নতুন সড়ক আইন কার্যকর হলেও প্রয়োগ পুরোনো আইন

এক বছর আগে নতুন সড়ক পরিবহন আইন প্রণীত হলেও পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের বাধার মুখে তা বাস্তবায়ন করেনি সরকার। তবে ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হলো ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’। যদিও আইনটি সম্পর্কে খোদ প্রয়োগকারী সংস্থা, জনসাধারণ ও পরিবহন চালক-হেলপার কিংবা পথচারীর নেই বিশেষ ধারণা।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ বলছে, নতুন সড়ক পরিবহন আইন আজ থেকে কার্যকর হলেও প্রয়োগ হবে পুরাতন আইনই। পর্যায়ক্রমে সহনীয় মাত্রায় নতুন আইনটি প্রয়োগ শুরু হবে। তার আগে প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের আইনটি সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা ও বিশেষ করে যাদের জন্য আইন অর্থাৎ পথচারী, চালক ও হেলপারদের মোটিভেশন করা হবে।

অন্য দেশের তুলনায় আইনটি বেশ কঠিন। আইনটি প্রয়োগের আগে উচিত ছিল সড়ক ও পরিবহন অবকাঠামো ঢেলে সাজানো

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ২২ অক্টোবর আইনটি কার্যকরের তারিখ ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করে সরকার। নতুন আইনে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত রাজধানীর শেরেবাংলা নগর, বিজয় সরণি, তেজগাঁও এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পথচারীরা ফুটপাত ও সড়কে হাঁটছেন, সড়কে যানবাহন চলাচল করছে আগের মতোই। যদিও ছুটির দিন হওয়ায় সড়কে যানবাহনের চাপ কম।

মাঠ পর্যায়ের ট্রাফিক কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন আইন আজ থেকে কার্যকর হলেও প্রয়োগ করা হচ্ছে না। প্রয়োগ হচ্ছে পুরাতন আইন।

বিজয় সরণি এলাকার দ্বায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট মো. শফিউল্লাহ বলেন, আমরা নতুন আইনটি প্রয়োগের আগে এ সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছি, আইনের কোন ধারায় কোন অপরাধে কী শাস্তি বা জরিমানা হতে পারে। অর্থাৎ মোটিভেশনাল কার্যক্রম চালাচ্ছি। যাতে আইনটি সম্পর্কে কারো নেতিবাচক কিংবা জানতেন না এমন অজুহাত তৈরি হয়। অচিরেই আইনটি প্রয়োগ করা হবে।

নতুন আইন একেবারে চাপিয়ে দেয়া হবে না। পর্যায়ক্রমে আইনটি সহনীয় মাত্রায় প্রয়োগ হবে। আপাতত কাজ চলবে পুরোনো আইনে

আইনটি যুগোপযোগী কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আইনটি অবশ্যই যুগোপযোগী। আইনটি বাস্তবায়ন হলে অবশ্যই সড়কে আগের তুলনায় গতি বাড়বে, শৃঙ্খলা ফিরবে।

বিজয় সরণি এলাকায় কথা হয় এক মোটরসাইকেল চালকের সঙ্গে। তিনি বলেন, নতুন আইনটি খুব ভালো শুনতেছি। আইনটি প্রয়োগ হলে জীবনের নিরাপত্তা বাড়বে, সড়ক শৃঙ্খল হবে। তবে কিছুক্ষেত্রে আইনটি বেশি কঠোর উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো কারণে আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকা সত্ত্বেও যদি কাছে না থাকার কারণে জেল বা জরিমানা গুণতে হয় তাহলে তা খুব দুঃখজনক। এক্ষেত্রে ডিজিটালাইডজ করা কিংবা কনসিডারের বিকল্প পন্থা থাকা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

অ্যাপভিত্তিক মোটরসাইকেল চালান মেহেদুল ইসলাম। তিনি বলেন, এ আইন প্রয়োগ হলে কোনো চালক আর গাড়ি চালাতে চাইবে না। কারণ একজন পথচারী যদি তার নিজের দোষে যানবাহনের নিচে পড়ে যায়, হঠাৎ দৌড় দেয়ার ফলে দুর্ঘটনার শিকার হয় তাহলে এর দায় তো ওই পরিবহন চালকের হতে পারে না। এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই সংশোধনী জরুরি। তাছাড়া যারা গরীব চালক বা হেলপার তাদের ক্ষেত্রে তো জরিমানা কিংবা জেল উভয়টাই বেশি। পথচারীদের জন্য এ আইনটা বেশি প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তবে অপরাধী হলে আইন প্রয়োগে কোনো সমস্যা নেই বলে মনে করেন তিনি।

আইনটি যুগোপযোগী। এটি বাস্তবায়ন হলে অবশ্যই সড়কে আগের তুলনায় গতি বাড়বে, শৃঙ্খলা ফিরবে

মাসুম নামে এক কাভার্ডভ্যান চালক নতুন আইনটিকে খুব ভালো হিসেবে উল্লেখ করলেও আইনটি সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই বলে জানান। তিনি বলেন, আমি ৩০ বছর ধরে ড্রাইভিং করি। মুর্খ মানুষ। আইন কানুনের ধারণা কম। আইন যাই হোক আমাদের জন্য ভালো হলে সমস্যা নাই।

পাঠাও চালক সুমন খান বলেন, ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকা, হেলমেট থাকার সুযোগ তো পুলিশ নিতেই পারে। তাছাড়া পুলিশ যখন তখন বিনা ওয়ারেন্টে এরেস্ট করার কথা শুনতেছি। তাহলে তো আইনটা বেশি কঠোর। নতুন আইন করবেন কিন্তু নতুন সড়ক করবেন না, সড়ক কিংবা পারিপার্শ্বিক সব কিছুই নিয়ন্ত্রণ ও নতুনত্ব আনতে হবে। তাহলেই এ আইনটি সফল হতে পারে নতুবা এমন আইন আমাদের জন্য নয়।

মোটরযান মালিক, শ্রমিক, পথচারীসহ সকল অংশীজনকে ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ এর একাদশ অধ্যায়ে বর্ণিত অপরাধ, বিচার ও দণ্ডের বিষয়গুলো জেনে তা মেনে চলার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।

আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানা সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা। এছাড়া বিভিন্ন অপরাধে জেল-জরিমানার সঙ্গে চালকের পয়েন্ট কাটা হবে।

নতুন আইন কার্যকর হলেও যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) পরিচালক (রোড সেফটি) শেখ মো. মাহবুব-ই-রববানী বলেন, নতুন এ আইন একেবারে চাপিয়ে দেয়া হবে না। কারণ আগের আইনের সঙ্গে নতুন আইনের অনেক পার্থক্য রয়েছে। হঠাৎ করে নতুন আইন চাপিয়ে এমন কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হবে না যাতে গাড়ি-ঘোড়া চলাচল বন্ধ হয়ে জনভোগান্তি তৈরি করে। তবে পর্যায়ক্রমে নতুন আইনটি সহনীয় মাত্রায় প্রয়োগ করা হবে। আপাতত কাজ চলবে পুরোনো আইনে।

‘নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)’ সংগঠনের চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, নতুন এ আইনের বিষয়গুলো প্রচার ছাড়া বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। প্রচার করতে হবে। ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। তবেই সফলতা আসবে।

বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের (ট্রান্সপোর্টেশন অ্যান্ড ট্রাফিক সিস্টেম এক্সপোর্ট) প্রফেসর ড. মো. মিজানুর রহমান বলেন, আইনের বিধিগুলো কী, নতুন আইনে জরিমানা কী ধরনের, কী ধরনের শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে সেগুলো সম্পর্কে আগে ধারণা রাখতে হবে। তাছাড়া কমন স্পেসগুলো খুঁজে বের করা, কোথায় কোথায় বেশি ভুলক্রটি চালক ও পথচারীরা করে তা খুঁজে বের করতে হবে। কোন আইনটা বেশি প্রয়োগ হতে পারে তা শনাক্ত করে সরকারের স্টোকহোল্ডারদের শেয়ার করা উচিত।

তিনি বলেন, অন্য দেশের তুলনায় আমাদের এ আইন বেশ কঠিন। এ আইনটি প্রয়োগের আগে উচিত ছিল আমাদের সড়ক ও পরিবহন অবকাঠামো ঢেলে সাজানো।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, আমাদের ট্রাফিক বিভাগে জনবল বাড়াতে হবে। যে জনবল আছে তাদের নতুন আইন সম্পর্কে প্রশিক্ষিত করতে ট্রেইনাপ করা হবে। তাছাড়া নতুন আইনটির সফল প্রয়োগের ক্ষেত্রে পথচারী, পরিবহন চালক হেলপারসহ সকল অংশীজনের সহযোগিতা প্রয়োজন।

ট্রাফিক উত্তর বিভাগের তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সার্জেন্ট বলেন, আগের আইনের সঙ্গে ট্রাফিকের পজ মেশিনসহ অন্য বিষয়গুলোর মিল ছিল। নতুন আইন বাস্তবায়ন হলেও মেশিনগুলো আপডেট হয়নি। তাই যদি কোনো মামলা হয় সেগুলো কাগজে করা হচ্ছে। পজ মেশিনসহ অন্য বিষয়গুলো আপডেট হলে নতুন আইনে কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হয়। নতুন আইন সারা দেশের জন্য হলেও রাজধানীতে এটি সুচারুভাবে বস্তবায়ন করা হবে বলে জানান তিনি।

সূত্র: জাগো নিউজ

Comments

comments