শিক্ষার্থীদের ভাষায় বুয়েটে টর্চার সেলে ছাত্রলীগের ভয়াবহ নির্যাতনের বর্ণনা!

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নির্যাতন চালানোর বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে। আবরারের আগে অনেক শিক্ষার্থী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তুচ্ছ ঘটনায় এমনকি সালাম না দেওয়ার অজুহাত তুলেও তাঁদের পেটানো হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক হলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বুয়েটের হলে হলে নিয়মিতই নির্যাতন চলে। আর এ ‘কাজে’ ব্যবহারের জন্য স্টাম্প ও লাঠি প্রস্তুত রাখে ছাত্রলীগ। বুয়েটের আটটি হলের মধ্যে তিনটি হলের সাতটি টর্চার সেল সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে খুবই পরিচিত। এসব কক্ষে শিক্ষার্থীদের ডাক পড়লে ধরেই নেওয়া হয় তিনি মার খেতে যাচ্ছেন। অন্য শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদ করলে তাঁর ওপরও চলে নির্যাতন। ফলে বুয়েটে ছাত্রলীগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে ভয়ের ব্যাপার হয়ে উঠেছিল। নিচে শিক্ষার্থীদের বর্ননায় কেমন ছিলো সেই টর্চার সেল।

মারতে মারতে যখন ব্যাথায় কাতর জানোয়ারগুলা বলে যে নাটক করছি

গত ডিসেম্বরে নির্বাচনী এস্তেহার আসার পর যখন সমাবেশ করা হয় সেখানে আমি যায় নি। অনেকেই গেছিল না ১৭ এর , তাই সবাইকে ছাদে তোলা হয়েছিল । আমি ওইদিন একটা প্রজেক্টের কাজ করছি সারাদিন । ক্লান্ত হয়ে রুমে এসে ঘুমায়ে গেছি । রাত ২ টার দিকে কিছু ছেলে এসে বলে সব ১৭ কে ছাদে যেতে বলছে । ঘুম থেকে ডেকে নিয়ে গেছিল ওইদিন , সবাইকে জিজ্ঞেস করছিল যে কোথায় ছিল । যারা বলছে টিউশনি তে গেছিল তাদের প্রচুর মারছে । আমাকে দেখে সকাল (খুনির আসামিদের একজন ) চিল্লায়ে উঠে বলছে যে এই যে এএতো দিনে পাওয়া গেছে । আমি এর আগে কখনো র‍্যাগ খাই নি । ১-১ এ ডেঙ্গু হইছিল বলে ১-২ এর শুরু থেকে খালা বাসায় থাকতাম। ওইদিন প্রথম পাইছে আমাকে। আমার চুল ধরে টান দিল একজন । পিছনে ছিল চেহারা দেখি নি । আর ফারহান জাওয়াদ চৌধুরী স্টাম্পের বাড়ি দিল ৩-৪ টা পাছার উপরে । প্রথমে ব্যথা লাগে নি আস্তে আস্তে বুঝসি । কিছুদিন ঠিকমতো বসতে পারতাম না ।তারপর আশিকুল ইসলাম বিটু আমাকে চড় মারতে আসলো এই বলে যে আমি নাকি সালাম দেই না । চড় মারতে যাচ্ছিল তখন আসিফ রায়হান মিনার , তৌফিকুর রহমান শুভ থামায়ে দিয়ে আমাকে সরায়ে দিল । এর ঠিক পরপরই অমিত সাহা হঠাৎ করে শাখাওয়াত অভিকে মারতে শুরু করলে সালাম না দেওয়ার জন্য । মারতে মারতে যখন অভি ব্যাথায় হাত ধরে বসে তখন সব জানোয়ারগুলা বলে যে নাটক করেছে । তারপর একজন ওর হাত ধরতে গিয়ে দেখে খুব বাজে অবস্থা হাত ফুলে গেছে । ওকে হাসপাতালে নিয়ে যায় আর আমাদেরকে ছেড়ে দেয় । বুয়েটের হলগূলোতে মেস ম্যানেজার পলিটিকাল ব্যাকগ্রাউন্ডের জোরে দিনের পর দিন টাকা মেরে খাইসে। ওইটাকায় মদের পার্টি দিসে, বাইক কিনসে। শেরে বাংলায় গত ২ বছরে হঠাত বাইক বেড়ে যাওয়ার কারণও এইটা।

নামাজ পড়ুয়া-তাবলীগ করে না- এমন ছেলেদের পিটিয়েছিলো ওরা

২৮ আগস্ট ২০১৫ থেকে শুরু করে ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৫। নিউজ ঘাটলে দেখবেন, সে সময় শিবিরের সন্দেহের ধুয়া তুলে বুয়েটের হলগুলোতে বহু ছাত্রকে হল ছাত্রলীগ টর্চার করেছিল। আমি নজরুল ইসলাম হলের ছাত্র ছিলাম। তখন রুম নম্বর ১০৫ আর ৩০৫ ছিল নজরুলের ছাত্রলীগের টর্চারসেল। রড, কাঠ, লাঠি কোনো কিছু বাদ রাখে নি তারা তখন। সবচেয়ে কষ্টের ব্যাপার ছিল সে সময় ১৪ ব্যাচ কেবলি ১ টার্ম শেষ করেছে, আর ১৩ ব্যাচ ২ টার্ম। এই দুই ব্যাচের ওপর ঝড় গিয়েছিল সে সময়। নজরুল হলে পুরো ব্যাপারটার নেতৃত্বে ছিল আনোয়ার হাবিব অনিক (CE’10)। সে এই ঘটনার মাত্র ছয় মাস পর কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগে তথ্য-প্রযুক্তি সম্পাদক পদ পায়। ছাত্র মারধরে সেই হলের অন্যান্য এক্টিভ ছাত্রলীগরা ছিল সুজিত সাহা (MME’08), সজল আহমেদ শুভ (CE’10), শুভেন্দু বিশ্বাস (CE’10), অনির্বাণ সাহা (CE’11), নাহিদ আদনান (CE’11), বিজয় সাহা (CE’12), রাজীব সাহা (CE’12), জয় প্রকাশ রিদম(CE’12), সাঈদ অভি (ME’12), সুলতানুল আরেফিন রিদম (EEE’12), মতিউর রহমান টিপু (MME’13), নাসির আহমেদ (CE’13), মাহমুদুল হক মুরাদ (CE’13)। সে সময় বুয়েটের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিল শুভ্র জ্যোতি টিকাদার আর কনক আহমেদ। তাদের নেতৃত্বে বুয়েটের সব হলে তল্লাশি চলেছিল, আর খুঁজে খুঁজে সব নামাজ পড়ুয়া-তাবলীগ করে না- এমন ছেলেদের মার্ক করে ধরে ধরে প্রত্যেক হলে পিটিয়েছিল। কাওকে পুলিশে দিয়েছিল, কাওকে বুয়েট প্রশাসনের হাতে তুলে দিয়েছিল। অনেককে মেরে মুচলেকা নিয়ে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে ছেড়ে দিয়েছিল। বুয়েট প্রশাসন সব ধামাচাপা দিতে অভিযুক্ত নিরপরাধ ছাত্রদের কয়েকজনকে এক টার্মের জন্য বহি:ষ্কার করে, কয়েকজনকে সতর্ক করে। আর ঘটনার পেছনের কুশীলব ছাত্রলীগদের কোনো জবাবদিহিতা দিতে হয় নি তখন। সেসময় বুয়েটের ভিসি ছিল খালেদা একরাম (Arch.), আর ডিএসডব্লিউ ছিল দেলোয়ার হোসেন (CE)। স্যার বা ম্যাডাম কোনোটা বলার মতো সম্মান তাদের জন্য অবশিষ্ট নেই।

৫ বছর পরে ভার্সিটি থেকে পাস করেও সেই শারীরিক নির্যাতনের কথা ভুলতে না পারি

আমি বুয়েট ১৩ ব্যাচ। এটা ২০১৪ সালের কথা। আমাদের ক্লাস শুরু হয় ৩ য় সপ্তাহে ( প্রথম দুই সপ্তাহ রমজান ছিল, তাই কোন র‍্যাগিং হয় নি) আমাকেসহ আমার ততকালীন রুমমেটদেরকে(তখন ইকসুতে ১৩ ব্যাচকে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল) নিয়ে আহসান হলে ১৪৬ নম্বর কক্ষে বর্তমান বুয়েট ছাত্রলীগ প্রেসিডেন্ট জামিউস সানি, বর্তমান আহসানউল্লাহ হল সাধারণ সম্পাদক লিংকন সরকার স্ট্যাপ দিয়ে প্রবলভাবে পিটান। এ ঘটনার পর আমি মানসিকভাবে প্রচন্ড আহত এবং বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি। ঘটনার পর আমি আমার বাসায় চলে আসি। এরপর পুরো ৬ মাস আমি বুয়েটে অত্যন্ত আতংকিত অবস্থায় কাটিয়েছি। আমি ক্লাস বাদে বুয়েটের কোন কিছুতে অংশগ্রহণ করতে পারি না। আমার মধ্যে সিনিয়রদের নিয়ে প্রচন্ড ভয় এবং ভীতি কাজ করত। প্রতি বুধবার রাতে হল থেকে পালিয়ে কোন আত্নীয়ের বাসায় চলে যেতাম।এভাবে ভয়াবহ ট্রমার মধ্যে দিয়ে আমার বুয়েটের ফার্স্ট ইয়ার কেটেছে। আমি কোন মানুষের সাথে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারতাম না। আজ এতদিন পর এটা বলতে চাই, আমি যখন ৫ বছর পরে ভার্সিটি থেকে পাস করে যাওয়ার পরেও এই ট্রমা, এই শারীরিক নির্যাতনের কথা ভুলতে না পারি. যে ১৭,১৮ ব্যাচের র‍্যাগিং শারীরিক নির্যাতনে এ রকম ভয়াবহ অবস্থা তাদের কি হবে? আবরারের হত্যাকারীসহ এই সকল র‍্যাগিংকারী, শারীরিক নির্যাতনকারী কুলাংগার দের বিচার চাই।

অ্যাম্বুলেন্স রেডি রেখে সেদিন রক্তাক্ত করা হয় জামিরাকে

আহসানউল্লাহ হলে অন্য যে কোন হলের চেয়ে বেশি নির্যাতন দেয়া হয়। শিবির গুজব ছড়িয়ে অনেক ছেলেকে মেরে রক্তাক্ত করার কথা শুনেছি। আমি একদিন তিন তলার ছাত্রলীগ সভাপতি জামির রুমের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় দেখি অনেক মানুষের জটলা। কিছু সময় পর হল প্রভোস্টসহ কয়েকজন ওই রুমের সামনে আসে। ২২১ নম্বর রুমের জীবন নামে একটা ছেলেকে রক্তাক্ত অবস্থায় জামির রুম থেকে বের করে আর সাথে সাথে ওই ছেলেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে যায়। পুরো সময় হল প্রভোস্ট তার অফিসে বসা ছিল যখন ওই ছেলেকে মারা হয়। নিচে অ্যাম্বুলেন্স রেডি ছিল,পুলিশের গাড়ি আগে থেকেই ছিল। সবাই জানে একজনকে মারা হচ্ছে কেউ এগিয়ে আসে নি। আহসানউল্লাহ হলে আমরা জুনিয়রদের অবস্থা অনেক করুণ। জামি,অভিষেক মুহুরি,জয়দ্বীপ সবসময় সবাইকে আতংকের মধ্যে রাখত। বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি আমরা চাই না।কেউ গণরুমে টিকে থাকার জন্য ছাত্রলীগের ভাইদের খেলনার বস্তু হোক তা আমরা কেউ চাই না। ১২,১৩,১৪ ব্যাচের যেইসব লিগের ভাইয়েরা রুমগুলো দখল করে রেখেছে তা অবিলম্বে ছাড়তে হবে।

৩ স্ট্যাম্প ভেঙে যায় তখন বাহির হতে হকিস্টিক এনে আমাকে আবার পিটানো শুরু করে

২৩ নভেম্বর ২০১৮ , রাত ১১ টা। পরেরদিন দিন আমার অপারেটিং সিস্টেম অনলাইন থাকায় আমি আর আমার রুমমেট হাসিব পড়তেছিলাম। হঠাৎ ১০-১২ জন আমার রুমে ঢুকে। তাদের মধ্যে ১৪ এর ৫-৬ জন , ১৫ এর ৩-৪ জন বাকিরা ১৬, ১৭ এর ছিল। ১৪ এর মিনহাজ ভাই আমাদের জিজ্ঞেস করে , তোরা কে কে হল হল ফেস্টের টাকা দিস নাই। আমাদের রুমের কেওই টাকা দিই নাই। আমি বললাম ভাই আমি হল প্রোগ্রামে থাকবো না তাই টাকা দিব না। ১৪ এর বাধন ভাই বললো , “ হল ফেস্টে থাকিস বা না থাকিস টাকা দিতে হবে” । “ ভাই আমি হল হল ফেস্টে থাকব না ত কেন টাকা দিব?” মিনহাজঃ বেয়াদব, তুই কিভাবে আমাদের মুখের ওপর এইভাবে না করতে পারিস। রুমে বড় ভাই ঢুকা সত্যেও তুই কিভাবে পড়তেছিস। ( আমার ল্যাপটপ কোড রান করার জন্য ওপেন ছিল)। তুই কিভাবে এই হলে থাকিস আমি দেখে নিব। ফাহিম, ( আমার উইং এর ১৪ এর ) ওর সব কিছু নামা রুম থেকে। ফাহিম , ফাহিম বলে চিল্লাইয়া রুম থেকে চলে গেছে। ১৪ এর সবাই আমার ওপর চিল্লাচ্ছিল তখন কিভাবে আমি এইভাবে না করতে পারলাম। চিল্লানোর সাথে সাথে এত অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করতেছিল যে এই ধরনের গালি আমি জীবনে মুখেও আনতে পারবো না। কিছুক্ষন পর মেহেদি আর কায়েদ আমার রুমে ঢুকে জিজ্ঞেস করলো কি বলছিলাম আমি। আমি বললাম যে ,” ভাই আমি হল কনসার্টে থাকবো না তাই টাকা দিব না। মেহেদি বললো , “ তর এইভাবে বলা উচিত হয়নি। “তুই থাকলে কিভাবে বলতি ?” সে কিছু বললো না। ১৫ এর সবাই তখন আমার সাথে একমত হয় যে ১৪ এর চিল্লাচিল্লি এখানে লজিক্যাল ছিল না। অনেকেই ওই দিন টাকা দেয় নি দেখে হয়তো তারা বেশি টেম্পার দেখাচ্ছে। সব কিছু ভুলে গিয়ে আমি পরেরদিনের জন্য পড়াশোনা করতেছিলাম। রাত তখন ১২:৩০মিনিট। মেহেদি আর নিহাদ আমার রুমে এসে আমাকে রশিদ হল ৪০৫ নম্বর রুমে নিয়ে যায়। ওই দিন ফ্যাকাল্টি ফুটবল থাকায় হাটতে কষ্ট হচ্ছিল । তাই তারা আমাকে এক রকম কাধে করিএ নিয়ে যায়। যাওয়ার আগে আমি জিজ্ঞেস করি “ভাইদের কি হইছে ? আমি কি এমন কিছু বলে ফেলছি?” -“আমরা জানি না রে ভাই ওনারা কেন এরকম পিনিক দেখাচ্ছে।”ভাই চল, ওনারা চিল্লাফাল্লা করবে পরে অনেক। আমি ভাবলাম হয়তো ধমক টমক দিবে হয়তো , বড়জোর দুই একটা চড় থাপ্পড় দিবে। এর চেয়ে বেশি কিছু আমি স্বপ্নেও ভাবি নাই। ৪০৫ নম্বর রুমে প্রবেশ করলাম। রুমে ছিল ৬ জন। সবাই ১৪ ব্যাচ এর। মিনহাজ মেকা’১৪, অয়ন সিভিল,১৪, ঝলক সিভিল’১৪ , বাধন সিভিল’১৪, সৌরভ সিভিল’১৪, আর ফাহিম মেকা’১৪। মিনহাজ ভাই আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “তুই আমাকে কি বলছিলি?” এই বলে এত জোরে থাপ্পড় মারে যে কেও কখনো এত জোড়ে আমাকে মারে নাই। মিনহাজ ভাই আমাকে তার হাতে হয়রান হওয়ার আগ পর্যন্ত মারে। তার সে একটা স্ট্যাম্প নেয়। তার গায়ে যত শক্তি আছে সেই শক্তি দিয়ে ১৫-২০ টা বাড়ি দেয় আমার বাম হাতে। স্ট্যাম্প ভাঙার আগ পর্যন্ত মারতে থাকে। এই বুঝি আমার বাম হাত যেন ভেঙে গেল। কান্না করার স্বভাব তেমন একটা ছিল না আমার। যেহেতু আমি কাঁদতেছিলাম না সেই কারনে তারা আরও বেশি হিংস্র হয়ে উঠে। “ তুই কিভাবে আমার সাথে এইভাবে কথা বলছ। এখন পর্যন্ত কোনো সিনিয়র আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারে নাই। আর তুই আমার সাথে এইভাবে কথা বলছ।” এই বলে আবার আমার মুখের ওপর চড় মারে। যখন শুনতে পায় যে আমার পায়ে সমস্যা আছে তখন তারা আমার বা পায়ে আঘাত করে। আমার বা পায়ের হাটুতে লাথি মারে। আমি মাটিতে পড়ে যাই। মাটিতে পড়ে যাওয়ার পরেও তারা আমার পায়ের ওপর লাথি মারতে থাকে। নতুন স্ট্যাম্প নিয়ে আবার মারতে থাকে। যখন ই আমার পায়ে কেও মারতেছিল , ব্যাথাটা এতই বেশি ছিল যে নিজের কাছে মনে হল , এই বুঝি আমি মারা যাচ্ছি। ব্যাথায় আমি চিল্লাচ্ছিলাম। মুখ দিয়ে রক্ত ঝড়তেছিল। কান্না করে বলতেছিলাম , ভাই আমাকে ছেড়ে দেন। ভাই আমাকে ছেড়ে দেন। ভাই আপনাদের কাছে হাত জোর করি ভাই আমাকে ছেড়ে দেন। সৌরভ ভাই বলে উঠল , “ আজ পর্যন্ত কোনো জুনিয়রকে মারতে দেখছিস? তবুও কেমনে তুই আমাদের সাথে বেয়াদবি করলি? তর কি বড় ভাই নাই । বড় ভাই থাকলে এরকম করতি না।” সৌরভ ভাই আরও অনেক আজে বাজে বকছে যে শুনলে যেকোনো মানুষের মাথা নষ্ট হয়ে যাবে। বাধন ভাই আমাকে থাপ্পড় মেরে একই রকম কথা বলে মজা নেয়। ঝলক ভাই আমাকে জিজ্ঞেস করছিল যে তুই কি বলছিলি। যখন ই আমি উত্তর দিতে যাই তখন আমার মুখের উপর থাপ্পড় মেরে আমাকে মেঝেতে ফেলে দিত। মেঝেতে ফেলে আবার মারতো। মুখ থেকে বের হওয়া রক্ত যখন ওর হাতে লাগে তা আমার টিশার্টে মুছতেছিল। মিনহাজ ভাই একটু পর পর সবাইকে বলতেছিল কেন তারা আমাকে মারতেছে না। মিনহাজ ভাই আমাকে মারতেছিল আর যখন টায়ার্ড হয়ে যেত তখন উঠে গিইয়ে সিগারেট খেত। সিগারেট খেতে খেতে বলত “ওই তোরা ওরে মারছ না কেন তারে। ওই তোরা ওরে মারছ না কেন তারে। আমার ত তারে খুন করতে ইচ্ছে করতেছে। এই কথা বলেই আমার মুখের ওপর লাথি মারতো।” যখন ওর লাথির কারনে আমি মাটিতে পড়ে যেতাম আর আমার পা বের হয়ে যেত তখন আমার পায়ে লাথি মারত। পায়ে যখন মারত তখন মনে হত এই বুঝি মারা যাচ্ছি। ভাঙা পায়ে মার মানেই কলিজা যেন ফেটে যাচ্ছে। একটু পর অয়ন ভাই রুমে ঢুকে। “কিভাবে তুই আমাদের সাথে বেয়াদবি করিস। তোকে শিক্ষা দেওয়া লাগবে” এই বলে অয়ন ভাই আমার মুখে লাথি ঘুষি মারতেছিল। আমার দুই পা উচ্চ করে স্ট্যাম্প দিয়ে মারতে থাকে। পায়ের তালুতে কিংবা হাটুতে । অন্যরা যখন মারতেছিল আমাকে তখন সে বলতেছিল , পায়ের তালুতে মার । অন্য জায়গায় মারলে দাগ থাকবে। এখানে মারলে দাগ থাকবে না। মিনহজ ভাই আর অয়ন ভাই পালাক্রমে মারতে থাকে। কখনো হাতে কখনো বা স্ট্যাম্প দিয়ে। একজন টায়ার্ড হলে অন্যজন আসে। আমি ব্যাথায় চিৎকার করতেছিলাম। সবার পায়ে ধরতে ছিলাম । কিন্তু ওই রুমের কেও আসে নি আমাকে মার থেকে বাচানোর জন্য। মিনহাজ ভাই জিজ্ঞেস করলো “ওই তোর ফোন দে?” “ভাই আমি ফোন আনিনি” ফোন আনিস নাই কেন এই বলে আবার আমার মুখে লাথি মারে। রক্ত বের হয়ে ফ্লোরে পড়ে । মেহেদিকে দিকে আমার রুম থেকে ফোন আর ল্যাপটপ আনানো হয়। ওরা আমার ফেসবুক প্রোফাইল চেক করে। কিছু না পেয়ে তারা আমার মেসেঞ্জার চেক করে। মেসেঞ্জারেও যখন কিছু পাচ্ছিল না তখন দেখে যে আমার সাথে কয়েকজন মেয়ের চ্যাট আছে।( যারা হয় আমার ব্যাচম্যাট না হয় সিনিয়র আপু। যাদের সাথে প্রয়োজন আর অপ্রয়োজনে কথা হত)। ফাহিম ভাই আমার চ্যাট পড়তেছিল আর তা ব্যাঙ্গ করে সবার সামনে তা উচ্চারন করে হাসাহাসি করতেছিল। একটু পর বলে যে এই এই পোলা ত আওয়ামি লীগের পোস্টে হাহা দেয়। মিনহাজ ভাই বলে কত্ত বড় সাহস তুই আওয়ামী লিগের পোস্টে হাহা দিস। শিবির তুই। আমি বললাম ভাই আমি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান। আমার চাচা একজন শহীদ। এরপর তারা একটু থামে । শেষ পর্যায়ে যখন ৩টা স্ট্যাম্প ভেঙে যায় তখন বাহির হতে হকিস্টিক আনে। আমি সবার পায়ে ধরে মাফ চাচ্ছিলাম। ওরা বলতেছিল তুই আজকেই হল ছেড়ে চলে যাবি । আমি রাজি হয়ে যাই। জি ভাই আজই চলে যাব। আর আসবো না এই হলে। ওদের মনে দয়া হল। আমাকে ছেড়ে দেয়। যখন মেহেদী আর নিহাদ আমাকে নিতে আসে তখন বলে, “এই পোলা ১৩ এর ওই পোলার মত যারে আমরা আগেরদিন মারার পর পরের দিন ক্লাস করতে গেছে” ২:৩০ এ আমি রুম থেকে বের হই। রুম থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে ৪০৬ নম্বর রুমের ফাহিম ইইই’১৫ আমাকে নিয়ে তার রুমে নিয়ে আসে। কয়েকজন ফ্রেন্ড মিলে আমাকে ডিএমসিতে নিয়ে যায়। ওখানে এক্সরে আর প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর বললো যে একজন অর্থোপ্যাডিক্স ডাক্তার দেখানোর জন্য। ডাক্তার বলে যে, আমার লিগামেন্ট ছিড়ে গেছে আর পায়ে ফ্রেকচার দেখা গেছে। ১ মাস হাটতে পারবা না আর ৬ মাসের মতো ভারি কোনো কাজ করতে পারবা না

আবরার মারা গেছে, আমি ওই দফায় বেঁচে ফিরেছি

বুয়েটের ও এ বি এর দোতলায় মেকানিক্যাল ড্রয়িং কুইজ দেয়া শেষ হওয়া মাত্রই পরীক্ষার রুম থেকে তন্ময়, আরাফাত, শুভ্র জ্যোতি টিকাদারদের নেতৃত্বে ৮-১০ জন ছাত্রলীগের ছেলে শিক্ষকের সামনে থেকে তুলে নিয়ে আহসানউল্লাহ হলের তখনকার টর্চার সেল ৩১৯ নাম্বার রুমে নির্যাতন করে। আমি কারো সাথে যেখানে রাগারাগি পর্যন্ত করতাম না, কারো সাথে কখনোই সম্পর্ক খারাপ পর্যন্ত যেখানে ছিল না, শুধুমাত্র ফেইসবুকে সরকারি নীতির সমালোচনা করে পোস্টের কারণে বুয়েটের মত একটা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রলীগ আমার সাথে এমন আচরণ করে। এর ৬ দিন আগে সাবেক বুয়েট ছাত্রলীগ সভাপতি শুভ্র জ্যোতি টিকাদার(‘০৯) ও কাজল(‘০৯) ল্যাব থেকে আমাকে ধরতে এসে ব্যর্থ হয়ে পরীক্ষার রুম থেকে আমাকে একা ধরতে ওরা ৮-১০ জন প্রস্তুতি নিয়ে আসে! বিকেল ৫ টা থেকে রাত ১১ টা ৩০!! বদ্ধ রুমে আমার পিঠের ওপর লোহা দিয়ে ‘১০ ব্যাচের এক ভাই প্রধানত তার শক্তি পরীক্ষা করে। এর কতদিন আগে কোনো একটা নামাজ মিস দিয়েছি ভুলেই গিয়েছিলাম। কিন্তু সেদিন তারা আসর আর মাগরিব নামাজ পর্যন্ত পড়ার সুযোগ দেয়নি। সারাজীবন একটি মাত্র স্বপ্ন দেখেছিলাম- বুয়েটে পড়বো। বুয়েটের ছাত্রদের ভাবতাম আদর্শ। অথচ সেখানেও এমন হবে- জানা ছিল না। ভর্তি পরীক্ষার সময় গুরুজনেরা বলতেন- দোয়া কর, যেখানে তোমার জন্য কল্যাণ, আল্লাহ যেন সেখানেই তোমাকে চান্স পাইয়ে দেন। আর বুয়েটের অন্ধপ্রেমিক এই আমি দোয়া করতাম- আল্লাহ, বুয়েটেই আমার কল্যাণ দাও। আসলে বুয়েটে পড়ার প্রথম ইচ্ছে হয়েছিল ক্লাস ফাইভে, বাবা বলেছিলেন- ছেলেকে বুয়েটে পড়াতে চাই, সেই থেকে। ভার্সিটি এডমিশনের সময় বাবা অন্য ভার্সিটিগুলোর ফর্ম নিতে দিচ্ছিলেন না, বলছিলেন- ওসবে কালো রাজনীতি ছেয়ে গেছে, বুয়েটেই চান্স পেতে হবে, ওখানেই পড়তে হবে, ওখানে কালো রাজনীতি নেই। জানি, তুমি পারবা। পরবর্তীতে আমার বাবা আমার ওপর নির্যাতন দেখে ডুকরে কেঁদেছেন। আমি হাসিমুখে বলেছি- সব ঠিক হবে, আল্লাহ ভরসা, কোনো অন্যায় করিনি, আমার আল্লাহ সাক্ষী, আল্লাহই এর প্রতিদান দেবেন। মায়ের কান্নাজড়িত চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলার ছিল না, মনে মনে ভেবেছি- “আর কেহ না জানুক, তুমি তো জানো মা, তোমার ছেলে কেমন” এত নির্যাতনের পর আবার আমাকেই উলটো পুলিশে দেয়ার জন্য পুলিশ ডেকে আনে। কিছু শিক্ষক অনেক চেষ্টা করে আর অনেক অপমান সহ্য করেও তা থেকে বাঁচিয়ে নেন। ছাত্রকল্যাণ পরিচালক দেলোয়ার স্যারকে পরে অভিযোগ জানালে উনি বলেন- ওদের সাথে তাল মিলিয়ে চল না কেন? হায়রে!!!!! সেদিন চ্যালেঞ্জ করেছিলাম স্যারকে- এ রকম শুধু আমাকেই না, আরো ১৭ টি নির্যাতনের ঘটনা কিছুদিনেই ঘটেছে। অথচ যারা ভুক্তভোগী তাদের বিরুদ্ধে একটা মাত্র বুয়েটের শৃংখলা ভঙ্গ বা কারো সাথে ঝামেলার ঘটনার প্রমাণ দেন। আর যারা নির্যাতন করছে- তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে কত গুণ্ডামীর প্রমাণ লাগে বলুন। আল্লাহ তুমি সাক্ষী……. আমার বিরুদ্ধে আনা কোনো অভিযোগ ওরা প্রমাণ করতে পারেনি। কিন্তু আমার এই ছবিগুলো তখনই প্রচার হয় বলে ওরা এতে ব্যাপক ক্ষেপে যায়। পাশাপাশি বুয়েট শিক্ষক সমিতি এর বিচারের দাবী জানিয়ে লিখিত বিবৃতি দিয়েছিল। আমাকে ওরা এজন্য ক্যাম্পাসেই ঢুকতে দিতো না, মৃত্যুর হুমকি দিতো। এসব দেখে অন্য নির্যাতিত আরও অসংখ্য ছাত্র নির্যাতিত হলেও প্রকাশ করতো না। নইলে বুয়েটে পড়াশোনা কন্টিনিউ করাই সম্ভব হবে না ওদের। সেদিন দলকানা ছাত্রকল্যাণ পরিচালক চরম অসহযোগিতা করেছেন। পক্ষান্তরে নিরপেক্ষ শিক্ষকেরা অপমান সহ্য করেও আমাকে উদ্ধার করেছেন। দলকানা শিক্ষকেরা সব সময় স্বার্থবাদী হয়। আমি জীবন নিয়ে ফিরতে পারলেও আবরার জীবন দিল। এভাবে অপরাজনীতির শিকার আরও কত জীবন হবে তা ভাবা অসম্ভব। এসব অপরাজনীতি থাকলে ক্যাম্পাসে রক্ত ঝরবেই। তাই নির্যাতিত ছাত্র হিসেবে দাবী জানাই- ক্যাম্পাসে শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত হোক, ছাত্র এবং শিক্ষকদের রাজনীতি নিষিদ্ধ হোক। আমি বুয়েটিয়ান হিসেবে লজ্জিত নই, লজ্জা তাদেরই পাওয়া উচিৎ, যারা অন্যায় করেছে অথবা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছে। ভালোবাসি বুয়েট, ভালোবাসি বাংলাদেশ।

মারতে মারতে ফজরের আজান দিলো-“জীবনের এক ওয়াক্ত নামাজও যদি কবুল হয়, তাহলে তার বিনিময়ে হলেও এর বিচার করো।”

শের-এ-বাংলা হলের ৩১২ নং রুম এর ‘১৮ ব্যাচের আমরা চারজন ওয়েট করতেছিলাম কখন আমাদের কমন রুমে ডাকা হবে। সাধারণত রাত ১১:৩০ থেকে১২:০০ টার মধ্যে র‌্যাগ দেয়ার জন্য ডাকা হয়। কিন্তু প্রায় ১২:৩০বেজে গেলেও আমাদের ডাকা হচ্ছিল না বলে ধরেই নিয়েছিলাম যে ঐদিন rag দেয়া হবে না। এর কিছুক্ষণ পরেই ফোন আসলো-“ভাইরা কমনরুমে ডাকছে”… চুলে পানি দিয়ে ৪ জন মিলে গেলাম কমনরুমে। সেখানে সবাইকে মোটামুটি নির্যাতন-গালাগালি করা হলো। এরপর ১১ জনকে select করা হলো ছাদে উঠানোর জন্য। সেই ১১ জনের মধ্যে আমি এবং আমার EEE এর রুমমেট ও ছিল। আমাকে ধরা হয়েছিল চুল বড় বলে, যদিও আমার চুল অনেক ছোট ছিল। আগে কখনো ছাদে উঠে rag খাই নাই (রুমে ডেকে নিয়ে এর আগে ২ দিন rag দিয়েছিলো)। তাই প্রথমে ভয় না পেলেও পরে দাঁড়িয়ে থাকারো শক্তি পাচ্ছিলাম না। স্টাম্প দিয়ে পিটানো, চড় মারা, লাথি মারা সহ বিভিন্নভাবে টানা ৫ ঘণ্টা নির্যাতন চলে। এবার আসল কথায় আসি। rag খেতে খেতে ফজর এর আযান দিয়ে দিলো। দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলাম না, নিঃশ্বাস ছাড়তে কষ্ট হচ্ছিল, চোখ দিয়ে অবাধে পানি পরছিলো। পাশে তাকিয়ে দেখলাম আমার রুমমেটের চোখেও পানি। চারপাশে আযান দিচ্ছিলো, আর তার মধ্যেই জানোয়ারগুলো আমাদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করছিল। মন চাচ্ছিল ঐ মূহুর্তে tc নিয়ে এই BUET থেকে চলে যাই। কিন্তু কিছুই করার ছিল না। তখন ফজরের আযান হচ্ছিল, শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে বললাম-“জীবনের এক ওয়াক্ত নামাজও যদি কবুল হয়, তাহলে তার বিনিময়ে হলেও এর বিচার করো।”সেদিন যেই কুকুরগুলো জানোয়ারের মত আচরণ করেছিল, তাদের সবাই এখন জেলে, কয়েক জনের রিমান্ডও হয়েছে দেখলাম। এদের সবারই ক্যারিয়ার শেষ, ফাঁসিও হতে পারে। After all, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে… আল্লাহ তাহলে আমার আর্তনাদ শুনেছিলেন। কষ্ট একটাই, হারালাম আবরার ফাহাদ ভাইয়ের মতো মেধাবীকে। তাঁর কাছ থেকে সমাজের অনেক কিছু পাওয়ার ছিল।

৩ টা দিকে প্রায় ৪ ঘন্টার অমানুষিক নির্যাতনের পরে তাকে আবরার ফাহাদের মত সেইম ভাবে ব্যাচমেটরা নিয়ে আসে:

এটা রশীদ হলের ঘটনা । এ বছরের শুরুর দিকে। রশীদ হলের ফেস্ট উপলক্ষে লীগের ১৪ ব্যাচের ভাইরা টাকা তুলছিল । এর মধ্যে ১৫ ব্যাচের এক জনের রুমে টাকা চাইতে আসলে সে নীতিগত কারণে দিতে অস্বীকৃতি জানায় । এ টাকা গুলো কিভা্বে খরচ হয় , কোন খাতে হয় – এগুলোর কোন জবাব দিহিতা নেই । এছাড়া প্রতিটা ফেস্টের শেষে এ টাকায় মদ -গাজা খায় – এগুলা ওপেন সিক্রেট ) এতেই ১৪ এর উপস্থিত সবাই সাথে সাথে খুবই রেগে যায় । এবং তাকে হলে থাকতে দিবে না বলে হুমকি দেয় । এসব বলে তারা চলে যায় । এটা রাত ৮-৯ টার দিকে ঘটনা । এরপর রাত ১২-১ টার দিকে লীগের ১৫ ব্যাচের ছেলেদের দিয়ে ঐ ছেলেটাকে রশীদ হলের কুখ্যাত ৪০৬ নাম্বার রুমে ডেকে পাঠায় । আবরার ফাহাদের মত সেখানেও ঐ ছেলেটার ফেসবুক , মেসেঞ্জার চেক করা হয় । আর সেই সাথে স্ট্যাম্প , খাটের স্ট্যান্ড আর পা দিয়ে লাথি , ঘুষি থাপ্পড় মারা হয় । ৩ টা দিকে প্রায় ৪ ঘন্টার অমানুষিক নির্যাতনের পরে তাকে আবরার ফাহাদের মত সেইম ভাবে ব্যাচমেটরা নিয়ে আসে । পরবর্তীতে জানা যায় ছেলেটার পায়ের হাড় ফ্রাকচার হয়েছে । দীর্ঘদিন তাকে ক্রাচ নিয়ে হাটা চলা করতে হয়েছে । রশীদ হলের ১৫ ব্যাচের সবাই এ কথা গুলো জানে । কিন্তু এদের বিপক্ষে বলার সাহস কার আছে ? কার ঘাড়ে দুইটা মাথা ? ঐ কুখ্যাত রুমের বাসিন্দা হল মিনহাজ ( মেকা ‘১৪ , এখনো হলে থাকে , তবে রুম চেঞ্জ করেছে ) , অয়ন ( সিভিল’১৪) বাধন( সিভিল’১৪) সোরভ ( সিভিল’১৪) । সেই সাথে ঐখানে ছিল ফাহিম ( মেকা’১৪) , সন্তু ( নেইম ‘১৪) । “৮ মাস আগে অমিত সাহা নামের ১৬ এর ভাইটি আমার হাত ভেঙ্গে ফেলে। কারণ-উনাকে দেখলে সালাম দিইনি নাকি কখন। নিম্ন মধ্যবিত্ত ফ্যামিলির বড় ছেলে আমি। ২ মাস তীব্র কষ্টের মাধ্যমে গেছিলাম। ২১ দিন পর আমার অপারেশন হয় এবং প্লেট লাগানো হয়েছে। যার cost ৮০% আমাকে বহন করতে হয়েছে। আমাদের বলা হয়েছিল সিড়ি থেকে পড়ে ভেঙ্গে গেছিল বলতে।। জুনিয়র ছিলাম।ভয়ে বলিনি কাউকে।। আর বললেও কিছু হইতোনা(রিসেন্ট ঘটনা জানেন).. ইভেন আমার ফ্যামিলিকেও আমি বলিনি।কারণ বললে উনারা আমাকে বুয়েটে পড়তে দিবেনা। বাট একটা কমেন্ট ভাইরাল হওয়ার পর ঘটনাটি এখন আমার অভিভাবক এর কানে গেছে।। আর এখন আমাকে প্রেশার দিচ্ছে বুয়েটে পড়া লাগবেনা।চলে যেতে।।প্রেশার মানে খুব প্রেশার। অনেক স্বপ্ন নিয়ে অনেক কষ্ট, অনেক সারভাইব করে এখানে এসেছি। এখন স্বপ্নটা অধরা রেখেই যা সম্ভব চলে যেতে হবে। সাথে কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা ছাড়া। “

এছাড়া ৩ তারিখ দিবাগত রাতে শেরে বাংলা হলের ২০২ কক্ষে শেরে বাংলা হলের ছাত্রলীগের কর্মী ইফতি মোশারফ সকাল (বিএম ই১৬), আশিকুল ইসলাম বিটু(কেমিক্যাল ১৬), মুজতবা রাফিদ (কেমিক্যাল১৬) সহ মোট ৪জন হামলা চালায়। তারা এহতেশামকে (ইইই ১৫) প্রচণ্ড মারধর করে। মারধরের পর তারা তাকে তখনই রুম থেকে বের হয়ে যেতে বলে এক কাপড়ে। তারা এহতেশাম কে সাথে কোন কিছু নিয়ে যেতে দেয়নি। এবং তারা জানায় যাতে এহতেশামের জিনিসপত্র পরে এসে তার কোন বন্ধু নিয়ে যায়। সে এবং তার অন্যান্য রুমমেটরা যাতে আর কোনদিন হলে না আসে, কারণ এটি “হল প্রটোকল”। কিন্তু চার তারিখ দিবাগত রাত থেকে তার রুমে তার এবং তার রুমমেটদের কোনো মালামাল পাওয়া যাচ্ছে না। এহতেশামের একটি হাই এন্ড পিসি ছিল যা গুম। পিসির বাজার মূল্য ১ লক্ষ ৩৫ হাজার টাকা। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য ৪ তারিখ দিবাগত রাত ১ টায় তার রুমে সেই ছাত্রলীগ কর্মীরা আবার আসে এবং তার ১৭ ব্যাচের রুমমেটকে (একমাত্র যাকে ওই রুমে থাকার ‘অনুমতি’ দেওয়া হয়েছে) বের হয়ে যেতে বলে। রাত ১ টা ৪০ এ সেই রুমমেট আবার রুমে ফিরে আসলে দেখে রুমে অন্য কারো মালামাল নেই, সেই ১.৩৫ লাখ টাকার পিসিসহ। এরপর থেকেই পিসির অনেক খোঁজ লাগানোর চেষ্টা করা হলেও ছাত্রলীগের কোন কর্মী বা হলের অন্য কেউ কোন তথ্য দিয়ে সহায়তা করেনি। এক্ষেত্রে, “শান্তিপূর্ণ” সমাধানের জন্য তৎক্ষণাৎ কাউকে জানানো হয়নি। এই ব্যাপারে সহকারী প্রভোস্ট শাহিন স্যারকে ফোন দেওয়া হলে তিনি জানান “আমি প্রভোস্ট নই।” “আমি তোমাকে কোন প্রকার সাহায্য করতে পারব না।” “তুমি আমাকে এত দিন পরে কেন এই ঘটনা জানাচ্ছ?” এই ব্যাপারে জানানো দরকার, এক বছর আগে যখন দায়ানকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাচ্ছিল তখন এহতেশাম প্রমান দেখতে চাইলে তাকে বুয়েট ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা রুমে বেঁধে পেটায়। এবং পরবর্তীতে অনেক ধরনের হেনস্থা করে। তখন হল কর্তৃপক্ষ কোন প্রকার সাহায্য এহতেশামকে করেনি। এহতেশাম প্রশ্নের উত্তরে এই অসহযোগিতা ও ঘটনার উল্লেখ করলে এবং মিডিয়াতে এই ঘটনা জানানো হবে জানালে সহকারী প্রভোস্ট স্যার ফোন কেটে দেন। প্রভোস্ট স্যারকে ফোন দেওয়া হলে তিনি ওই রাতের সিসি টিভি ফুটেজ সহ অন্য যেকোন ব্যাপারে পূর্ণ সহযোগিতা করতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

 

Comments

comments