ভারতের জন্য অন্ধকার দিন সামনে

মারকানডে কাটজু

ভারতে এখন এমন কিছু ঘটছে যা নাৎসি যুগে জার্মানিতে সংঘঠিত ঘটনার কথা আমাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।

১৯৩৩ সালের জানুয়ারিতে হিটলার ক্ষমতা নেওয়ার পরে প্রায় পুরো জার্মানি পাগল হয়ে যায়, লোকেরা ‘হেইল হিটলার’, ‘সিগ হিল’, ‘জুডেন ভেরেক’ বলে চিৎকার করে আর সম্মোহিত জম্বির মতো পাগলটির প্রশংসা করতে থাকে। ইউটিউবে যে কেউ এ সব এখনো দেখতে পারেন।

জার্মানরা এমন এক উচ্চ সংস্কৃতির মানুষ, যারা ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ও আইনস্টাইনের মতো দুর্দান্ত বিজ্ঞানী, গোথে ও শিলারের মতো দুর্দান্ত লেখক, হেইনের মতো মহা কবি, মোজার্ট, বাচ এবং বিথোভেনের মতো দুর্দান্ত সংগীতশিল্পী, মার্টিন লুথারের মতো দুর্দান্ত সংস্কারক, ক্যান্ট, নিৎসচে, হেগেল ও মার্কসের মতো দুর্দান্ত দার্শনিক, লাইবনিটজ, গাউস ও রিমানের মতো দুর্দান্ত গণিতবিদ এবং ফ্রেডরিক দ্য গ্রেট ও বিসমার্কের মতো দুর্দান্ত রাজনীতিবিদ তৈরি করেছিলো। আমি প্রতিটি জার্মানকে পেয়েছি এক একজন ভাল মানুষ হিসাবে।

তবুও, হিটলার যখন দৃশ্যপটে আসেন এবং বলেন যে, জার্মানরা হেরেনভলক (মাস্টার রেস) আর ইহুদীরা তাদের সমস্ত দুর্ভোগের জন্য দায়ী, তারা তখন বোকার মতো এই সব বাজে কথা গিলছিল এবং ইহুদিদের উপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে সামান্য কিছুই করেছিল, যার ফলে হলোকাস্ট ঘটেছিল (তখন অনেক জার্মান এমনকি এটিকে সমর্থনও করেছিল)।

কিভাবে এটা হল? অবশ্যই জার্মানরা বোকা লোক নন, অথবা তারা ভেতরে ভেতরে বাজে মানুষও নন। আমি দেশটির ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে ৯৯ শতাংশ মানুষকে সর্বদা ভাল হিসেবে পেয়েছি। তাহলে কীভাবে জার্মানরা ৬০ লাখ ইহুদীকে গ্যাস চেম্বারে পাঠাতে পেরেছে?

আমার মতে, এটি ঘটেছিল এ কারণে যে আধুনিক প্রচার প্রচারণা এমন এক শক্তিশালী জিনিস যা এমনকি অতি সংস্কৃতবান এবং বুদ্ধিমান মানুষের মনকেও বিষাক্ত করে ফেলতে পারে। তৎকালীন বেশিরভাগ জার্মানের ক্ষেত্রে এটিই হয়েছিল।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পরে জার্মানদের আত্মমর্যাদার সঙ্কট এবং ১৯২৯ সালের মহামন্দার পরে ব্যাপক বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সঙ্কটে হিটলারের মতো কুৎসিত ব্যক্তির প্রচারণার সহজ চারণভূমি হয়ে ওঠে দেশটি। এটি বেশিরভাগ জার্মানকে গ্রাস করেছিল।

বেশিরভাগ ভারতীয়দের ক্ষেত্রেও এখন একই ঘটনা ঘটছে। ২০১৪ সালে দক্ষিণপন্থী হিন্দু নব্য-ফ্যাসিবাদী দল বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভারতে সংখ্যালঘুদের (বিশেষত মুসলমানদের) বিরুদ্ধে গো হত্যা ও হিন্দু মেয়েদের প্ররোচিত করার (লাভ জিহাদ) ঘৃণ্য বক্তৃতা দিয়ে বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক প্রচার চালানো হচ্ছে। এর ফলে ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের বেশিরভাগেরই মন বিষাক্ত হয়ে ওঠে।

গত কয়েক বছরে রাম মন্দির নির্মাণের দাবি এবং মুসলমানদের গণপিটুনিতে হত্যা নিয়মিত বিষয় ছিল। পাকিস্তানের বালাকোটে বিমান হামলা এবং উগ্র ভারতীয় গণমাধ্যম দ্বারা যুদ্ধের হিস্টিরিয়া সৃষ্টি এই প্রচারণার অংশ ছিল আর সাম্প্রতিক সংসদ নির্বাচনে বিজেপির পক্ষে এক বিস্ময়কর জয়ে এই সবের প্রচুর লাভ পেয়েছে বিজেপি।

আমার মনে হয় যে, ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭০ রহিত করার বিষয়টি কেবল একটি গিমিক (যেহেতু এটি ভারতের আসল সমস্যার কোনও সমাধান করবে না)। এর ফলে বেশিরভাগ হিন্দু উগ্র হয়ে ওঠে (যেমনটি হিউস্টনের হাওডির মোদি সমাবেশেও দেখা যায়) উদযাপন করেছে ‘শয়তান’ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এক দুর্দান্ত ‘বিজয়’।

ভারতের আসল সমস্যা হলো রেকর্ড হারের বেকারত্ব (যেমনটি ভারত সরকারের একটি সংস্থার জাতীয় নমুনা জরিপে প্রকাশিত), মারাত্মক শিশু অপুষ্টি (ভারতে প্রতি দুটি শিশুর একটি পুষ্টিহীন), বিপুল সংখ্যক কৃষকের আত্মহত্যা (৩ লাখেরও বেশি), জনগণের জন্য যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা এবং সুশিক্ষার প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি, ধনী-দরিদ্রের মধ্যে বিস্তৃত ব্যবধান (ভারতের ১৩৫ কোটি জনসংখ্যার নীচের অর্ধেকের চেয়ে শিখরের ৭ জন ভারতীয় বেশি সম্পত্তির মালিক)। এসব কিছু সাম্প্রতিক লোকসভা নির্বাচনের ইস্যুর মধ্যে স্থান পায়নি।

ধর্মনিরপেক্ষতা হ’ল উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপের মতো শিল্প উন্নত সমাজের একটি বৈশিষ্ট্য। এটি বেশিরভাগ এশীয় দেশের মতো সামন্তবাদী বা আধা সামন্ত সমাজের বৈশিষ্ট্য নয়। কেবল সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার উল্লেখ দেশকে ধর্মনিরপেক্ষ করে না। ভারত এখনও আধা সামন্তবাদী, যেটি এখানে প্রচলিত বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। বেশিরভাগ ভারতীয় গভীরভাবে ধর্মপ্রাণ এবং প্রায় ৮০ শতাংশ ভারতীয় হিন্দু হওয়ায় তারা সাম্প্রদায়িক প্রচারের সহজ শিকার হয়।

আমার নিজের মনে হয়, ভারতের বেশিরভাগ হিন্দু, একই সাথে বেশিরভাগ মুসলমানও সাম্প্রদায়িক। যখন আমি আমার হিন্দু আত্মীয় এবং বন্ধুদের মধ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সর্বাধিক বিদ্বেষের বিষ দেখি (নিশ্চিত হওয়ার পরে সেখানে কোনও মুসলিম উপস্থিত নেই) তখন এটিই মনে হয়। একজন মুসলমানকে যখন গণপিটুনিতে হত্যা করা হয় তখন বেশিরভাগ হিন্দু উদাসীন থাকেন, কেউ কেউ খুশিও হন। একজন সন্ত্রাসী কমলো বলে!

সাম্প্রদায়িকতা (সংখ্যালঘুদের, বিশেষত মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা) বেশিরভাগ হিন্দুর মধ্যে সবসময়ই সুপ্ত ছিল, কেবল পাউডার কেগটিকে বিস্ফোরণে পরিণত করার জন্য কোথাও থেকে একটি স্পার্কের অপেক্ষায় ছিল। মুসলিম-বিরোধী ও খ্রিস্টানবিরোধী সংগঠন আরএসএস এর প্রাধান্য বিস্তার করা দল বিজেপি ২০১৪ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে সাম্প্রদায়িক আগুন নিজের আস্তিনের মধ্যে মজুত করে রেখেছিল ।

এখন যেহেতু বিজেপি এবং তার নেতা মোদী এক বিস্ময়কর জয় পেয়েছে, এখন জনগণের কাছ থেকে তাদের সমস্যার সমাধানে ডেলিভারি দেওয়ার জন্য প্রচুর চাপ পড়বে। এই চাপ থাকবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার, কৃষকদের দুর্দশা কাটানোর, শিশুর অপুষ্টি কমানোর, সঠিক স্বাস্থ্যসেবার এবং ভাল শিক্ষা প্রদান ইত্যাদির।
তবে এটি কীভাবে করবে সে সম্পর্কে তাদের কোনও ধারণা নেই। আর এর পরিবর্তে ভারতে যা সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে চলেছে তা হ’ল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মুখ থুবড়ে পড়েছে, জিডিপির প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়ে ৫ শতাংশে নেমেছে, শিল্প উৎপাদন তীব্রভাবে হ্রাস পেয়েছে (যেমন অটো সেক্টর, রিয়েল এস্টেট, বিদ্যুৎ ইত্যাদি) এবং রেকর্ড ও উচ্চ হারে বেকারত্ব সৃষ্টি হয়েছে।

সুতরাং বর্তমান এই অবনতিশীল প্রকৃত সমস্যাগুলি থেকে জনগণের দৃষ্টি অন্য দিকে ফেরাতে একটি বলির পাঠা খুঁজে পেতে হবে। হিটলার যেমন ইহুদিদের মধ্যে এটি খুঁজে পেয়েছিল তেমনি ভারতে এই বলির পাঠাটি হবে আমাদের মুসলমানরা আর আমি আশঙ্কা করি যে এখন তাদের উপর বার বার নিপীড়ন-হত্যাযজ্ঞ হবে (এবং খ্রিস্টানদের উপর কিছুটা হলেও তা হবে)।

জার্মানিতে বিজ্ঞান যেমন নাৎসি যুগে বর্ণবাদী মাম্বু জাম্বোতে পরিণত হয়েছিল, তেমনি ২০১৪ সালের পর ভারতে বিজ্ঞানের একই অবস্থা হয় এবং নাজি জার্মানিতে যেমন ইতিহাস বিকৃত হয়েছিল, তেমনই ২০১৪-পরবর্তী ভারতেও তা হয়েছে। আর গোয়বেলস যেমন জার্মানির মিডিয়াকে বেছে নিয়েছিল ঠিক তেমনিভাবে ভারতীয় মিডিয়ার বেশিরভাগকে সজ্জিত করা হয়েছে এবং আমাদের প্রভুকে ‘মৃত্যু অভিযাত্রার অভিবাদন’ জানাচ্ছে।

ভারতের জন্য অন্ধকার আসন্ন ।

[বিচারপতি মারকানডে কাটজু ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারক এবং ভারতের প্রেস কাউন্সিল এর সাবেক চেয়ারম্যান। লেখাটি অনুবাদ করেছেন মাসুমুর রহমান খলিলী]

সূত্র: ম্যাটার্স ইন্ডিয়া

Comments

comments