কোথায় আছেন সেই ক্যাসিনো সম্রাট?

রাজধানীতে ক্লাব ব্যবসার আড়ালে অবৈধ ক্যাসিনো পরিচালনার অভিযোগে আলোচিত যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী ওরফে সম্রাটের অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। সম্রাট কোথায় এ বিষয়ে সঠিক তথ্য পাওয়া দুষ্কর হয়ে গেছে। কেউ বলছেন সম্রাট আত্মগোপনে রয়েছেন। কেউ বলছেন, ছয় দিন ধরে কাকরাইলের কার্যালয়েই অবস্থান করছেন এই ক্যাসিনো সম্রাট।

পুলিশ বলছে, যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন সম্রাট এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে আছেন। তাকে গ্রেফতারের কাজ করছে আইনশৃংখলা বাহিনী।

সম্রাটের অবস্থান নিয়ে মানুষের মাঝে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। খালেদের পর সম্রাটের গ্রেফতারের গুঞ্জন ছিল। কিন্তু এখনও না হওয়ায় একেকজন একেক ধরনের কথা বলছেন। কেউ বলছেন, গ্রেফতার আতঙ্কে নেতাকর্মীবেষ্টিত হয়ে কাকরাইলে যুবলীগ কার্যালয়েই তিনি রাতযাপন করছেন।

যুবলীগের একটি সূত্র বলছে, মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি সম্রাট ছয় দিন ধরে কাকরাইলের ভূঁইয়া ম্যানশনে তার ব্যক্তিগত কার্যালয়ে শতাধিক যুবকের পাহারায় অবস্থান করছেন। সেখানে সবার খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা আছে।

ওই সূত্রটির দাবি, দলের শীর্ষ নেতাদের পরামর্শে সম্রাট বাসায় না থেকে ব্যক্তিগত কার্যালয়ে অবস্থান করছেন।

আবার কেউ বলছেন নিরাপদ কোনো স্থানে আত্মগোপনে আছেন। বর্তমানে তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা তৎপরতা। পাশাপাশি তার সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

একটি সূত্র দাবি করছে, ঢাকার ক্লাবগুলোতে অবৈধ ক্যাসিনোর সঙ্গে যুবলীগ নেতাদের জড়িত থাকার তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট গেছেন আত্মগোপনে।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতির খোঁজ মিলছে না কোথাও; কার্যালয়েও যাচ্ছেন না, বাড়িতেও পাওয়া যাচ্ছে না বলে যুবলীগের কর্মীরা জানিয়েছেন।

গত বুধবার ঢাকার মতিঝিলের ফকিরাপুল ইয়ংমেনস ও ওয়ান্ডারার্স ক্লাব এবং মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়া চক্রে র‌্যাবের অভিযানে অবৈধ ক্যাসিনো মেলার পাশাপাশি সেগুলো পরিচালনায় যুবলীগ নেতাদের জড়িত থাকার বিষয়টি প্রকাশ পায়।

ওই দিনই গ্রেফতার করা হয় যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সম্রাটের শীষ্য খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে। পরদিন কলাবাগান ক্লাব থেকে গ্রেপ্তার করা হয় কৃষক লীগের নেতা শফিকুল আলম ফিরোজকে। দুদিন পর গ্রেফতার করা হয় ঠিকাদার জি এম শামীমকে, যিনিও যুবলীগ নেতা হিসেবে পরিচয় দিতেন।

সহযোগী সংগঠন যুবলীগের নেতাদের চাঁদাবাজি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার অসন্তোষ প্রকাশ পাওয়ার পরপরই জুয়ার আখড়া বন্ধে এই অভিযান শুরু হয়।

ক্যাসিনো-জুয়াবিরোধী অভিযানে গ্রেফতারকৃতদের অনেকেই জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন- ঢাকায় ক্যাসিনো ব্যবসার মূলে আছেন সম্রাট। তার হাত ধরেই ক্যাসিনোর প্রসার ও বিস্তার।

সম্রাটের ক্যাসিনোর দেখাশোনা করতেন ওয়ার্ড কাউন্সিলর এ কে এম মমিনুল হক ওরফে সাঈদ। তারা এক বছর আগে পল্টনের প্রীতম–জামান টাওয়ারে ক্যাসিনো চালু করেছিলেন। মমিনুল হক এখন বিদেশে।

সম্রাটকে গ্রেফতার করতে পারলেই অবৈধ এ বাণিজ্যের আদি-অন্ত বের করা যাবে। বন্ধও করা সম্ভব অবৈধ এ ব্যবসা।

ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের গ্রামের বাড়ি ফেনী জেলার পরশুরাম উপজেলার সাহেব বাজার এলাকায়। তিনি প্রয়াত ফয়েজ উদ্দিন চৌধুরীর ছেলে। সম্রাট যুবলীগে খুবই প্রভাবশালী এক নেতা। তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বিগত কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন।

পরবর্তী কাউন্সিলে অনেকটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই সভাপতি নির্বাচিত হন। এরপর থেকে যুবলীগের গুরুত্বপূর্ণ এ ইউনিটের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন তিনি। যুবলীগের দিবসভিত্তিক কর্মসূচি এবং রাজধানীতে আওয়ামী লীগের জনসভাগুলোতে সব সময়ই বড় শোডাউন থাকত সম্রাটের লোকজনের।

যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী সম্রাটের নেতৃত্বাধীন যুবলীগের এ ইউনিটকে ‘শ্রেষ্ঠ সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণাও দিয়েছেন।

আলোচিত এ সম্রাট মাসে অন্তত ১০ দিন সিঙ্গাপুরে জুয়া খেলেন। এটি তার নেশা। সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে বড় জুয়ার আস্তানা মেরিনা বে স্যান্ডস ক্যাসিনোতে পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ থেকেও আসেন জুয়াড়িরা। সেখানেও সম্রাট ভিআইপি জুয়াড়ি হিসেবে পরিচিত।

প্রথম সারির জুয়াড়ি হওয়ায় সিঙ্গাপুরের চেঙ্গি এয়ারপোর্টে তাকে রিসিভ করার বিশেষ ব্যবস্থাও আছে। সিঙ্গাপুরে গেলে সম্রাটের নিয়মিত সঙ্গী হন যুবলীগ দক্ষিণের নেতা আরমানুল হক আরমান, মোমিনুল হক সাঈদ ওরফে সাঈদ, সম্রাটের ভাই বাদল ও জুয়াড়ি খোরশেদ আলম। এদের মধ্যে সাঈদ কমিশনারের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়।

জানতে চাইলে র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার বলেন, ক্যাসিনোসংক্রান্ত অপরাধের সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক না কেন তাদের আইনের আওতায় আনতে র‌্যাব বদ্ধপরিকর।

যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন সম্রাটের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে আপনাদের কাছে কোনো তথ্য থাকলে আমাদের সহযোগিতা করতে পারেন।

ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চললেও গডফাদার হিসেবে পরিচিত সম্রাটকে কেন গ্রেফতার করা হচ্ছে না- এ প্রশ্ন এখন সংশ্লিষ্ট প্রায় সবার। সোমবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে এ প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, গডফাদার-গ্র্যান্ডফাদার বলতে কিছু নেই। আমরা চিনি অপরাধীকে। অপরাধী যে বা যারাই হোক তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

সম্রাটকে কেন গ্রেফতার করা হচ্ছে না, সে বিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, অ্যাকশনটা শুরুর এক সপ্তাহও হল না। এক সপ্তাহের মধ্যে সব ব্যবস্থা হবে?

সূত্র: যুগান্তর

Comments

comments