সীমান্ত দিয়ে যাচ্ছে রসুন-মটরশুঁটি আসছে মাদক

সিলেটের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার চোরাই পণ্য আনা-নেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাচ্ছে মটরশুঁটি, মসুর ডাল, ছানার ডাল ও রসুন। আর ভারত থেকে চোরা কারবারিরা নিয়ে আসছেন ভারতীয় মদ, ফেনসিডিল, ইয়াবা, সুপারি ও গরু।

সবচেয়ে বেশি চোরাচালান হচ্ছে জেলার জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট, জকিগঞ্জ ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার অন্তত অর্ধশতাধিক স্পট দিয়ে। এর মধ্যে জৈন্তাপুর ও কানাইঘাট সীমান্ত এলাকা থেকে মাঝে মধ্যে ভারতীয় গরু ও সুপারি এবং বাংলাদেশি মটরশুঁটি জব্দ করে বিজিবি। পণ্য জব্দ করলেও এর সঙ্গে জড়িত কোনো চোরাকারবারিকে আটক করতে পারেনি তারা। অভিযোগ রয়েছে বিজিবির অসাধু কিছু সদস্যের মাধ্যমে অভিযানের খবর আগেই চলে যায় চোরাকারবারিদের কাছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, দিন গড়িয়ে রাত হলেই বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ)-এর যৌথ টহল এড়িয়ে একাধিক চোরাই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সিলেটের বিভিন্ন সীমান্ত পথ দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে ঢুকে গরু, মদ, ফেনসিডিল, নাসির বিড়ি, ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন, অস্ত্র, মোটরবাইকসহ বিভিন্ন পণ্য।

এদিকে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগে রাতের বেলায় চোরাকারবারিরা এসব চোরাচালান দেশে আনলেও বর্তমানে বাংলাদেশি পণ্যের বিনিময়ে দিনের বেলাও দেশে ঢুকছে বড় বড় চোরাচালান।

সীমান্ত এলাকার একাধিক ব্যক্তি জানান, ভারতের অঙ্গ রাজ্য মেঘালয়, আসামসহ আশপাশের এলাকায় রসুনের দাম তুলনামূলক বেশি। তাই চীন থেকে বাংলাদেশে আনা রসুন, মটরশুঁটি, মসুর ডাল, ছানার ডাল, ডিজেল, সার, সিলিন্ডার গ্যাস, প্লাস্টিক, স্বর্ণের বার ও বাংলাদেশি মুদ্রা চোরাইপথে পাচার হচ্ছে অধিক মুনাফার লোভে। দিনদুপুরে ট্রাক ভরে রসুন পৌঁছাচ্ছে চোরাকারবারিদের আস্তানায়। সেখান থেকে পাচার করা হচ্ছে ভারতে। জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও কানাইঘাট সীমান্তে দিন-কিংবা রাতে সমান তালে এসব পণ্য সামগ্রী আদান-প্রদান হচ্ছে।

তারা জানান, সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার বিছানাকান্দি, জাফলং জিরো পয়েন্ট, সংগ্রাম সীমান্ত ফাঁড়ি, সেনাটিলা, উদ্ভিদ সংঘ নিরোধ কেন্দ্র, তামাবিল, নলজুরী এবং জৈন্তাপুর উপজেলার খাসি নদী, আলু বাগান, মোকামপুঞ্জি, শ্রীপুর, মিনাটিলা, ছাগল খাউরী নদী, কাঠাঁলবাড়ি, কেন্দ্রিরহাওর, কেন্দ্রীবিল, ডিবিরহাওর, ডিবির হাওর (আসামপাড়া), ঘিলাতৈল, ফুলবাড়ি, টিপরাখলা, কমলাবাড়ি, গুয়াবাড়ি, বাইরাখেল, হর্নি, কালিঞ্জী, ময়না, জালিয়াখলা, লালাখাল, জঙ্গিবিল, বাঘছড়া, তুমইর, বালিদাঁড়া, ইয়াংরাজা, সিঙ্গারীরপাড়, জকিগঞ্জের টিপাইমুখ, কোম্পানীগঞ্জের কালাইরাগ, উৎমা, সাদাপাথর বাংলাদেশ থেকে ভারতে এবং ভারত থেকে বাংলাদেশে চোরাইপথে পাচার হচ্ছে বিভিন্ন ধরণের পণ্য।

জৈন্তাপুর উপজেলার বাসিন্দা এক প্রবীণ স্কুলশিক্ষক বলেন, আগে শুনতাম গভীর রাত হলে কিছু সংখ্যক ব্যক্তি সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে চোরাইপথে পণ্য সামগ্রী আদান-প্রদান করতো। তারা খাদ্য দ্রব্যের বিনিময়ে খাদ্য দ্রব্য বাংলাদেশে নিয়ে আসতো। তার মধ্যে সীমান্তরক্ষী বাহিনী এসব মালামাল আটক করে বিভিন্ন চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতো। কখনও নির্দিধায় ভারত থেকে মদ ও মাদক সামগ্রী বাংলাদেশে নিয়ে আসতে পারতো না। যদি কখনও এসব মাদকদ্রব্য বাংলাদেশে নিয়ে আসতো তাহলে অন্য চেরাকারবারিরা ওদের প্রতিহত করতো। বর্তমানে বাংলাদেশি পণ্যের বিনিময়ে ভারত থেকে মাদক দ্রব্য বাংলাদেশে প্রবেশ করাচ্ছে চোরাকারবারিরা যা যুব সমাজকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চোরাই পণ্য পরিবহনকারী কয়েকজন ট্রাকচালক বলেন, পেটের দায়ে আমরা চোরাইপণ্য সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে দিয়ে নিয়ে আসি। অনেক সময় কার্টন কার্টন ভারতীয় সিগারেট, বিড়ি, চা-পাতা, সুপারি, কসমেটিকসের চালান নিয়ে বাংলাদেশে আসি। এসব পণ্য সামগ্রী আদান-প্রদান করার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি।

তারা আরও বলেন, বিজিবির লাইনম্যানের সঙ্গে পণ্যের মালিকদের এক ধরনের লেনদেন থাকায় এসব পণ্য আদান -প্রদানেকোনো ঝামেলা হয় না। মাঝে মধ্যে কেউ লাইন ম্যানেজ না করলে সেই পণ্য আটকা পড়ে বলে শুনেছি, আমরা কখনও আটকা পড়িনি।

মাদক সামগ্রীর বিষয় জানতে চাইলে তারা বলেন, কার্টনের ভেতরে কী থাকে আমরা কখনও দেখিনি। কারণ সময় খুব কম থাকে। দ্রুত নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দিতে হয়। তবে বেশির ভাগ সময়ে গরুর চালান প্রবেশ করে বলে তারা জানান।

এ বিষেয়ে বিজিবি ১৯ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল আবু সাঈদ বলেন, সীমান্তে বিজিবি নিয়মিত অভিযান পরিচালনা অব্যাহত রেখেছে। আমরাও বিভিন্ন অভিযানে গরু, সুপারি ও মটরশুঁটি জব্দ করছি।

লাইনম্যান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিজিবির কোনো লাইনম্যান বা সোর্স নেই। আমাদের নামে কেউ আর্থিক লেনদেন করলে তথ্য দিন বিজিবি ব্যবস্থা নেবে। তবে কখনো এ ধরণের অভিযোগ বিজিবির কাছে আসেনি। চোরাচালন বন্ধে বিজিবি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

Comments

comments