ফেনী নদীর ১.৮২ কিউসেক পানির জন্য চুক্তি কেন?

আব্দুল্লাহ আল রাকিব

 ২০০৭ সালে ৩৬তম জেআরসি মিটিং এর সিদ্ধান্তে যৌথ পরিদর্শন হয়। নদীটি যে স্থান দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে সেখান থেকে বঙ্গোপসাগরের দুরত্ব সোজাসোজি ২০ কিলোমিটার মাত্র। এটুকু খাল কেটে সাব্রুম শহরে পোর্ট করলে ভারত ত্রিপুরাতে সে পোর্ট দিয়ে মালামাল পাঠাতে পরিকল্পনা নেয়। চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে ভারতের পুর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করতে ২০১৫ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি ও আমাদের দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফেনী নদীর ওপর ব্রিজ নির্মাণ করতে ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। সব ঠিক আছে।

তো এই সামান্য পানি নিজ এলাকার সাব্রুম শহরে পানের জন্য উত্তোলন করবে মাত্র একটি পাম্প দিয়ে। ছোট শহর, মাত্র দশ হাজার লোকের বাস। এরজন্য চুক্তির মানে ভারত নিজ থেকে একতরফা এক ফোটা পানিও প্রত্যাহার করে না? এত ভদ্র ভারত?

তিস্তা নদীতে শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রবাহ হয় গড়ে দশ হাজার কিউসেক। ভারত তিস্তার উপর গজলডোবা ব্যারেজ নির্মাণের আগে রংপুর ডালিয়া পয়েন্টে এ পরিমান প্রবাহ রেকর্ড আছে। এখন ৫০০ থেকে ১০০০ কিউসেক প্রবাহিত হয়। তাই রংপুর অঞ্চলের কৃষকদের হাহাকার। তাদের ক্রন্দনরত ছবি বহুবার আমরা মাঝেমধ্যে দেখি। বাংলাদেশের তিন কোটি মানুষ তিস্তার পানির উপর নির্ভরশীল। সেখানে একতরফা পানি নিয়ে নিচ্ছে ভারত, জিজ্ঞেস করেনি, বহু বলার পরও পানি চুক্তি করতে রাজি না, এখানে অতি সামান্য পানির জন্য চুক্তি করার আসল ধান্ধাটা কি?

সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বললেন, ভারতকে নাকি মানবিক কারনে পানি দেয়া হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো রংপুর অঞ্চলের প্রায় তিন কোটি মানুষের জন্য মানবিকতা কোথায় ?

প্রাচীনে নদী কেন্দ্রীক মানব সভ্য যেখানে যতটা গড়ে উঠেছে সে নদীর পানির অধিকার এ যুগে তাদের ততটাই । এটাই জাতিসংঘের নীতি। তিস্তার ওপর নির্ভরশীল ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের বেশি হলে দুই মিলিয়ন লোক, আর বাংলাদেশের প্রায় ৩০ মিলিয়ন। তিস্তা ভারতের বেশিরভাগ অংশে দুর্গম পাহাড়ী, ২৩০০০ ফুট উপর থেকে এর যাত্রা শুরু। সেজন্য বিভিন্ন স্থানে পানি-বিদ্যুতের ড্যাম নির্মাণ করেছে, একই পানি বিভিন্ন উচ্চতায় বার বার ব্যবহার করছে, পানি ডাইভার্ট হচ্ছে না, সেজন্য সেটাতে আমাদের আপত্তি কম। কিন্তু নীচে গজলডোবা ড্যাম করেছে পানি ডাইভার্ট করতে। এটা আন্তর্জাতিক নদীতে চুক্তি ছাড়া করতে পারে না। করার পরও এত বলার পরও পানি চুক্তি না করে ৯০% পানি নিয়ে নিচ্ছে। সেখানে এই সামান্য ১.৮২ কিউসেক পানির জন্য চুক্তি কেন? বিরাট প্রশ্ন বটে !

বাংলাদেশের মানুষ এত নির্মম না যে এই সামান্য পানি দিতে আপত্তি করবে। তাহলে করছে কেন? কারণ তিস্তার পানি বছরকে বছর না দিয়ে এখানে এক ফোঁটা নিবার চাওয়াটাও লজ্জার বিষয় হওয়া উচিৎ। তিস্তার পানি না দিলে সরকার এ চুক্তি কেন করবে? ফারাক্কা দিয়ে বাংলাদেশের অপূরনীয় ক্ষতি কে করেছে? বাংলাদেশের শক্তি যথেষ্ট থাকলে ভারত এরকম করতে পারতো? যেমন নীল নদ দশটি দেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও সর্বনিম্নের দেশ মিশরের সম্মতি ছাড়া উপরের কোন দেশ নদীর পানি ডাইভার্ট করতে সাহস করে না। নীতি না শক্তি প্রধান? সেখানে এখন চুক্তি করাটা ভয়ানক অন্যায় না? ভারতের বিদ্যুৎ বেশি , আমাদেরকে দিবে, পানি আমরা ভারতকে দিব যদি বেশি থাকে, এভাবে পারস্পরিক বন্ধুত্বে প্রতিবেশি দেশ চলে। কিন্তু রোহিঙ্গা নিয়ে জাতিসংঘে ভোট হলে কত দেশ ভোট দেয়, ভারত দিল না। সেটা কি বন্ধুত্ব?

সেজন্যই এদেশের মানুষ এই চুক্তি করার ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। আজকে আবরার ফাহাদকে যারা হত্যা করেছে, এক নিজ দলীয় নেতাকে বহিস্কার করেছে চুক্তির বিরোধীতা করার জন্য। তাহলে এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্যটা কি? আর আজ কেউ ভিন্নমত প্রকাশ করলেই তার প্রতি হিংস্রতা, পশুত্ব মনোভব প্রকাশ করা হচ্ছে। আর যদি সেই ভিন্নমত ভারতের বিরুদ্ধে যায় তাহলে অবস্থা আরও খারাপ।। তার বাস্তব প্রমান আবরার ফাহাদের জীবন ছিনিয়ে নেওয়ার মাধ্যমেই বুঝা যায়।।

গত দুইবা‌রে সরকার গঠ‌নে ভোট কারচু‌পির এত বড় ঘটনার পর বি‌শ্বের সমা‌লোচনা ও বৈরী পদ‌ক্ষেপ থে‌কে ভারত বর্তমান সরকার‌কে রক্ষা করার হিস্যা নি‌চ্ছে পা‌নি না দি‌য়ে। সেজন্য সরকার ভার‌তের সমা‌লোচনা কিছুতেই সহ্য কর‌ছে না। আবরার‌কে তারা হত্যা ক‌রে‌ছে, এক নিজ দলীয় নেতা‌কে ব‌হিস্কার ক‌রে‌ছে চু‌ক্তির বি‌রোধীতা করার জন্য। তারা ক্ষমতার জন্য কি ভয়ানক যু‌ক্তিহীন চু‌ক্তি যেন দেশ থে‌কে ভারত‌ প্রিয়। চু‌ক্তির যৌ‌ক্তিকতা নিয়ে কেউ প্রশ্ন কর‌লেই তা‌দের‌কে রাজাকার, পা‌কিস্তান প্রিয়, পাকিস্তানের দালাল বলা হচ্ছে। কারণ ক্ষমতা তা‌দের জন্য বিরাট লাভজনক, যে‌হেতু তারা লুটপা‌টে প্রচন্ড বেপ‌রোয়া। ক্ষমতার গ‌ন্ডি‌তে উঁ‌কি দি‌লে যেন জীবন্ত পু‌ড়ি‌য়ে মার‌বে, তারজন্য শীর্ষ থে‌কে নি‌ম্নে ইদা‌নিং ভারত‌ সমা‌লোচনা‌কে এত সি‌রিয়াসলী দে‌খছে সরকার। ভারত সে সু‌বিধাই নি‌চ্ছে মাত্র। বাংলা‌দেশী বাঙ্গালীদেরও ধৈর্য্য অ‌তীতে এতটা দেখা যায়‌নি। কখ‌নো অ‌স্ত্রের কা‌ছে মানুষ পি‌ছি‌য়ে যায় বিপ্লবীভা‌বে অাগা‌নোর শ‌ক্তি অর্জ‌নের অ‌পেক্ষায়। এটাই বর্তমান পৃ‌থিবীর ই‌তিহাস।

তাই আমাদের উচিত ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করতে যেয়ে যেন জাতির বৃহত্তর স্বার্থ নষ্ট না করে ফেলি।।

Comments

comments