আবরার হত্যায় জড়িত ছাত্রলীগ নেতারা, গায়েব সিসিটিভি ফুটেজ!

ভারতের সাথে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিরোধী একতরফা চুক্তির বিরুদ্ধে একটি বিশ্লেষণধর্মী ফেসবুক স্ট্যাটাস দেয়ায় বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করেছে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা।

রবিবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে বুয়েটের শেরে বাংলা হলে এই ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।

নিহত শিক্ষার্থী আবরার বুয়েটের তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগের (ইইই) দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত ছিলেন।

জানা যায়, শিবির আখ্যা দিয়ে আবরারকে রবিবার রাত আটটার দিকে শেরে বাংলা হলের ১০১১ নম্বর কক্ষ থেকে ডেকে নিয়ে যায় বুয়েট ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এদের মধ্যে ছিলেন ১) মেহেদী হাসান রাসেল, সেক্রেটারি, বুয়েট ছাত্রলীগ, ২) মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, ক্রীড়া সম্পাদক, বুয়েট ছাত্রলীগ, ৩) আশিকুল ইসলাম বিটু, সহ-সম্পাদক, বুয়েট ছাত্রলীগ, ৪) অনিক সরকার, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, বুয়েট ছাত্রলীগ, ৫) ফারহান জাওয়াদ , সহ সম্পাদক ,বুয়েট ছাত্রলীগ, ৬) মেহেদি হাসান রবিন, সাংগঠনিক সম্পাদক, বুয়েট ছাত্রলীগ ৭) ইসতিয়াক হাসান মুন্না- গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক, ৮) অমিত সাহা, উপ-আইন সম্পাদক, বুয়েট ছাত্রলীগ, ৯) মুজতবা রাফিদ, উপ-দপ্তর সম্পাদক, বুয়েট ছাত্রলীগ, ১০) ইফতি মোশাররফ সকাল, উপ-সমাজসেবা সম্পাদক, বুয়েট ছাত্রলীগ, ১১) মুহতাসিম ফুয়াদ, সহসভাপতি, বুয়েট ছাত্রলীগ। পরে রাত আড়াইটার দিকে পিটিয়ে হত্যা করে হলের সিঁড়ির পাশে আবরারের দেহ ফেলে রাখে তারা। এরপর ডাক্তারকে খবর দিলে তিনি এসে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোহরাব হোসেন ফাহাদের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, আমরা ধারণা করছি রাত দুইটা থেকে আড়াইটার দিকে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। আমরা মরদেহ উদ্ধার করেছি ভোরে। তার পায়ের উপরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার চেষ্টা চলছে।

গায়েব করা হয়েছে সিসিটিভি ফুটেজ, গ্রেপ্তার ৬

বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদকে হত্যার সময়কার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ গায়েব করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবাদে হল প্রভোস্ট অফিস ঘিরে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করলেও এখনও হদিস মেলেনি।

হলের সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, আবরার গুরুত্বপূর্ণ আলামত থাকায় এ পাশবিক হত্যাকাণ্ডের সময়কার প্রমাণ গায়েব করতে হলের সিসিটিভি ফুটেজ মুছে ফেলেছে হল প্রশাসন।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, রাত ২টা ৬ মিনিটের পর আর কোনো ফুটেজ পাওয়া যাচ্ছে না। ওই ফুটেজ পেলে হত্যার বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।

মিহি নামে বুয়েটের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা সিসিটিভি ফুটেজের জন্য প্রভোস্টের রুম অবরুদ্ধ করে রেখেছি। যতক্ষণ না পর্যন্ত আমাদের সিসিটিভি ফুটেজ দেখানো হবে আমরা এই জায়গা ছাড়ব না।’

এদিকে বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ছাত্রলীগের ৬ নেতাকে আটক করেছে পুলিশ। বর্তমানে তাদের চকবাজার থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার আবদুল বাতেন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

আটককৃতরা হলেন- বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এবং মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী অনিক সরকার, ক্রীড়া সম্পাদক ও নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান ও সহ-সভাপতি ফুয়াদ হোসেন।

ফেসবুকে কি লিখেছিলেন আবরার?

১.৪৭ এ দেশভাগের পর দেশের পশ্চিমাংশে কোন সমুদ্রবন্দর ছিল না। তৎকালীন সরকার ৬ মাসের জন্য কলকাতা বন্দর ব্যবহারের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করল। কিন্তু দাদারা নিজেদের রাস্তা নিজেদের মাপার পরামর্শ দিছিলো। বাধ্য হয়ে দুর্ভিক্ষ দমনে উদ্বোধনের আগেই মংলা বন্দর খুলে দেওয়া হয়েছিল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ ইন্ডিয়াকে সে মংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য হাত পাততে হচ্ছে।

২.কাবেরি নদীর পানি ছাড়াছাড়ি নিয়ে কানাড়ি আর তামিলদের কামড়াকামড়ি কয়েকবছর আগে শিরোনাম হয়েছিল। যে দেশের এক রাজ্যই অন্যকে পানি দিতে চাই না সেখানে আমরা বিনিময় ছাড়া দিনে দেড়লাখ কিউবিক মিটার পানি দিব।

৩.কয়েকবছর আগে নিজেদের সম্পদ রক্ষার দোহাই দিয়ে উত্তরভারত কয়লা-পাথর রপ্তানি বন্ধ করেছে অথচ আমরা তাদের গ্যাস দিব। যেখানে গ্যাসের অভাবে নিজেদের কারখানা বন্ধ করা লাগে সেখানে নিজের সম্পদ দিয়ে বন্ধুর বাতি জ্বালাব।

হয়তো এসুখের খোঁজেই কবি লিখেছেন-
“পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি
এ জীবন মন সকলি দাও,
তার মত সুখ কোথাও কি আছে
আপনার কথা ভুলিয়া যাও।”

নিহত আবরার কি শিবিরের নেতা ছিলেন?

বিভিন্ন মিডিয়ায় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা আবরারকে শিবির কর্মী বলে আখ্যা দিলেও নিহতের পরিবার দাবি করছে ভিন্ন। নিহত বুয়েট শিক্ষার্থী আবরারের মায়ের দাবি আবরার ফাহাদের কোনো শত্রু ছিল না। তাঁদের পুরো পরিবার আওয়ামী লীগের রাজনীতির সমর্থক। তাঁদের সন্তানকে কেন এভাবে জীবন দিতে হলো, বুঝে উঠতে পারছেন না তিনি।

আজ সোমবার সকালে নিহত বুয়েট শিক্ষার্থী আবরারের কুষ্টিয়া শহরের পিটিআই সড়কের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় সেখানে শোকের মাতম। পরিবারের সদস্যেরা বুঝে উঠতে পারছেন না এত মেধাবী, শান্ত ছেলেটিকে কে হত্যা করতে পারে।

আবরারের বাবার নাম বরকতুল্লাহ। তিনি বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের নিরীক্ষক কর্মকর্তা ছিলেন। মা রোকেয়া খাতুন একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষক। দুই ভাইয়ের মধ্যে আবরার ফাহাদ বড়। ছোট ভাই আবরার ফায়াজ ঢাকা কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। সেও ঢাকা কলেজের হোস্টেলে থাকে। বুয়েটের শের-ই-বাংলা হলের কাছেই তাঁর হোস্টেল। কুষ্টিয়ার পিটিআই সড়কে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফের বাসার পাশেই তাঁদের বাড়ি।

চাচা মিজানুর রহমান দাবি করেন, সে শিবিরের কর্মী—এমন কথা রটাচ্ছে সবাই। এটা বানোয়াট, আমরা সবাই আওয়ামী লীগের সমর্থক। হানিফ সাহেবের বিভিন্ন মিটিংয়েও আমরা যাই। আবরার এমনিতে তাবলিগে যেত। বুয়েটে ভর্তির পর দুই তিনবার সে তাবলিগে গিয়েছিল।

মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের (ইইই) বিভাগের লেভেল-২ এর টার্ম ১ এর ছাত্র ছিলেন। তিনি শের-ই-বাংলা হলের ১০১১ নম্বর কক্ষে থাকতেন। তার বাড়ি কুষ্টিয়া শহরে। কুষ্টিয়া জেলা স্কুলে তিনি স্কুলজীবন শেষ করে নটরডেম কলেজে পড়েন।

Comments

comments