বুয়েটের অন্ধকার ইতিহাস: আমার হায়াত ছিলো বলেই আমি আবরার হইনি!

আবরার হত্যাকাণ্ডের পর সারাদেশে চলছে বিক্ষোভ। অনেকের মনে প্রশ্নও যেগেছে বুয়েট কি এমন ছিলো? এমন প্রশ্নের উত্তর মিলেছে বুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থীদের কাছে।

২০১৮ সালের নিজের অভিজ্ঞতার বর্ননা দিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বুয়েটের এক শিক্ষার্থী। তিনি বলছিলেন বুয়েট ছাত্রলীগের সেই টর্চার সেলে নিজের নির্যাতনের কথা।

তিনি বলেন, আমার সাথে ঘটনাটা ঘটে ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে। তখন সেটা ছিলো বুয়েটে আমার প্রথম সপ্তাহ ক্লাস। আর আমি ক্লাস করতাম বাসা থেকে। তাই হল সম্পর্কে আমার কোন ধরনের ধারনা ছিলো না। নতুন ক্যাম্পাসে তখন কারো সাথে ঠিক মতো বন্ধুত্বও গড়ে উঠেনি। আমাকে ডাকা হয় বুধবার আমাদের ক্লাস শেষে। আর সেদিন আমাদের কিছু বই কেনার জন্য ক্লাস শেষে নীলক্ষেত যাই । এরপর ক্যাম্পাস থেকে ফোন দেয় ছাত্রলীগেরে এক নেতা। মূলত আমাকে ডাকা হয়েছিলো আমার একটা কমেন্টের জন্য। যেটা না ছিলো বুয়েট সংশ্লিষ্ট কোন পেজের না ছিলো ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে।

তিনি বলেন, এরপর আমাকে হলে আনা হলো। সিভিলের ১৬ ব্যাচের এ সেকশনের আবরার, তৌসিফ ও তাদের সাঙ্গপাঙ্গরা। এরপর আমাকে শেরে বাংলা হলে নিয়ে যায় ১৭ ব্যাচের এক শিক্ষার্থী। তার সাথে তখন তৌসিফ, আবরার আসে নাই। সেদিন শেরেবাংলা হলের এক রুমে নিয়ে বসানো হলো। সেখানে আমাকে কিছু প্রশ্ন করলো সিগারেট খাই নাকি, প্রেম করি নাকি, নামাজ পড়ি নাকি আরো অনেক প্রশ্ন করে। জেরার পর ১৫ ব্যাচের এক শিক্ষার্থী আমাকে নিয়ে অন্য রুমে যায়। তখন মনে হচ্ছিলো আমি যেন এক রিমান্ডের আসামী। এরপর যে রুমে নেওয়া হলো আগে থেকেই ৩ জন ছিলো। এরপর আবরার, তৌসিফসহ আরো সাঙ্গপাঙ্গরা প্রবেশ করলো। জীবনে প্রথম এমন ঘটনার মুখমুখি। রুমের দরজা অফ করে দিলো সবাই সিগারেট ধরালো। স্ট্যাম্প ছিলো খাটের নিচে সেটা বের করলো। প্রথমে কি জন্য কমেন্ট করেছি সেই জন্য জেরা শুরু করলো। পরে মোবাইল চাইলো ফেসবুকে ঢুকলো। অনেক খোঁজাখুজি করার পরো কোন রাজনৈতিক দলের সাপোর্ট করা বা তাদের কোন পেজে লাইক কমেন্ট কিছুই পেলো না। তারা আমাকে শিবির বানানোর অনেক চেষ্টা করেছে।

আমার বিরোদ্ধে কোন অভিযোগ না পেয়ে এরপর শুরু হলো এসব জানোয়ারগুলোর বেধে দেয়া নিয়ম যা হলে না থাকার কারনে আমি জানতাম না। সিনিয়রদের সামনে কিভাবে দাড়াতে হয়। দুই হাত টান করে নিচের দিকে মাথা নুইয়ে রেখে। সিনিয়ররা ভুল কিছু বললে বা অপবাদ দিলেও চুপ করে থাকা। তখন শুরু হলো তাদের মাইর। প্রথমে থাপ্পড়। একেকটা থাপ্পড়ে আমি চোখে ঘোলা দেখতেছি। এভাবে প্রথমে একচোট মারলো আবরার। সে ১২-১৪ টা থাপ্পড় দিয়েছে। পরে তার পালা শেষ। এরপর আসলো ফিফটিনের একজন। সে স্ট্যাম্প দিয়ে কতক্ষণ পিটালো। বাড়িগুলো দিয়েছে তার সব শক্তি প্রয়োগ করে। তখন আবরার বের হয়ে যায়। আর সেখানে উপস্থিত সবাই সিগারেট খাচ্ছিলো। কেউ গান শুনতেছিলো। কেউ মোবাইল চালাচ্ছিলো। আর আমার অসহায়ত্ব দেখে তারা হাসতেমছিলো।

এরপর আসলো তৌসিফ। তার এক একটা থাপ্পড় যেনো বজ্রধ্বনির মতো কানে এসে বাজতেছিলো। সে থাপ্পড় দিয়েই চলছিলো। এরপর রুমে বাইরে থেকে কয়েকজন এসে আমাকে খেলনা পুতুলের মত পিটাতে লাগলো। এভাবে পালাক্রমে তাদের হিংস্রতা অনেকক্ষন চলতে থাকলো। ভুল হলে সরি বলা যাবে না। তারপর মারার সময়ও মাথা নিচের দিকে থাকতে হবে। তাদের দিকে তাকানো যাবে না। তাদের সামনে কথা বলার সময় সোজা থাকতে হবে। হাত নাড়ানো যাবে না। প্রশ্নের উত্তর দিলে মাথা নিচু করে দিতে হবে। আরো কত উদ্ভট নিয়ম যে সেদিন দেখলাম। প্রত্যেকটা নিয়মের জন্য আমাকে মারা হইছে। অনেক মারছি। আমাদের নিজেদেরই হাত ব্যাথা হয়ে গেছে। এরপর তারা তাদের নাম্বার দেয়। বলে পরেরদিন(মানে শনিবার) তাদের এসে কল দিতে। ওইখানেই শেষ করে দিছে। তারা ভুলে গেছে। কারণ তাদের কাছে তখন এইগুলো পানিভাতের মতো হয়ে গেছে ।

কিন্তু তারা শেষ করে দিলেও তো আমার শেষ হয়নি। আমার টানা দুইদিন প্রচন্ড মাথা ব্যাথা ছিলো। আর পায়ে স্ট্যাম্পের বাড়ি দেয়ার কারনে ওই জায়গা গুলো ব্যাথায়, ফুলে রক্ত জমে গিয়েছিলো। অনেকদিন সুস্থ স্বাভাবিকভাবে হাটাচলা করতে পারি নাই । আর মানসিকভাবেও অনেক বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। আর পড়ালেখাতে মনযোগ দিতে পারছিলামনা। এখনোও ঠিক মতো হাটতে পারিনা।

তিনি বলেন, আমার হায়াত ছিলো বলেই আমি আবরার ফাহাদ হই নাই। এই তৌসিফ, আবরারদের এত সাহস আসে কোথা থেকে। আমি ভিকটিম হিসেবে সকলের নিকট আবেদন বুয়েট ক্যাম্পাস থেকে সকল ধরনের ছাত্ররাজনীতি চিরদিনের জন্য নিষিদ্ধ করতে হবে এবং এর যথাযথ প্রয়োগ দৃশ্যমান হতে হবে এবং সাধারণ ছাত্রদের একটা দল থাকবে যারা এইসব আবরার,তৌসিফদের প্রতিহত করবে। ক্যাম্পাসকে সন্ত্রাসমুক্ত রাখবে। ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি কঠোর আইন করে বন্ধ না হলে এরকম আবরার তৌসিফরা আসতেই থাকবে। আর সনি আপু,আবরার ফাহাদদের লাশ আর আমাদের মতো ভিক্টিমদের সারি আরো দীর্ঘ হতে থাকবে।

Comments

comments