‘ক্যাসিনো সাঈদ’এর অত্যাচার থেকে মুক্তি চায় আরামবাগ-ফকিরাপুলবাসী

তিনি যুবলীগ নেতা, আবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) কাউন্সিলর। এলাকায় গড়েছেন একক আধিপত্য। জড়িয়ে পড়েছেন ক্যাসিনো–বাণিজ্যে। চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির অভিযোগও আছে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দখল করেছেন ডিএসসিসির ৯ নং ওয়ার্ডের বেশ কয়েকটি ভবন। প্রভাব খাটিয়ে বনে গেছেন বিভিন্ন ক্লাবের নেতা।

যুবলীগের এই বিতর্কিত নেতার নাম এ কে এম মোমিনুল হক সাঈদ ওরফে সাঈদ কমিশনার। তিনি যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণ কমিটির যুগ্ম সম্পাদক। ডিএসসিসির ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পরিচয়ের আড়ালে সাঈদ কমিশনার ভয়ঙ্কর এক দখলবাজ সন্ত্রাসীর নাম।

গোয়েন্দা সূত্র বলেছে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গ্রেফতার এড়াতে এরই মধ্যে বিদেশে পালিয়ে গেছেন মহানগর যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক মোমিনুল হক সাঈদ ওরফে ‘ক্যাসিনো সাঈদ’।

  • বাংলাদেশ পাবলিকেশন্স লি: এর ভবন জবর দখল

১৯৬৯ সাল থেকে ঢাকায় বাংলাদেশ পাবলিকেশন্স লি: (বিপিএল) নামক একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানী কাজ করে আসছে। পত্র-পত্রিকা প্রকাশনা এবং প্রিন্টিং ব্যবসায়ই এর মূল কাজ। মতিঝিলের আরামবাগ এলকায় ৮৯ এবং ৮৯/১ নং হোল্ডিং-এর এই প্রতিষ্ঠানটির একটি আটতলা ভবন ও দু’টি চারতলা ভবন রয়েছে এবং ভবনগুলো বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল। বলাবাহুল্য এই কোম্পানীর শেয়ার হোল্ডারের সংখ্যা ৩,৬০০ জন এবং তারাই মূলত: ভবনগুলোর মালিক। ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এ কে এম মোমিনুল হক সাঈদ ২০১৫ সালের পয়লা জুলাই তার দলবল নিয়ে ভবন তিনটি দখল করে নেয় এবং সেখানে অবস্থিত বিপিএল-এর দফতর থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মারধর করে তাড়িয়ে দেয় এবং অফিসের সম্পত্তি লুটপাট করে নিয়ে যায়।

২/৭/২০১৫ তারিখে বিপিএল কর্তৃপক্ষ মতিঝিল থানার সাথে যোগাযোগ করে সম্পত্তি পুনরুদ্ধার কল্পে একটি সাধারণ ডায়রী করেন। দুঃখজনকভাবে থানা তাদের ডায়রী সরকারীভাবে গ্রহণ করেনি। তারা কালক্ষেপণ করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে বিপিএল কর্তৃপক্ষ ১৬ আগস্ট (২০১৫) বিষয়টি মেট্রোপলিটান পুলিশ কমিশনারের নজরে আনেন এবং তার সাহায্য কামনা করেন। এর কপি আইজিপি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়কেও দেয়া হয়। কিন্তু তাদের কেউই জবরদখলকৃত সম্পত্তি উদ্ধারের ব্যাপারে কোনও সহযোগিতা করেননি।

এরপর ১/১১/১৫ তারিখে বিপিএল-এর একটি প্রতিনিধি দল ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং দখল পুনরুদ্ধারের ব্যাপারে সাহায্য কামনা করেন। সিটি মেয়র বিষয়টি মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করেন; মোমিনুল হক সাঈদকে তার অফিসে ডেকে পাঠান এবং সহযোগিতার আশ্বাস দেন। কিন্তু বারবার যোগাযোগ করেও কোনও সহযোগিতা না পাওয়ায় ২২/৩/২০১৬ তারিখে তার সাথে আবার দেখা করেন এবং বিষয়টি ত্বরান্বিত করার অনুরোধ জানান। মেয়র মহোদয় তাদের আবেদন অফিসিয়ালী গ্রহণ করেন। কিন্তু তাতেও কাজ না হওয়ায় ১৮/১০/২০১৬ তারিখে বিপিএল তার নিকট তৃতীয় দৃষ্টি আকর্ষণী স্মারক প্রেরণ করেন যা ১৯/১০/১৬ তারিখে তার অফিসে যথারীতি গ্রহণ করা হয়। এরপর মেয়রের সাথে সাক্ষাৎ করলে তিনি তার অপারগতা প্রকাশ করেন। অর্থাৎ মোমিনুল হক সাঈদ গং এতই শক্তিশালী ছিলেন যে, সরকারের কোন সংস্থাই তার বা তাদের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ নিতে সাহস করেনি। তাদের অপকর্ম সম্পর্কে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকার কিছুই জানতেন না তা সঠিক নয়। এভাবেই তারা সরকারী নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে সকল ক্ষেত্রে সরকারকে জিম্মি করে সমাজে তাদের অপরাধ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা ও তা বিস্তৃত করেছেন।

  •  বিপিএল ভবনে ক্যাসিনো সাঈদের টর্চার সেল!

সম্প্রতি রাজধানীর মতিঝিল এলাকায় ইয়ংমেনস ক্লাবে ক্যাসিনোর সন্ধান পাওয়ার পর একে একে অভিযান চালানো হয় মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব, আরামবাগ স্পোর্টিং ক্লাব, ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাব ও ভিক্টোরিয়া ক্লাবে। এসব ক্লাবে চলমান অভিযানে অন্যান্যদের মধ্যে আলোচনায় আসে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও মহানগর যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক মো. মোমিনুল হক সাঈদ। অনুসন্ধানে পাওয়া যায়, মতিঝিলের আরামবাগ স্পোর্টিং ক্লাবটি নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। আর এতেই কেঁচো খুড়তে বেরিয়ে পড়ে সাপ। বাংলাদেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেড (বিপিএল) এর ৮ তলা ভবনটির ২য় তলায় খোঁজ মিলেছে ‘ক্যাসিনো সাঈদ’এর টর্চার সেলের। বিপিএল এর বহুতল ভবনে একটি টর্চার সেল খোলেন সাঈদ। দখলবাজি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিতে অভিযুক্ত যুবলীগ নেতাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। একই দলে তার প্রতিপক্ষ বা ভিন্নমত কেউ দাঁড়ালে কিংবা তার অবৈধ কারবারের পথে কেউ কাঁটা হলে তাকে সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে ধরে এনে তিনি নির্যাতন করতেন তার টর্চার সেলে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও বিপিএল ভবনের ব্যবসায়ীরা জানান,২০১৫ সালের পয়লা জুলাই বিপিএল ভবন দখল করে নেন ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোমিনুল হক সাঈদ। ৮ তলা ভবনের দ্বিতীয় তলার একাংশে কার্যালয় খোলার পর অবশিষ্ট পুরো ভবনের ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকেও ভাড়ার টাকা আদায় করছেন তিনি। অনেক ভাড়াটিয়াকে অন্যায়ভাবে নির্যাতন করে তাড়িয়েও দিয়েছেন সাঈদ কমিশনার।

দিলকুশার আরামবাগ ক্রীড়াচক্র এবং দিলকুশা ক্লাবের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া সড়কের মুখেই বিপিএল ভবনের অবস্থান। আর ওই দুটি ক্লাবে ক্যাসিনো চালাতেন সাঈদ। সরেজমিনে সোমবার বাংলাদেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেড এর ওই ভবনে ঢুকতেই দেখা গেছে, নিচতলায় ছাত্রলীগের লোগোসংবলিত অনেকগুলো মোটরসাইকেল। ভবনের দোতলায় উঠতেই সিঁড়ি সামনে মোমিনুল হক সাঈদের ব্যানারসংবলিত রাজনৈতিক কার্যালয় নামধারী টর্চার সেল। তার সামনের গেটে পাহারায় রয়েছেন ৩-৪ যুবক।

ওই ভবনে থাকা একাধিক প্রিন্টিং ব্যবসায়ী জানান, ক্যাসিনো-জুয়ার আসরে অভিযান চালানোর আগেই বিদেশ চলে যান কাউন্সিলর সাঈদ। এর আগে নিয়মিত সেখানে অফিস করতেন তিনি। মতিঝিল ৯ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীরা ভিড় জমাতেন সেখানে। সন্ধ্যার পর সাঈদ ওই ভবনে ঢোকামাত্রই দলীয় ক্যাডাররা বাইরে-ভেতরে পাহারা বসাত। প্রিন্টিং ব্যবসার দোকানে কেউ এলেও তাদের পরিচয় জানতে চাওয়া হতো। রাতে ব্যবসায়ীরা চলে যেতেন।

বিপিএল ভবনের ৫ তলার ওপরের আবাসিক ভাড়াটিয়াদের দুজন জানান, গভীর রাত পর্যন্ত সাঈদের কার্যালয়ে লোকজন থাকত। সেখানে নারীদের যাতায়াত ছিল। দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ কিংবা ভাগবাটোয়ারায় অমিল হলে যে কাউকে ধরে আনা হতো ওই টর্চার সেলে। তবে কাঁচঘেরা হওয়ায় কার্যালয়ের বাইরে শব্দ আসেনি। আবাসিক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ভাড়াটিয়াদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেডের প্যাডে ভাড়া দিতেন তারা। কিন্তু ২০১৫ সালের পয়লা জুলাই হঠাৎ ভবনের দোতলার একাংশ দখল করে নেন কাউন্সিলর সাঈদ। রাতারাতি সেখানে রাজনৈতিক কার্যালয় গড়ে তোলেন। পরে পুরো ভবনটির ভাড়া তোলা শুরু করেন সাঈদের ক্যাডাররা।

ভবনের তৃতীয় তলায় মুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমান বলেন, ৬-৭ বছর আগে বাংলাদেশ পাবলিকেশন্সের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন তিনি। এ সময়ে ভাড়া না বাড়লেও ভাড়া আদায়কারী বদলে গেছে। তবে তারা কারা সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন।

  •  ‘ক্যাসিনো সাঈদ’এর বিরুদ্ধে দখল ও চাঁদাবাজির আরও অভিযোগ

সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাওয়া তথ্যে উঠে এসেছে, দলীয় প্রভাব খাটিয়ে ক্যাসিনো, চাঁদাবাজি আর টেন্ডারবাজিতে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন মমিনুল হক সাঈদ। কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পরেই গড়ে তোলেন ডিএসসিসির আওতাধীন হাটগুলোর টেন্ডার সিন্ডিকেট। যে কারণে কয়েক বছর ধরে সিটি করপোরেশনের অস্থায়ী হাটগুলোর ইজারা ঘুরেফিরে একই ব্যক্তির হাতে চলে যায়। এসব নিয়ন্ত্রণ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন মোমিনুল হক সাঈদ। যার চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে এ বছর কুরবানিতে রাজধানীর অস্থায়ী পশুর হাট ইজারা নেওয়ার সময়। সর্বোচ্চ দরদাতা মনোনীত হয়ে একাই দুটি হাটের ইজারা নিয়েছিলেন।

অথচ সিটি করপোরেশন আইন-২০০৯ অনুযায়ী কোনো জনপ্রতিনিধি করপোরেশনের সঙ্গে এ ধরনের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে যুক্ত থাকার কথা নয়। প্রতিবছরই কয়েকটি হাট নামে-বেনামে তিনি ভাগ করে নেন। এবারও সর্বোচ্চ ৭০ লাখ টাকার দর দিয়ে ব্রাদার্স ইউনিয়ন বালুর মাঠ এবং সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকার দর দিয়ে কমলাপুর স্টেডিয়ামের পাশের হাটের ইজারা নেন মমিনুল হক সাঈদ।

তিনি আরামবাগ ও ফকিরাপুলে রাস্তায় লোহার গেট স্থাপন করে নিরাপত্তার কথা বলে প্রতি বাসা, দোকান ও প্রেস থেকে প্রতি মাসে ১ হাজার টাকা করে চাঁদা আদায় করতেন। এসব চাঁদা আদায়ের দায়িত্বে আছেন নোয়াখাইল্যা আবদুল মান্নান এবং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান মাইনু। এছাড়া সাঈদের নিয়ন্ত্রিত দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাব ও মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবেও চলে ক্যাসিনোর রমরমা বাণিজ্য। ২০১৭ সালে তার বিরুদ্ধে মতিঝিলের আরামবাগ এলাকায় রাতের আঁধারে প্রায় ২৫ কোটি টাকা মূল্যের সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। জানা যায়, ‘আফতাবুন্নেছা প্লাজা’ নামের বাণিজ্যিক একটি ভবনের ছাদ ভেঙে ফেলা হয়। জাল দলিলের মাধ্যমে সুজা উদ্দিন সুজা নামে এক ব্যক্তি ভবনটি দখলের চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। এ নিয়ে আদালতে মামলা চলমান অবস্থায় সাঈদ কমিশনারের সহায়তায় ভবনটি দখলে নেয় সুজা।

এছাড়া মতিঝিলে সোনালী ব্যাংকের পেছনে নবাব জেরিন কমপ্লেক্স টিনশেড মার্কেট দখল করে নেয়। পরে ঠিকঠাক করে ৩৫টি দোকান তৈরি করে। এসব দোকান ১০-২০ লাখ টাকা অ্যাডভান্স নিয়ে ভাড়া দেওয়া হয়। দাবি করা চাঁদা না দেওয়ায় ফকিরাপুলের ১ নম্বর লেনের ২০৭ নম্বর বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ সাঈদের নির্দেশে বন্ধ করে দেয় যুবলীগ নেতা জামাল ও মতিঝিল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হাসান।

মতিঝিলের ছাত্রলীগ-যুবলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের বাসিন্দা মমিনুল হক সাঈদ। পারিবারিক ঝামেলায় ২০০২ সালে তিনি ঢাকায় এসে মতিঝিলের দিলকুশা সাধারণ বীমা করপোরেশনের সামনের সড়কে পুলিশকে ম্যানেজ করে চোরাই তেলের ব্যবসা করতেন। থাকতেন বঙ্গভবনের চার নম্বর গেটের কোয়ার্টারে। সেখানে তার মামা চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর চাকরি করতেন।

পরে মোহামেডান ক্লাবের তৎকালীন নেতা আলমগীর ও তাপসকে ম্যানেজ করে ওই ক্লাবে হাউজি চালাতেন সাঈদ। ২০০৭ সালের দিকে যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির এক প্রভাবশালী নেতা ও বর্তমান সংসদ সদস্যের সুনজরে ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি হন তিনি। ওই নেতার সিদ্ধেশ্বরীর বাসায় বাজার করে দিতেন কাউন্সিলর সাঈদ। আর নেতার আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ায় একসময় যুবলীগ মহানগর দক্ষিণের যুগ্ম সম্পাদক পদও বাগিয়ে নেন তিনি।

Comments

comments