কিশোর গ্যাংয়ে যোগ না দেয়ায় স্কুলছাত্রকে হত্যা

যাত্রাবাড়ী থানাধীন মাতুয়াইলের কোনাপাড়া গোল্ডেন ব্রিজের খাল থেকে ২০১৭ সালের ২২ আগস্ট উদ্ধার করা হয়েছিল স্থানীয় মান্নান স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র নাঈমুল ইসলাম নাঈমের (১৪) লাশ। এ ব্যাপারে নাঈমের মা নার্গিস বেগম বাদী হয়ে যাত্রাবাড়ী থানায় হত্যা মামলা করেন।

এতে নাঈমের সহপাঠী নাসিম, তানজিম ও আবদুল্লাহকে আসামি করা হয়। পুলিশ তাদের গ্রেফতারও করে। এরপর তিনজনের পরিবার নাঈমের মাকে মামলা আপস করতে তিন লাখ টাকা দিতে চান। কিন্তু টাকার লোভে না পড়ে ছেলের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে অনড় থাকেন নার্গিস বেগম। এদিকে তদন্ত শেষে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ আদালতে মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পানিতে ডুবে নাঈমের মৃত্যু হয়েছে। পোস্টমর্টেম রিপোর্টেও আসে একই তথ্য। এ অবস্থায় আদালতে নারাজি দেন মামলার বাদী নার্গিস বেগম। আদালত মামলাটি পুনঃতদন্ত করতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-পিবিআইকে দায়িত্ব দেন।

পিবিআই প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদারের নির্দেশে ও পিবিআই দক্ষিণ বিভাগের পুলিশ সুপার শাহাদাত হোসেনের তত্ত্বাবধায়নে মামলার তদন্ত শুরু করেন এসআই আরিফুল ইসলাম।

তদন্তে নেমে পিবিআই জানতে পারে নতুন একটি কিশোর গ্যাং গঠন করতে চেয়েছিল নাসিম, তানজিম ও আবদুল্লাহ। ওই গ্যাংয়ে মান্নান স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র কিশোর নাঈমকেও আমন্ত্রণ জানায় তারা। নাঈম তা প্রত্যাখ্যান করায় তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।

পিবিআই জানায়, তদন্তে উঠে এসেছে ২০১৭ সালের ২২ আগস্ট স্কুলে পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফেরার পথে কোনাপাড়া গোল্ডেন ব্রিজের ওপর নাঈমকে আটকে মারধর করে তিন বন্ধ নাসিম, তানজিম ও আবদুল্লাহ। একপর্যায়ে বইয়ের ব্যাগ রেখে দিয়ে নাঈমকে ছুড়ে ফেলা হয় খালের পানিতে।

সাঁতার না জানায়, তলিয়ে যায় নাঈম। ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরা এসে তাকে মৃত উদ্ধার করে। এদিকে যারা তাকে ছুড়ে ফেলেছিল তারা হত্যার দায় এড়াতে নাঈমের মাকে গিয়ে খবর দেয় যে, নাঈম পানিতে পড়ে গেছে।

পিবিআই দক্ষিণ বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. শাহাদাত হোসেন যুগান্তরকে বলেন, মামলার তদন্তে জানা যায়, ভিকটিম নাঈমুল ইসলাম ও আসামি নাসিম, তানজিম ও আবদুল্লাহ পরস্পর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তারা সবাই কোনাবাড়ী মান্নান উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণিতে লেখাপড়া করত।

নাসিম, তানজিম এবং আবদুল্লাহ তুলনামূলকভাবে সচ্ছল পরিবারের সন্তান। লেখাপড়ায় তাদের তেমন আগ্রহ নেই। ৩ জনই উগ্র স্বভাবের, বখাটে। অপরদিকে নাঈমুল ইসলাম গরিব পরিবারের একমাত্র সন্তান। নাঈম শান্ত স্বভাবের ছিল।

নাসিম, তানজিম এবং আবদুল্লাহ কিশোর গ্যাংয়ে নাঈমকে জড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু নাঈম গ্যাংয়ে নিজের নাম জড়াতে চায়নি। অনেক বোঝানোর পরও তাদের গ্রুপে নাঈমকে অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যর্থ হয়।

এ কারণে তিনজন নাঈমের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিশোধ নিতে কৌশল অবলম্বন করে। ২০১৭ সালের ৭ আগস্ট ওরা নাঈমকে খেলার কথা বলে স্থানীয় বালুর মাঠে ডেকে নেয়। সেখানে নাসিমের মোবাইল ভেঙে ফেলার অপবাদ দিয়ে তাকে আটকে রেখে মারধর করা হয়। মেরে ফেলার হুমকিও দেয়া হয়। খবর পেয়ে নাঈমের নানি সাবিয়া বেগম বালুর মাঠে যান। মোবাইলের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ২ হাজার টাকা দিয়ে তিনি নাঈমকে ছাড়িয়ে আনেন।

পরদিন স্কুলে গেলে আবার নাঈমকে তিনজন নানাভাবে বিরক্ত করে। নাঈমের মামাতো বোন শারমিন আক্তার (একই স্কুলের ৯ম শ্রেণির ছাত্রী) নিজেদের মধ্যে ঝামেলা মিটিয়ে নেয়ার অনুরোধ করে। তখন তিনজন আরও ১ হাজার টাকা দাবি করে। না দিলে নাঈমকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়।

বিষয়টি জানতে পেরে নাঈমের মা যাত্রাবাড়ী থানায় একটি জিডি করেন (নং-৮৫৮, তারিখ ০৯-০৮-২০১৭)। যাত্রাবাড়ী থানার এসআই আইয়ুব আলী বিষয়টি কিশোর বয়সের ছেলেদের হওয়ায় আসামিদের বাবা-মাকে অবগত করলেই চলবে বলে সংশ্লিষ্ট জিডিটি তদন্ত না করে বাদিনীকে আসামিদের বাবা-মাকে জানানোর জন্য অনুরোধ করেন।

নার্গিস বেগম আসামি আবদুল্লাহ, তানজিম, নাসিমের বাবা-মাকে বিষয়টি জানালে ওরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। ওইদিন নাঈমদের বাড়িতে গিয়ে তারা হুমকি দেয়। এ সময় নাঈমদের বাড়ির মালিক আবদুল খালেক এবং পাড়ার লোকজন নাসিম, তানজিম এবং আবদুল্লাহকে আটক করে। ভবিষ্যতে এমন কাজ করবে না মর্মে মুচলেকা দেয় তারা।

কিন্তু তাদের হুমকি-ধমকি দিন দিন বাড়তে থাকে। পরে ওরা নাঈমকে খালের পানিতে ফেলে হত্যা করে। তিনি জানান, তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ আর সাক্ষী এবং আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

পিবিআই প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার যুগান্তরকে কলেন, কোনো অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে শুধু পোস্টমর্টেম রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে তদন্ত করলে প্রকৃত রহস্য নাও উদঘাটন হতে পারে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং অন্যান্য উপায়েও তদন্ত করতে হয়। আর তাহলেই বেরিয়ে আসতে পারে ঘটনার রহস্য।

Comments

comments