আইআইইউসি ছাত্রলীগের নির্যাতন ‘যে বিচার আজও পাইনি’

আলাউদ্দীন খান রাজু

২১শে ফেব্রুয়ারী ২০১৮।বিশ্ববিদ্যালয় আয়ােজিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে র‍্যালী এবং অডিটোরিয়ামে আলােচনা সভা শেষ করে সেন্ট্রাল মসজিদের সামনের দিকে হাঁটতে যাই ।

তখন হঠাৎ করেই ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী ইইই বিভাগের তানভীর ও আইন বিভাগের ঊচো মারমা এসে আমার পথরােধ করে গেইটের বাহিরে তাদের সাথে যেতে বলে। আমি কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা বলে বাহিরে গেলে বলা হবে। আমার কেন যেন সন্দেহ হলো,তাই আমি ওদের সাথে বাহিরে যেতে রাজি হলাম না।

কিন্তু তারা আমাকে অনেকটা জোর করেই বাহিরে নিয়ে যেতে চাচ্ছিল। এরই মধ্যে আরো কয়েকজন গেইটের ভিতর ঢুকে যায়। ইইই ডিপার্টমেন্টের তানভীর আমাকে পিছন থেকে ধরে এবং তার সাথে হাসান হাবিব মুরাদ (আইডি:L143022) বিবিএ ডিপার্টমেন্টের সাইফুজ্জামান (আইডি:B-161432), মুসলিম উদ্দিন মুকিত (আইডি:B-143396) সহ আরাে কয়েকজন জোর করে টেনে হিচড়ে গেইটের বাহিরে নিয়ে যেতে চায় ।

তখন বাহির থেকে কয়েকজন “আক্রমণাত্মক ও অশ্লীল স্লোগান” দিয়ে দিয়ে ভিতরের দিকে আসছিলো। সিকিউরিটি গার্ড তখন এগিয়ে আসলে গার্ডকে ধাক্কা দিয়ে ওরা ভিতরে ঢুকে আমাকে জোর করে গেইটের বাহিরে নিয়ে যায় ।

গেইট পার হওয়ার সাথে সাথেই পিছন থেকে আমাকে একজন সজোরে লাথি মারলে আমি পড়ে যাই।এরপর উঠতে চাইলে কয়েকজন উপর্যুপরি কিল-ঘুষি মারতে থাকে। এক পর্যায়ে আমি মাটিতেই লুটিয়ে পড়লে আরাে ১০/১৫ জন এলােপাথাড়ি কিল-ঘুষি,লাথি মারতেই থাকে প্রায়২০-২৫মিনিট। এরপর পুলিশ এসে আমাকে উদ্ধার করে ।

এ সময় পুলিশ থেকেও আমাকে ছিনিয়ে নিয়ে যেতে চেষ্টা করে সন্ত্রাসী ডলার ও উঁচো মারমাসহ আরাে কয়েকজন । পরবর্তীতে আবু বকর (রাঃ) হলের প্রভােস্ট আ ফ ম নুরুজ্জামান স্যার এসে আমাকে পুলিশ থেকে রক্তাক্ত ও নিস্তেজ অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে প্রেরণ করেন।

মহান আল্লাহ আমাকে সেদিন নিজ রহমত দিয়ে হায়েনাদের হাত থেকে বাচিয়ে ছিলেন না হয় আমাকেও সেদিন আমার পরিবারের কাছে আজকের আবরার হয়ে ফিরে যেতে হতো।

প্রায় একটি মাস আমাকে বিছানায় পড়ে থাকতে হয়েছিলো, এরপরেও এই ঘটনা যেন কাউকে না জানাই এজন্য পরবর্তীতে তারা আমাকে বিভিন্ন মাধ্যমে নিয়মিত হুমকি-ধমকি দিতেই থাকে।

আমি কোর’আনিক সাইন্স ক্লাবের জি.এস হওয়ার পরেও তাদের প্রতিনিয়ত হুমকির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে এমনকি ডিপার্টমেন্টেও আমি স্বাভাবিক চলাফেরা করতে নিরাপত্তাহীনতা বোধ করি।

অবশেষে ২ফেব্রুয়ারি ২০১৯। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী বাহিনী যেদিন অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে শিক্ষকদের সাথে চরম পর্যায়ের বেয়াদবি করে ও সাধারণ ছাত্রদেরকে ভয়ভীতি দেখিয়ে হল দখল করে, সেদিনও ধারালো অস্ত্র নিয়ে আমার রুমে আমাকে মারতে যায়। কিন্তু আমি বাড়িতে থাকায় আমাকে পায়নি।

তারপরেও আমার সন্ধানের জন্য আমার রুমমেটদের টর্চার করে। অতঃপর আমার কাপড়-চোপড়, বেড বালিশসহ ড্রয়ার থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়। এবং আমাকে যেখানে পাবে সেখানে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে যায়।

এখানে একটা কথা বলে রাখি, ২১ শে ফেব্রুয়ারি’১৮ তে আমার এ নির্মম ঘটনা ঘটার পরে আমি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিকট লিখিত অভিযোগ পত্র জমা দিয়ে দোষীদের শাস্তি চেয়েছিলাম।

এবং এ ক্যাম্পাসের ভিতরে আমিই প্রথম ছাত্রলীগের বর্বরতার শিকার হয়েছিলাম। সিসিটিভিতে এ নির্যাতনের সম্পূর্ণ ভিডিও দেখার পরেও ঐ গুন্ডাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় আজও পর্যন্ত কোন বিচার করেনি। কেন করেনি,তা আজও অজানা।

যদি করতো, তাহলে হয়তো আজ এই সন্ত্রাসীদের এত্ত সাহস বাড়তোনা, আর কাউকে আমার মতো নির্যাতনের শিকার হতে হতোনা।

পরবর্তীতে বিচার না পেয়ে ভাবলাম যেখানে জীবনের নিরাপত্তাই নাই,সেখানে থেকেও লাভ নাই, বাধ্য হয়েই হলের সীট ও বিশ্ববিদ্যালয়ে এডমিশন ক্যান্সেল করে চলে আসি।

এখনো প্রহরগুণি প্রাণের ক্যাম্পাসে মাস্টার্স শেষ করার…

লেখক: আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম

কোরআনিক সাইন্সেস এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ
৩৮তম ব্যাচ

Comments

comments