেছে। তারা ২৯ জনকে চিকিৎসা দিয়েছেন। তাদের মধ্যে দুই-তিনজন ছাড়া বেশির ভাগই গুরুতর আহত।

এদিকে রেলপথ মন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এসময় মন্ত্রী জানান, তাৎক্ষণিকভাবে তূর্ণা-নিশীথার লোকোমোটিভ মাস্টার ও সহকারী মাস্টারকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, এখানে উদয়ন এক্সপ্রেসের কোনো ত্রুটি দেখছি না। রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে ১ লাখ টাকা করে দেয়ার ঘোষণা দেন তিনি। ঘটনার তদন্তে রেলওয়ে ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। রেল সচিব মোহাম্মদ মোফাজ্জল হোসেন তার আগেই ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তিনি সাংবাদিকদের জানান, রেলওয়ের পক্ষ থেকে ২টি ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১টি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। রেলের দু’টি কমিটির একটিতে প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী (পূর্বাঞ্চল) মিজানুর রহমানকে প্রধান করে ৪ সদস্যের একটি, চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা নাসির উদ্দিনকে প্রধান করে ৪ সদস্যের আরেকটি কমিটি এবং জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিতু মরিয়মকে প্রধান করে ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এদিকে প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও উদ্ধারকাজে সহায়তা করে। উপজেলা চেয়ারম্যান এডভোকেট রাশেদুল কায়সার ভুঁইয়া জীবন বলেন, দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে উদ্ধার কাজ করি এবং উভয় ট্রেনের যাত্রীদের জন্য খাবার ও তাদের গন্তব্যে যাওয়ার ব্যবস্থা করি।

Comments

comments