খুশির বেলুন ডেকে আনল ৬ শিশুর ভয়ংকর মৃত্যু

খুশির গ্যাস বেলুন ঘিরে আনন্দে জড়ো হয়েছিল শিশুরা। সেই বেলুনই ডেকে আনল ৬ শিশুর ভয়ংকর মৃত্যু।

রাজধানীর রূপনগরে বেলুন ফোলানোর কাজে ব্যবহৃত একটি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ৬ শিশু নিহত হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ১৬ জন, যাদের অধিকাংশই শিশু।

বুধবার বিকেল পৌনে চারটার দিকে রূপনগর শিয়ালবাড়ি এলাকার ১১ নম্বর রোডে ফজর মাতবর গলির মুখে এই দুর্ঘটনা ঘটে।

পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহতের স্বজনরা জানান, অনেক শিশু ভিড় করেছিল ভ্যানে রাখা গ্যাস সিলিন্ডার ও ফুলানো বেলুন ঘিরে। নিম্ন আয়ের এসব শিশুর কেউ কেউ বেলুন ফোলানো দেখছিল। কেউ কেউ কেনার জন্য দাঁড়িয়েছিল। বেলুন বিক্রেতা গ্যাসের সহায়তায় বেলুন ফোলানোর কাজে ব্যস্ত ছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দে সিলিন্ডারটির বিস্ফোরণ ঘটে এবং আগুন ধরে যায়। কালো ধোয়ায় পুরো এলাকা ছেয়ে যায়। আহত শিশু, নারী ও পুরুষের আর্ত চিৎকারে সেখানকার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। বেশির ভাগ শিশুর রক্ত মাখা ছিন্নভিন্ন দেহ বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়েছিল।

রূপনগর থানার পরিদর্শক দীপক কুমার দাস ৬ শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্তের পর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। নিহতরা হলো- শাহিন (১০), নূপুর (৭), ফারজানা (৯), জান্নাত (১৪), রমজান (৮) ও রিয়া (১০)। প্রথম পাঁচজন বিস্ফোরণের পর ঘটনাস্থলেই মারা যায়। রিয়া সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সন্ধ্যার পর‍্ মারা যায়।

একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, বিস্ফোরিত সিলিন্ডারের টুকরা অংশ চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিল। কয়েকজন শিশু রক্তাক্ত অবস্থায় পড়েছিল। কারও কারও শরীরের মাস-পিণ্ড ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ছিন্ন ভিন্ন হয়ে পড়েছিল। ঘটাস্থলের কিছু জায়গা জুড়ে রক্ত ছড়িয়েছিল।

বিস্ফোরণের পরপরই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এরপর স্থানীয় ও আশপাশের লোকজন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। বিস্ফোরণের কিছুক্ষণ পর পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার তৎপরতা চালান।

ঢাকা মহানগর পুলিশের পল্লবী জোনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার এস এম শামীম জানান, বিস্ফোরণের পর ঘটনাস্থলেই পাঁচ শিশু নিহত হয়েছে। এছাড়া অনেক শিশু ও বয়স্ক নারী-পুরুষকে উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি বেলুন ফুলানোর কাজে ব্যবহৃত গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে এই হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের পাশাপাশি বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। বিস্ফোরণে কারণ জানতে তদন্ত হচ্ছে।

আহত বায়জিদের খালু নজরুল ইসলাম জানান, মাদবরের বস্তিতে একটি গলিতে ভ্যানে করে সিলিন্ডার থেকে বেলুন ফুলিয়ে বিক্রি করছিল। এই বাচ্চারা ওই বেলুনের আশপাশ দিয়েই ঘোরাঘুরি করছিল। তখনই ভ্যানে থাকা সিলিন্ডারটি বিস্ফোরণ হয়। এতে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে।

বেলুনে গ্যাস ভরার সময় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আশপাশে থাকা আরও ৭ শিশুসহ ১৬ জন আহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই শিশু। তাদের মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ১৪ জন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ২ জনকে ভর্তি করা হয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় একাধিক ক্লিনিকেও বেশ কয়েকজনকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

আহতদের মধ্যে অন্তত ৪-৫ জন শিশুর অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন ঢামেক জরুরি বিভাগের চিকিৎসক আলাউদ্দিন।

যারা আহত হয়েছেন: গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আহতদের মধ্যে যাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে তারা হলো- মুস্তাকিম (৯), জামিলা (৭), তানিয়া (৭), জান্নাতি (২৫), মোরসালিন (১০), অজ্ঞাত শিশু (৫)। এরই মধ্যে গৃহকর্মী জান্নাতির হাত উড়ে গেছে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে। তার জন্য জরুরি ভিত্তিতে ও পজিটিভ রক্ত খুঁজছিলেন স্বজনরা। আরও যারা আহত হয়েছে তারা হলো- আজুফা(৭), মীম (৮), বায়জিদ (১০), সিয়াম (১১), রাকিব (১০), নিহাদ (৮), জনি (৯), মজিানুর রহমান (৬) রিকশা চালক জুয়েল (২৯) ও সোহেল (২৫)।

আহত মিজানের বাবা পেশায় স্কুল ভ্যানচালক রোকন মিয়া। তিনি বলেন, তার দুই ছেলে বাসায় ছিল। মিজান স্থানীয় প্রতিভা স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। স্কুলের পড়া শেষ করে কোচিংয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে থেকে বাসায় ফেরার পথে বিস্ফোরণের শিকার হন। বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজির পর ঢামেকের অপারেশন থিয়েটারে তার ছেলেকে শনাক্ত করেন।

আহত জান্নাতির দেবর মণির হোসেন বলেন, তার বড় ভাই নজরুল ইসলামের স্ত্রী জান্নাতি অন্যের বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করেন। এক ছেলেসহ শিয়ালবাড়ি ১২ নম্বর রোডের একটি বাসয় ভাড়া থাকেন তারা। বিকেলে বাসা থেকে ৬ নম্বর রোডে যান বাজার করতে। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে ফেরার পথেই বিস্ফোরণে জান্নাতির একটি হাত উড়ে যায়।

আহত জনির মা পারভিন আক্তার বলেন, তারা মণিপুর স্কুলের পাশেই থাকেন। বিকেলে জনি বাসা থেকে খেলতে বের হয়েছিল, কিছুক্ষণ পরেই তারা বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল যারা: সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া জানান, এক নারী ও তিন শিশুসহ চারজনকে মৃত অবস্থায় এ হাসপাতালে আনা হয়। আহতদের মধ্যে প্রথমে চারজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। যে দুজনকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, তারা শঙ্কামুক্ত বলে জানিয়েছেন তিনি।

নিহত নূপুরের খালা জানান, তার বোনের মেয়ে বাবার কাছে বেলুন কেনার বায়না ধরলে তার বাবা তাকে টাকা দিয়ে বেলুন কিনতে পাঠান। কিছুক্ষণ পরে বিস্ফোরণের শব্দ শুনে এসে দেখেন, তাদের মেয়ের নিথর দেহ রাস্তায় পড়ে আছে।

শিশুদের ছিন্নভিন্ন দেহ লাফাচ্ছিল: ঘটনার আরেক প্রত্যক্ষদর্শী মোহাম্মদ হোসেন বলেন, বিস্ফোরণের স্থান থেকে কিছুটা দূরে আমি ঝালমুড়ি বিক্রি করি। বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে ওই বেলুন বিক্রেতা ভ্যান নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ালে আমি তাঁকে চলে যেতে বলি। এরপর একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে তিনি একটি টিনশেডের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ান। কিছুক্ষণ পর বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পাই। বিস্ফোরণে বিকট শব্দ হয়েছে। এই সময় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শুধু কালো ধোঁয়া দেখা গেছে। আমি দৌড়ে উত্তর দিকে চলে যাই। এ সময় শিশুদের চিৎকার শুনতে পাই। ধোঁয়া শেষ হলে এসে দেখতে পাই, লোহার গেটের সামনে রক্ত। শিশুদের ছিন্নভিন্ন দেহ লাফাচ্ছে। এক শিশুর পেটে সিলিন্ডারের ভাঙা অংশ টুকরা ঢুকেছিল। এক শিশুর হাত ও পা বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। একাধিক মহিলা পড়েছিলেন ঘটনাস্থলের আশপাশে। আমি তখন চিৎকার দিয়ে মানুষ ডাকতে থাকি। এর ১৫/২০ মিনিট পর পুলিশ আসে। তারপর আসে ফায়ার সার্ভিস। তারা এসে লাশ তুলে নিয়ে গেছে। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

হাসপাতালে যান তথ্য প্রতিমন্ত্রী: গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের খবর পেয়ে হতাহতদের দেখতে ও স্বজনদের সান্ত্বনা দিতে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ছুটে যান তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, দুর্ঘটনা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অবহিত করা হয়েছে। আহত ও নিহতদের পাশে দাঁড়াতে তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন। আমরা সেই মোতাবেক কাজ করছি।

সূত্র: দেশ রূপান্তর

Comments

comments