ইসলামে হালাল বিনোদন

আবু মুআবিয়া ইসমাইল কামদার

অনেক মুসলিমের মধ্যেই এই ভুল ধারণা আছে— বিনোদন হারাম। ডাহা মিথ্যা কথা! বিনোদন মানুষের স্বভাবজাত প্রকৃতির একটা অংশ। আর ইসলাম হলো ফিতরাহ বা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির ধর্ম। বিনোদনের অধিকাংশ ধরনই হালাল। অল্পকিছু সংখ্যক ধরন রয়েছে যেগুলো হারাম। আর দুর্ভাগ্যজনকভাবে অধিকাংশ মুসলিমই হারাম সেসব বিনোদনের সাথে জড়িয়ে আছেন।

আমার পছন্দের দশটি হালাল বিনোদন নিয়ে এ প্রবন্ধ। এ ক্ষেত্রে একটি কথা মাথায় রাখতে হবে, হালাল বিনোদনও হারাম হয়ে যায়, যদি কেউ তাতে অতিরিক্তভাবে জড়িয়ে যায় এবং ইসলামি কর্তব্য নিয়ে হেলাফেলা শুরু করে। তো আর দেরি কেন? চলুন দেখে নিই শীর্ষ দশ হালাল বিনোদন।

১০. বাইরে খাওয়া
বাইরে খেতে কে না পছন্দ করে। ফাস্টফুড শপে গিয়ে নিজের প্রিয় চিকেন টিক্কা কিংবা বার্গার ইয়াম! হয়তো নাম শুনেই কারও জিভে জল চলে এলো। বাইরে খাওয়া-দাওয়া সবসময়ই মজার, বিশেষ করে যখন বন্ধুবান্ধবদের সাথে একসাথে যাওয়া হয়। আর এটা অবশ্যই হালাল। শুধু খেয়াল রাখবেন মুরগিটা যেন হালাল হয়।

বই পড়া
বই পড়া সবাই পছন্দ নাও করতে পারে। তবে আমি পছন্দ করি। একই সাথে আয়েশ করার জন্য ও নিজের মনকে সবকিছু থেকে একটু দূরে রাখার জন্য বইয়ের চেয়ে ভালো বিকল্প আর হয় না। পড়ার আগে অবশ্যই আপনাকে এমন বই বেছে নিতে হবে যার বিষয়বস্তু হালাল। আর যত দিন না আপনি ভালো-মন্দের মধ্যে পার্থক্য করতে পারছেন এবং অমুসলিম লেখকদের বই পড়ার মতো অবস্থানে যেতে পারছেন তত দিন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য ইসলামি ভাবধারার লেখকদের বই পড়াই বাঞ্ছনীয়। ভুলে যাবেন না, কুরআনের প্রথম আদেশই কিন্তু ‘পড়ো’। কাজেই বই পড়ুন, ভালো বই পড়ুন, বই পড়া উপভোগ করুন। বই পড়তে আমাদের সবার যেন ভালো লাগে, আল্লাহ আমাদের সেই তাওফিক দিন।

সাঁতার কাটা
তপ্ত গরমে নিজের শরীরকে ‘কুল’ রাখার জন্য সাঁতারের চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে! আর এটা রাসূলুল্লাহ ﷺ-ও বলে গেছেন। শুধু খেয়াল রাখুন আপনার শরীর ঢাকা আছে কি না। তবে আর দেরি কেন? ঝাঁপিয়ে পড়ুন এক্ষুনি!

বিশ্রাম নেওয়া
সারাদিন নিশ্চয় কেউ নামাজ পড়ে কাটিয়ে দিতে পারে না। কাজের ফাঁকে ফাঁকে, ইবাদতের বাঁকে বাঁকে আমাদের অবশ্যই বিশ্রাম নিতে হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ সবকিছুতেই ভারসাম্য ধরে রাখতে বলেছেন। এটার জন্য যেমন সময় আছে, ওটার জন্যও তেমন সময় আছে।

আমরা যেন আমাদের দিনের কাজগুলোকে ভাগ করে চলি। ইসলামি কাজ ও পারিবারিক দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখি। যখন ক্লান্ত হয়ে পড়বেন, কাজের চাপ আর বাড়াবেন না। শান্ত হয়ে বসুন, বিশ্রাম নিন। তাই বলে নামাজের সময়টায় যেন আবার ঘুমিয়ে পড়বেন না।

প্রকৃতি
প্রকৃতি আমার খুব পছন্দের। সাগর, বন, পশুপাখি প্রকৃতির মায়াটাই অন্যরকম। আমি যখন প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকি তখন মানসিকভাবে খুব শান্তি অনুভব করি। নিজেকে আল্লাহর বেশি কাছাকাছি মনে হয় তখন। কোনো গাছের নিচে কিংবা পাহাড়ের উপর নামাজ পড়ার মতো অনুভূতি আর কীসে! আমি কিন্তু মোটেও বাড়িয়ে বলছি না। বিশ্বাস নাহয় তো আপনার পরবর্তী ছুটির দিনগুলো প্রাকৃতিক কোনো নয়নাভিরাম স্থানে বুকিং দিয়ে নিজেই পরখ করে আসুন!

নাশিদ
নাশিদও আমার খুব পছন্দের। নাশিদের মাঝে আমি খুঁজে পেয়েছি প্রচলিত গান-বাজনার আদর্শ বিকল্প। নাশিদ একইসাথে যেমন উপভোগ্য তেমনি শিক্ষণীয়।

কথিত আছে, ‘ওমর (রা.) বলেছেন—

গান সফরকারীর সঙ্গী।
বর্ণনাটি কতটুকু সহিহ জানি না, তবে ইমাম মালিক বলেছেন যে, ভ্রমণের সময় গান গাওয়ায় কোনো দোষ নেই। তো আপনার গাড়িতে আজই জেইন বিখা ও দাউদ ওয়ার্নসবির সিডি দিয়ে ভরে তুলুন। ছুড়ে ফেলে দিন সব হারাম মিউজিক। কাজে যেতে, কাজ থেকে ফিরতে উপভোগ করুন হালাল গান-নাশিদ।

সৎ বন্ধুর সাথে ঘোরাফেরা
বন্ধুরাই আপনাকে গড়ে তোলে, আবার এই বন্ধুরাই আপনার ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—

‘প্রত্যেক ব্যক্তি তার বন্ধুর ধর্ম অনুসরণ করে। কাজেই কাকে বন্ধু বানাচ্ছেন সে ব্যাপারে সতর্ক হন।’ আহমাদ, আবু দাউদ ও আত-তিরমিজি।

আমরা সবাই সামাজিক জীবনযাপন করি। আমাদের বন্ধুদের সাথে দেখা করার মাঝে, ঘোরাফেরার মাঝে আনন্দ খুঁজে পাই। কিন্তু সঠিক বন্ধুদের সাথে চলাটা গুরুত্বপূর্ণ। আপনার বন্ধুরাই হয় আপনাকে নামাজ পড়তে উৎসাহিত করবে অথবা নামায বাদ দিয়ে মুভি দেখতে বলবে। এরাই বলবে আপনাকে হিজাবে দারুণ লাগছে, কিংবা বুড়িদের মতো লাগছে। কাজেই দিন শেষে আপনি কাদের সাথে চলাফেরা করছেন, তারাই আপনার জীবনে সবচেয়ে বড়ো পার্থক্য গড়ে দেবে।

বাচ্চাদের সাথে খেলাধুলা
আমার নিজের দুটো বাচ্চা ছেলে আছে। আরও আছে ছোটোছোটো ভাগ্নে, ভাই, ভাতিজা। বলতে গেলে আমাদের পরিবার বাচ্চাকাচ্চায় ভরপুর। এসব নিষ্পাপ, মিষ্টি মুখের বাচ্চাদের সাথে খেলতে আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব পছন্দ করি। এসব সোনামণিরা আমার আনন্দের উৎস, নয়নের শীতলতা। বাচ্চাদের যারা পছন্দ করে না আমি তাদের একদম দেখতে পারি না। এ ধরনের লোকদের জন্যই অনেক শিশু প্রচণ্ড মানসিক আঘাত নিয়ে বড়ো হয়, মসজিদকে ঘৃণা করতে করতে একসময় ইসলামকেই ঘৃণা করতে শুরু করে। বাচ্চাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করা মোটেও ইসলামসম্মত নয়।

রাসূলুল্লাহ ﷺ তো মসজিদেও বাচ্চাদের সাথে খেলেছেন। মাঝে মাঝে তিনি তাঁর সিজদা দীর্ঘায়িত করতেন, কারণ নাতিরা তাঁর পিঠের ওপর উঠে খেলত। এটাই সুন্নাহ! মসজিদ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া, বাচ্চাদের দেখলেই বকাবকি করা সুন্নাহ নয়। তাই আনন্দ করার অন্যতম সুন্নাহ সমর্থিত উপায় হলো বাচ্চাদের সাথে খেলা করা।

আবু হুরায়রাহ (রা.) বর্ণনা করেছেন—

‘আকরা ইবনে হাবিসের উপস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর নাতি হাসান ইবনে আলির কপালে চুমু খেয়েছেন। এটা দেখে আকরা বললেন, আমার দশটা সন্তান আছে, কিন্তু আমি তাদের কাউকেই কখনো চুমু খাইনি। এটা শুনে রাসূলুল্লাহ ﷺ তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “যে অন্যদের দয়া দেখায় না, তাকেও দয়া দেখানো হবে না। (সহিহ বুখারী ও মুসলিম)

পরবর্তী সময়ে কখনো যদি কোনো শিশুর ব্যাপারে নির্দয় হন তাহলে এই হাদিসটির কথা মাথায় রাখবেন।

বিয়ে
বিপরীত লিঙ্গের কারও সান্নিধ্যে থাকা মানুষের প্রকৃতগত স্বভাব। এ ধরনের পরিস্থিতিতে মানুষ সবচেয়ে বেশি আনন্দ পায়, বিশেষ করে তাদের মধ্যে যদি থাকে নিখাদ ভালোবাসা। ইসলাম একে নিষিদ্ধ করে না; বরং বিয়ের মাধ্যমে আনন্দের এই ধরনটিকে খুব বেশি উৎসাহ দেয়। তো আজই আপনার বয়ফ্রেন্ড কিংবা গার্লফ্রেন্ডকে না বলুন। কোনো ধার্মিক ব্যক্তিকে দেখে বিয়ে করে ফেলুন। নিজেও ধার্মিক হোন।

অসংখ্যবার রাসূলুল্লাহ ﷺ বিয়ের গুরুত্বের কথা বলেছেন। বিয়ের মাধ্যমে আনন্দ করার গুরুত্বের ব্যাপারেও বলেছেন। আপনার বিবাহিত জীবন যদি গতি হারায়, তাহলে আপনার পুরো জীবনই হবে বিপর্যস্ত। কিন্তু আপনার বিবাহিত জীবন যদি সুখী হয়, তাহলে যেকোনো সমস্যাই আপনি মোকাবিলা করতে পারবেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর স্ত্রীদের সাথে আনন্দ করতেন। তিনি তাদের সাথে দৌড়ের প্রতিযোগিতা করতেন, তাদের সাথে কৌতুক করতেন। একবার তো তাঁর স্ত্রীদের সাথে তিনি খাবারের প্রতিযোগিতাও করেছিলেন!

দুজনে মিলে তাঁর জীবনী পড়ুন। তিনি ছিলেন এক আদর্শ স্বামী। আসুন আমরা সবাই তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করি।

এক তরুণ সাহাবি একবার বিধবা এক নারীকে বিয়ে করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ এ খবর শুনে তাঁকে বলেছিলেন, ‘তুমি কুমারী নারীকে কেন বিয়ে করলে না? তাহলে তুমি তাঁর সাথে আনন্দ করতে পারতে। সেও তোমার সাথে আনন্দ করতে পারত।’ বুখারি।

তো আপনি আর কিসের জন্য অপেক্ষা করছেন! যদি ইতোমধ্যেই বিবাহিত হয়ে থাকেন, তাহলে আপনাদের দাম্পত্য সম্পর্ককে আরও সুন্দর করুন। আনন্দ আর তৃপ্তির উৎসে পরিণত করুন আপনাদের দাম্পত্যজীবনকে। যদি বিবাহিত না হন, তাহলে শিগগিরই বিয়ে করে ফেলুন, অনেকগুলো বাচ্চা নিন। যাতে করে একসাথে সবাই মিলে এই লিস্টে বিনোদনের যে দশটি উপায়ের কথা বলা হলো সেগুলো উপভোগ করতে পারেন।

আশা করি, তালিকাটি সবার ভালো লেগেছে। সবাই এ থেকে উপকৃত হয়েছেন। আরও আশা করি, ইসলাম চর্চা ও উপভোগের জন্য এবং হালাল জীবনযাপনের জন্য এই তালিকাটি বেশ কাজে দেবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সরল-সঠিক পথের ওপর রাখুন। আমাদের অন্তরে ইসলামের প্রতি ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন। আমিন।

Comments

comments