এবারও বুক পেতে প্রাকৃতিক ঢাল সুন্দরবন রক্ষা করলো উপকুলবাসীকে

সিডর, আইলা রোয়ানু, নার্গিস, ফণির মতো ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের ছোবল বুক পেতে প্রাকৃতিক ঢাল সুন্দরবন রক্ষা করলো উপকুলবাসীকে। খুলনার কয়রার তসলি উদ্দীন ও মংলার জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলার ব্যবস্থাপনা আমাদের খুবই দুর্বল, পাশে সুন্দরবন ছিল বলে রক্ষা। প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে ঝড় জলোচ্ছ্বাস বুক পেতে সামাল দেয়। এবারও তাই হয়েছে। আল্লাহর রহমতে বড় ধরণের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি এবার। অথচ এই সুন্দরবনকে রক্ষা নয়, নানাভাবে ক্ষতি করা হচ্ছে।

সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট উপকুলবাসী, বন বিভাগ ও আবহাওয়া দপ্তরের সূত্র জানায়, অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ বঙ্গোপসাগর দিয়ে মূলত বাংলাদেশের স্থলভাগে প্রবেশ করে। প্রবেশের সময় ঘূর্ণিঝড়ের একপাশে ছিল পশ্চিমবঙ্গ, তিনপাশে ছিল সুন্দরবন। সুন্দরবন অতিক্রম করতে ঘূর্ণিঝড়ের দীর্ঘসময় লাগে ও গতি কমে আসে। ফলে পূর্ণ শক্তি নিয়ে বুলবুল বাংলাদেশের স্থলভাগে আঘাত করতে পারেনি।

সূত্রমতে, সুন্দরবনের স্থলভাগ অতিক্রমের সময় বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ শক্তি হারিয়ে ফেলে। শুধু এবার নয়, প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সুন্দরবন ১৯৭০ সালের ভয়াল ঘুর্ণিঝড় হেরিকেন থেকে শুরু করে সিডর, আইলা ও রোয়ানুসহ ছোট বড় ঝড় ও জলোচ্ছাসসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করেছে বিশাল এলাকার উপকুলীয় জনপদকে। অথচ সুন্দরবন রক্ষায় জোরদার পদক্ষেপ নেই। উপরন্তু নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সুন্দরবন।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীদের তথ্য, ভারত আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে গায়ের জোরে উজান থেকে অভিন্ন নদ-নদীর পানি না দেওয়ায় মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিশ্বঐতিহ্য সুন্দরবন। বঙ্গোপসাগরের কূল ঘেঁষে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা সুন্দরবন পৃৃথিবীর অনন্য সম্পদ। মাকড়াসার জালের মতো ছোট-বড় অসংখ্য নদ-নদীতে বৈষ্টিত সুন্দরবন। ৪শ’৫০টির বেশি ছোট-বড় নদী রয়েছে এই বনকে ঘিরে। সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর সুন্দরবনের জীববৈচিত্র। উজানে পানি প্রবাহ কমে যাওয়া ও পলি বৃদ্ধি, গভীরতা হ্রাসে তিন দশকের ব্যবধানে সুন্দরবনের অধিকাংশ নদ-নদী জৌলুস হারিয়েছে। বঙ্গোপসাগরের সাথে যুক্ত সুন্দরবনের নদ-নদীর পানির প্রবল নেই বললেই চলে। স্রোতহীন নদ-নদীর কারণে সমুদ্র হয়ে উঠছে উত্তপ্ত।

সুত্রমতে, সুন্দরবনের বনভূমি এখন বিপদের সন্মুখীন। উদ্ভিদ জীব-বৈচিত্র, পরিবেশ ও উপকূলীয় অঞ্চল চরম হুমকিতে পড়েছে। আর এসব নদ-নদীতে রয়েছে হরেকরকম মাছের সমাহার। মৎস্যসম্পদের অফুরন্ত ভান্ডার সুন্দরবনের নদ-নদী। নদী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট মহল থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, ভারত আন্তর্জাতিক আইন লংঘন করে অভিন্ন নদীর পানি প্রত্যাহার সুন্দরবনের মূল ৬টি নদী শিবসা, পশুর, খোলপেটুয়া, কালিন্দি, বলেশ্বর, মালঞ্চ দিয়ে নদ-নদীর পানি বঙ্গোপসাগরে পড়ার স্বাভাবিক ধারা হয়েছে অস্বাভাবিক। রায়মঙ্গল ও আড়পাঙ্গাসিয়া নদীসহ ছোট-বড় অসংখ্য খাল ও নালা রয়েছে সুন্দরবনে।

স্রোতহীন নদ-নদীর পানি একরকম চুইয়ে পড়ার মতো অবস্থার কারণে লবণাক্ততা গ্রাস করছে নতুন নতুন এলাকা। ভূমি গঠনেরও পরিবর্তন ঘটছে। সুন্দরবনে বনজ ও জলজ প্রাণী এবং নানা প্রজাতির পাখির কলতান দিনে দিনে কমছে। সুন্দরী. গেওয়া, শাল, কেওড়া, বাইন, কাকড়া, পশুর, ধন্দুল ও গোলপাতাসহ উপকুলীয় সবুজ বেষ্টনী গ্রীন বেল্টও হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত।

এক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, “হিমালয়ের প্রাকৃতিক পরিবেশের অবনতি বা ‘গ্রিন হাউস” এর কারণে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। উপকূল বরাবর সুন্দরবনের গঠন প্রকৃতি বহুমাত্রিক উপাদানে প্রভাবিত। যাদের মধ্যে রয়েছে, স্রোতের গতি, ব্যষ্টিক ও সমষ্টিক স্রোত চক্র এবং সমুদ্র উপকূলবর্তী দীর্ঘ সমুদ্রতটের স্রোত। মিষ্টি পানির প্রবাহ হ্রাস, বনের অভ্যন্তরে নদ-নদীতে পলির আধিক্য, পুষ্টি সরবরাহ হ্রাস, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটা বাঁধাগ্রস্ত এবং জলাবদ্ধতা, জলোচ্ছ্বাসসহ নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এ রোগ ছড়িয়ে পড়ছে।

Comments

comments