আবরার হত্যা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি

অলিউল্লাহ নোমান

একটি দেশ কতটা বিচারহীনতায় পৌছাতে পারে সেটার কি প্রমানের দরকার আছে! সহপাঠিকে পিটিয়ে খুনের প্রতিবাদে প্ল্যাকার্ডে লিখা হয়েছে-‘জানি বিচার চেয়ে লাই নেই, তবুও আবরার হত্যার বিচার চাই।’ দখলদার সরকারের তদন্ত এবং বিচারের প্রতি যে কারো আস্থা নেই সেটা বুঝার জন্য এ প্ল্যাকার্ড কি যথেষ্ট নয়? বিচারহীনতার সংস্কৃতি যে পুরো সমাজকে গ্রাস করেছ এটা বুঝার জন্য শিক্ষিত তরুন সমাজের এমন প্ল্যাকার্ড বহনই যথেষ্ট। যেসব তরুন এ প্ল্যাকার্ড বহন করছেন, তারা সমাজের সবচেয়ে সচেতন মানুষদের একটি অংশ। সুতরাং সমাজের সচেতন মানুষরা এখন জানেন, দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি বিরাজমান। বিচার চেয়ে লাভ হয় না।

আরেকটি বিষয় স্পষ্ট, যে রাষ্ট্র নিজে বিচারবহির্ভূত বা বিচারিক হত্যাকান্ড চালায়। সে রাষ্ট্রের চালকদের ছাত্র সংগঠন ত কাউকে পিটিয়ে হত্যা করতেই পারে!

বুয়েট হচ্ছে দেশের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর শীর্ষে। মেধাবীদের মধ্যে বাঁছাইকৃত ছাত্র ছাত্রীরাই এখানে ভর্তির সুযোগ পায়। এমনি একজন মেধাবী ছাত্র আবরারকে গতরাতে পিটিয়ে হত্যা করেছে ছাত্রলীগ!

কেন এমন বিচারহীনতার সংস্কৃতি আসুন একটু দেখে নেই:

সকালে ঘুম থেকে উঠেই পত্রিকায় চোখ বুলানোর অভ্যাস। একে একে কয়েকটি পত্রিকার শিরোনাম গুলোতে ঢু মারি প্রথমেই। সব পত্রিকায়ই শিরোনাম দেখি আবরারকে পিটিয়ে হত্যা করেছে ছাত্রলীগ। কিন্তু দৈনিক প্রথম আলোর শিরোনামে গিয়ে চোখ আটকে যায়। প্রথম আলোর এবিষয়ে প্রথম নিউজ করে ‘বুয়েটের ছাত্রের রহস্যজনক মৃত্যু’ শিরোনামে। এ নিউজে তারা বুঝানোর চেষ্টা করে মৃত্যুটা খুবই রহস্যজনক। কেন সে বাইরে গিয়েছিল সেটা কেউ জানেন না।

দ্বিতীয় নিউজে তারা শিরোনামে লিখে, পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ

নিথর দেহ পড়ে আছে। সবাই বলছেন, তাকে ছাত্রলীগ পিটিয়ে মেরেছে। প্রথম আলোর কাছে কে বা কারা পিটিয়ে মারার অভিযোগ করেছে। কে করলেন তাদের কাছে এমন অভিযোগ? এ অভিযোগে ত তখনো কোন মামলা হয়নি। মামলা হলে বুঝতাম মামলায় পিটিয়ে মারার অভিযোগ করা হয়েছে! নিউজের একেবারে শেষের লাইনে গিয়ে লেখা হয়, ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে পিটিয়ে মারার অভিযোগ উঠেছে। এই হচ্ছে দেশের শীর্ষ গণমাধ্যম গুলোর চরিত্র!!!

আজকে যদি আবরার প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান বা তাদের পত্রিকার কোন কর্তার ছেলে হতেন তাইলে কি এমন শিরোনাম দিতেন তারা? বা ইসলামপন্থি কোন ছাত্র সংগঠের কর্মীরা যদি কাউকে এভাবে পিটিয়ে হত্যা করতেন তাইলে কি লিখেতনে তারা তখন! এমন প্রশ্ন যে কারা মানে জাগতে পারে প্রথাম আলোর নিউজ দেখে। নিজেকে তখন প্রশ্ন করলাম বিচারহীনতা কি এমনিতেই দেশকে গ্রাস করেছে? যে রাষ্ট্রে গণমাধ্যম থেকে শুরু করে সবাই দলকানা হয়, সে রাষ্ট্রে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দিনে দিনে বৃদ্ধি পাবে না ত কি হবে?

প্রথম আলোর নিউজটি দেখে তখন হঠাৎ মনে পড়ে গেল একটি বিষয়। ২০১০ সালে হাইকোর্ট বিভাগে বিচারপতি নিয়োগ নিয়ে একটি নিউজ লিখেছিলাম। জানতে পারলাম রাজশাহি বিশ্ববিদ্যালয়ে খুনের মামলার প্রধান আসামী (চার্জশীট ভুক্ত এবং বিচারাধীন মামলা) একজন অ্যাডভোকেট বিচারপতি হচ্ছেন। পরের দিন দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় নিউজ লেখলাম, খুনের মামলার প্রধান আসামীসহ ১০জন নতুন বিচারপতি নিয়োগ হচ্ছে। এ নিউজের প্রতিবাদ করে তখন বামপন্থি কিছু নেতা একটি ব্যাখ্যা পাঠালেন। এতে তারা বলার চেষ্টা করেন, রাজশাহি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র জীবেন খুনের আসামী, যাকে বিচারপতি বানানো হচ্ছে তিনি একজন প্রগতিশীল মানুষ। যিনি খুন হয়েছিলেন তিনি ছিলেন শিবিরের কর্মী। তার মানে প্রতিবাদে তারা বুঝানোর চেস্টা করেন, শিবির কর্মীকে খুন করা হয়েছিল। সুতরাং ওই খুনের প্রধান আসামীকে বিচারপতি বানাতে সমস্যা নেই। নিউজটি প্রকাশের পর যদিও তাঁকে শপথ দিতে অপরাগতা প্রকাশ করেছিলেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মোহাম্মমদ ফজলুল করীম। ৬ মাস পর ফজলুল করিম অবসরে গেলে খায়রুল হক প্রধান বিচারপতি হন। নিয়োগের ৬ মাস পর খায়রুল হক খুনের মামলায় চার্জশীটভুক্ত প্রধান আসামী রুহুল কুদ্দুক বাবুকে বিচারপতি হিসাবে শপথ দেন।

এই কুসন্দিটা একটু টানলাম, বিচারহীনতার সংস্কৃতি কেন চালু হয়েছে সেটা বুঝানোর জন্য। কারন বলতে চাচ্ছিলাম বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে। এ সংস্কৃতি একদিনে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সমাজের তথাকথিত স্বঘোষিত প্রগতিশীল (বাকী সব মানুষ তাদের দৃষ্ঠিতে দুর্গতিশীল!) দাবীদাররা মনে করেন, ভিন্নমত বা ইসলামের গন্ধ থাকলে তাদের খুন করা জায়েজ! শুধু তাই নয়, খুনিকে পুরস্কৃত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যেমন রুহুল কুদ্দুস বাবুকে বিচারপতি হিসাবে নিয়োগ দিয়ে এবং তাঁর পক্ষে সাফাইয় (শিবির খুন করেছিল বলে) গেয়ে তারা প্রমান করলেন।

আবরারকেও শিবির বানোর চেষ্টা চলছে। তাঁর ফেইসবুক আইডি পরীক্ষা করে নাকি পাওয়া গেছে শিবিরের অফিসিয়াল পেইজে লাইক দেয়া আছে! প্রশ্ন হচ্ছে, শিবির কি দেশে নিষিদ্ধ সংগঠন? নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মী হলেও ত কাউকে পিঠিয়ে হত্যার এখতিয়ার প্রচলিত আইনে নেই। তাহলে যারা একজন তরুণ মেধাবী ছাত্রকে নিজের রুম থেকে ডেকে নিয়ে আরেক রুমে পিটিয়ে হত্যা করলেন, তারা এ দু:সাহস কোথায় পেলেন? রাষ্ট্র কি তাদের এ দু:সাহের যোগানদাতা নন?

পত্রিকায় দেখলাম, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, এবিয়ে আইজি সাহেব তাঁর সাথে কথা বলেছেন! অর্থাৎ ছাত্রলীগ খুন করেছে। এখন কি করবে, সেটাই হয়ত: জানতে চেয়েছেন আইজি সাহেব! নতুবা খুনিদের ধরতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের সাথে কথা বলার প্রয়োজন আছে কি?? ওবায়দুল কাদের সাহেব আবার আইজি সাহেবকে বলেছেন, তাদের প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলার জন্য।

প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিটের একজন মেধাবী ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা করা হল। সেটার জন্য আইজি সাহেবকে মন্ত্রির সাথে কথা বলতে হবে কেন? মন্ত্রি আবার বলতে হবে কেন প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলাপ করেন? তাইলে বুঝা যাচ্ছে, খুনের বিচার হবে কি না, সেটা প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ারে রয়েছে! এখন হয়ত: প্রধানমন্ত্রী বলতে পারেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবাসে কারো রুম পাহারা দেয়ার দায়িত্ব সরকারের নয়! যেমনটা তিনি বলেছিলেন, সাংবাদিক দম্পতি সাগর এবং রুনি হত্যাকান্ড নিয়ে। তখন তিনি বলেছিলেন, কারো বেডরুম পাহারা দেয়ার দায়িত্ব সরকারের নয়!

বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষরা উস্কানি দিয়ে আজকের এ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। রাষ্ট্র যাকে ইচ্ছা হচ্ছে তাঁকে ধরে নিয়ে খুন করছে। পরবর্তীতে ক্রসফায়ারের একটি বয়ান তৈরি করে এটাকে বৈধতার লেবাস দেয়ার চেষ্টা করা হয়। আবার যাকে ইচ্ছা তাঁকে নিজের ঘর থেকে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর লোকর ধরে নিয়ে গুম করছে। এই ক্রসফায়ার এবং গুমের বিষয়েও দলকানা দৃষ্টি থেকে দেখা হয়। গণমাধ্যম গুলো এবিষয়ে গত ১০ বছর ধরেই উস্কানি দিতে দেখা যায়। গুম এবং খুনকে জায়েজ করার বয়ান তারা নিজেরাও তৈরি করেন ক্ষেত্রেমত।

অপরদিকে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বিচারের নামে ঘটনা সাজিয়ে ফাঁসি দেয়া হচ্ছে। অপরাধীর বিচার হতে আপত্তি নেই। কিন্তু ঘটনার সাথে সম্পৃক্ততা নেই, এমন ঘটনায় জড়িয়ে স্বাক্ষীদের ট্রেনিং দিয়ে মামলা সাজিয়ে ফাঁসির আয়োজন হয়। বিচারাতি নিজামুল হক নাসিম এবং তাঁর বন্ধু আহমদ জিয়াউদ্দিনের মধ্যে স্কাইপ কথোপথন এমনটাই প্রমান করে।

সুতরাং বিচারহীনতার এমন সংস্কৃতি যারা তৈরি করেছেন, যারা উস্কানি দিয়ে এ গুলোকে জায়েজ করার চেষ্টা করছেন, তারা অথবা তাদের পরবর্তী প্রজন্ম হলেও একদিন হয়ত: এমন ঘটনার শিকার হলে আশ্চার্য্য হওয়ার কিছু থাকবে না। এমন সংস্কৃতি একটি রাষ্ট্র ও সমাজকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের পথেই নিয়ে যাচ্ছে। বিচার বিহর্ভূত, বিচার সব হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে সোচ্ছার হওয়ার সময় পার হয়ে যাচ্ছে। নিজ নিজ জায়গা থেকে প্রতিবাদে সোচ্ছার হতে পারলে এ সমাজ রক্ষা পাবে। নতুন, আপনি, আমি বা আমাদের কারো ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিরাপদ নয়।

লেখক:সাংবাদিক, আমার দেশ

Comments

comments