‘আবরার আমাদেরও নামাজ পড়তে বলত’

আবরার ফাহাদ নিজে নামজ পড়তেন, বন্ধুদেরও নামাজের জন্য ডাকতেন। স্কুলে পড়ার সময় সমবয়সীরা খেলার ছলে অন্যায় কাজ করতে গেলে আবরার বাধা দিতো। বৃহস্পতিবার দুপুরে বুয়েট শহীদ মিনার এলাকায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সমাবেশের সামনে এসব কথা বলছিলেন আবরার ফাহাদের বন্ধু ইমামুল হাসান।

কাঁদো কাঁদো গলায় ইমামুল বলেন ‘আবরার সব সময়ই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত, আমাদেরও নামাজ পড়তে বলত। এটা নতুন কিছু না। স্কুল-কলেজে থাকতে যখনই আমরা কোনো অন্যায় কাজে তাকে নিতে চেয়েছি, সে যায়নি, সরে গেছে। সে আমাদের বোঝাত-খারাপ কাজ করা উচিত না। সে ছিল আমাদের অভিভাবকের মতো।

আবরারের সঙ্গে কুষ্টিয়ার স্কুল, ঢাকার নটর ডেম কলেজ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন ইমামুল হাসান। তিনি বলেন, ‘সেদিন সকালে আমি ঘুমাচ্ছিলাম। এক বন্ধু ফোন করে আমাকে আবরারের হত্যার ঘটনাটা জানাল। একটু পরে জানতে পারলাম, ঘটনা সত্য। খবর শোনার পর মুখটা পর্যন্ত ধুইনি, ওই অবস্থাতেই এখানে চলে এসেছি। কিন্তু হলে গিয়ে দেখলাম, আবরার সেখানে নেই। পরে ঢাকা মেডিকেলে গিয়ে ওর কয়েকজন আত্মীয়কে দেখলাম। তারা জানালেন, লাশ মর্গে রাখা হয়েছে। পরে যখন মর্গের রুমে গিয়ে লাশটার দিকে তাকালাম, আমি নিজেকে আর ধরে রাখতে পারিনি। এমন একটা ছেলেকে এভাবে কেউ মারতে পারে।’

বুয়েটের দ্বিতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থী বলেন, ‘আবরারকে কখনো কোনো অন্যায় করতে দেখিনি। তাকে কেউ কীভাবে এতটা নৃশংসভাবে মারতে পারে। আমি ভাবতে পারিনি, এটা আমার বুয়েটের কোনো ভাইয়ের কাজ হতে পারে। আমার বুয়েটের ভাইয়েরাই আরেক ভাইকে মেরেছে, নিজেকে কীভাবে সান্ত্বনা দেব। নিজের ভাইকে কেউ কীভাবে এভাবে পিটিয়ে মারতে পারে।’

প্রসঙ্গত ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ায় খুন হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে। ভারতের সঙ্গে চুক্তির বিরোধিতা করে শনিবার বিকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন ফাহাদ। এর জেরে রোববার রাতে শেরেবাংলা হলের নিজের ১০১১ নম্বর কক্ষ থেকে তাকে ডেকে নিয়ে ২০১১ নম্বর কক্ষে বেধড়ক পেটানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পিটুনির সময় নিহত আবরারকে ‘শিবিরকর্মী’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালায় খুনিরা।

তবে আবরার কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না বলে নিশ্চিত করেছেন তার পরিবারের সদস্যসহ সংশ্লিষ্টরা।

হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ না রাখতে সিসিটিভি ফুটেজ মুছে (ডিলেট) দেয় খুনিরা। তবে পুলিশের আইসিটি বিশেষজ্ঞরা তা উদ্ধারে সক্ষম হন। পুলিশ ও চিকিৎসকরা আবরারকে পিটিয়ে হত্যার প্রমাণ পেয়েছেন।

এ ঘটনায় বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদ ও সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেলসহ ১৬ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

এ ঘটনায় ১৯ জনকে আসামি করে তার বাবা চকবাজার থানায় সোমবার রাতে একটি হত্যা মামলা করেন। বুয়েট কর্তৃপক্ষ একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে। পাশাপাশি গঠন করেছে একটি তদন্ত কমিটিও।

এদিকে ঘটনার সাথে জড়িত থাকার প্রমাণ মেলায় বুয়েট শাখার সহসভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ১১ জনকে ছাত্রলীগ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।

Comments

comments