নি’মাতুল্লাহ শাহ ওয়ালির ভবিষ্যদ্বাণী ও গাযওয়া-ই- হিন্দ

– ডা আব্দুস সালাম আযাদী

ইদানিং নি’মাতুল্লাহ শাহ ওয়ালির ভবিষ্যদ্বাণী আমাদের ঘুম হারাম করেছে, এবং কিছু যুবকের মাঝে গাযওয়ায়ে হিন্দের রক্ত উছলানো বক্তব্য আমাদের ফেসবুক পাড়া রীতি মত গরম করে ফেলেছে। আমি এ ব্যাপারে পড়া শুনা করতে যেয়ে খুব কষ্ট পাচ্ছিলাম। কারণ আমাদের ইতিহাসে ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে মাথা ঘামানো খুব বেশি হয়না। কুরআনে ভবিষ্যতে কি ঘটবে তার আগাম খবর বলে দেয়া আছে, আমাদের মহানবী (সা) ভবিষ্যতের অনেক রকম কথা বলেছেন। সাহাবায়ে কিরাম ও তাবেঈনদের ও অনেকের কথা আছে। সেগুলো কেও স্ট্যাডী করলে দেখতে পাবেন সেখানে সব সময় একটা ধারণা তৈরির সুযোগ থাকে, এবং মুমিনদের কাজের পথ নির্দেশ থাকে। যাকে আমরা হিদায়াত বলি, যাকে আমরা অসিয়াত বা নাসীহাত বলি, যাকে আমরা বুযুর্গগণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত আলোময় প্রতিভা বা “ফিরাসাত” বলি। কিন্তু নি’মাতুল্লাহ শাহ ওয়ালীর যে ভবিষ্যদ্বাণীর সমাহার উর্দু, বাংলা, ইংরেজী বা অন্যান্য ভাষায় দেখলাম, তা সবই ইসলামের প্রধান সড়ক থেকে পিছলে গেছে বলে মনে হয়েছে।

এক্ষেত্রে আমাকে সাহায্য করেছে প্রফেসর ডঃ চৌধুরি মুহাম্মাদ নাইম নামক শিকাগো ইউনিভার্সিটির অত্যন্ত প্রসিদ্ধ প্রফেসার এমিরিটাস এর লেখা একটা লম্বা প্রবন্ধ। যার নাম দেন ‘Prophecies’ in South Asian Muslim Political Discourse: The poem of Shah Ni’matullah Wali। তিনি ইকোনোমিক এন্ড পলিটিক্যাল উইকলীতে জুলাই ৯, ২০১১ সালে এই লম্বা গবেষণা আর্টিকেল লেখেন। সেখানে বিস্তারিত ভাবে নি’মাতুল্লাহ শাহ ওয়ালির ভবিষ্যদ্বাণীর চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন।

কে এই শায়খ নি’মাতুল্লাহ

নুরুদ্দীন, কবিনাম নি’মাতুল্লাহ শাহ ওয়ালী, সূফী ও সুন্নি ছিলেন। শিয়াদের ৭ম ইমাম মুসা কাযিমের বংশধর বলে তিনি দাবী করেছেন। জন্মেছেন সিরিয়ার। সেখানেই প্রাথমিক পড়া শুনা শেষ করে দুনিয়ার নানা শহর থেকে ইলম অন্বেষণে বেরিয়ে পড়েন। মক্কায় তিনি আব্দুল্লাহ ইয়াফেঈ আলক্বাদেরীর সান্নিধ্যে ৬বছর কাটান এবং ইলমের নানা শাখায় ইজাযাত প্রাপ্ত হয়ে আবার সারা দুনিয়া ঘুরতে বের হন। শেষ বয়সে তিনি প্রসিদ্ধি লাভ করেন, এবং নানা স্থান থেকে তাদের কাছে থাকার দাওয়াত পান। তিনি সমরকন্দ থাকা কালীন দাওয়াত পান ভারতের বাহমিয়া শাসকের। কিন্তু বয়স শত বছরের বেশি হওয়ায় সেই দাওয়াত রক্ষা করতে পারেননি। বরং তার বড় ছেলে শায়খ খালিলুল্লাহকে সেখানে পাঠান। এর পর তিনি ইরানে কিরমানের পাশে মাহান নামক স্থানে ১৪৩১ সনে ইন্তেকাল করেন, সেখানেই রয়েছে তার অত্যন্ত প্রসিদ্ধ মাজার। তার ছেলে ও পরিবারের মাজার ও রয়েছে ভারতের দক্ষিণাত্যে বিদারের কাছে।

নি’মাতুল্লাহর ভবিষ্যদ্বাণী

তিনি ফারসী ভাষায় একজন নামকরা কবি ছিলেন। তার দিওয়ান প্রকাশিত হয়েছে ইরান থেকে। প্রাচ্যবীদ এডওয়ার্ড ব্রাউন ১৮৩৩ সালে তার মাজার ভ্রমনে যান, সেখানের মুতাওয়াল্লীর কাছ থেকে তিনি এই সূফী সাধকের কাব্য গ্রন্থ উদ্ধার করেন। তার A literary History of Persia গ্রন্থে এই কাব্যের উল্লেখ করেন এবং তার কিছু কবিতার অনুবাদ প্রকাশ করেন।

তার কাব্যগ্রন্থে একটা ক্বাসীদা বা কবিতার সন্ধান পাওয়া যায় যেটাতে তিনি তার জন্মের পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত ঘটতে পারে এমন কিছু বিষয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন। আর এই বাণী গুলোই এখন পাক ভারতে ঝড় বইয়ে গেছে।

তার কবিতার বর্ণনা

তারকাব্য গ্রন্থ থেকে পাওয়া অথবা ইরান থেকে পাওয়া তার ভবিষ্যদ্বাণীর একটা কবিতা আমাদের হাতে আছে, এ ছাড়াও ভারতীয় ঊপমহাদেশে আরো দুটি কবিতা পাওয়া যায়। প্রথম কবিতার পয়ার ছন্দে লিখিত। যার শেষ শব্দ হলো “মিবিনাম”। দ্বিতীয় কবিতাটির দুই দুই লাইন করে পয়ার, এবং শেষ শব্দ হলো “পায়দা শাওয়াদ”। এবং তৃতীয় কবিতার লাইনের অন্তমিল করা হয়েছে ‘আনা’ প্রত্যয় যোগে, যেমন যামানা, রুস্তমানা, তুর্কিয়ানা, এইভাবে।

১- প্রথম কবিতা শুরু হয়েছে –

কুদরাতে কিরদিগার মিবিনাম
হালাতে রোযগার মিবিনাম
অর্থাৎ আমি স্রষ্টার শক্তি দেখি, আমি দেখি সময় কিভাবে চলে যায়।

এই কবিতাটি তার লেখা এই ব্যপারে তেমন কোন সন্দেহ নেই। এটা তার পাণ্ডুলিপিতে আছে। এখানে আছে ৫০টা লাইন। এর পরে ইন্ডিয়ার শাবিস্তান নামক পত্রিকায় এটা ছাপানো হয় ১৯৭২ সালে, ৫৭ লাইনে। পরে পাকিস্তান থেকে কামার ইসলামপূরী ৫৫ লাইন সম্বলিত করে প্রকাশ করেন। পরে প্রকাশিত হয় ইরান থেকে ৫৭ লাইনে। এই কবিতায় ভারত নিয়ে মাত্র এক লাইন কবিতা আছে। যেখানে বলা হয়েছেঃ

হাল-ই-হিন্দু খারাব মিয়াবাম
জাওরে তুরক ও তাতার মিবানাম

অর্থাৎ আমি দেখি ভারতের ধ্বংস, দেখি তুরকি ও তাতারদের জুলুম ও অত্যাচার। যেহেতু এতে ভারতবর্ষ নিয়ে আর কোন কথা নেই, কাজেই এর মূল্য ভারতে ঐ রকম নেই, যে রকম আর দুটি কবিতার আছে।

২- দ্বিতীয় কবিতা শুরু হয়েছে –

রাস্ত গুইয়াম বাদশাহে দার জাহাঁ পায়দা শাওয়াদ
নামে তাইমূর বুয়াদ সাহিব-কিরাঁ পায়দা শাওয়াদ

অর্থাৎ নিশ্চয় আমি তোমাকে বলছি একজন বাদশাহ এই জগতে জন্ম নিবেন, যার নাম হবে তাইমূর (লং), এক আশ্চর্য তারা হয়ে তিনি জন্ম নিবেন।

এই কবিতায় আছে অনেক অনেক ভবিষ্যদ্বাণী, যেমন

  • তাইমূর লং এর জন্ম (১৩৩৫-১৪০৫)
  • মোঘল সাম্রাজ্যের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত
  • ইংরেজদের আগমন
  • গযনীর রাজার ভারত আক্রমন
  • ভারতে ভালো একজন শাসকের আগমন এবং তার হাতে ৪০ বছর সুশাসন চলা
  • ইস্ফাহান শহর থেকে দাজ্জালের আগমন ও ইমাম মাহদী বা হযরত ঈসা (আ) এর আগমন।

এই কবিতাটি যতগুলো যায়গা থেকে প্রকাশ পেয়েছে, তাতে তথ্যগত মারাত্মক কোন পার্থক্য বা ভুল দেখা যায়না। তবে ভুল আছে কয়েকটা বিষয়েঃ

একটাতে লেখা আছে কবিতাটি ৫৭০ হি ও ১১৭৪ সালে লেখা হয়েছে, অন্য আরেকটা সংস্করণে দেখা যাচ্ছে ৭৭০ হিজরী মুতাবিক ১৩৬৮ সনে।

 একটাতে লেখা আছে ইমাম মাহদী আসবে ১৩৮০ হিজরী ও ১৯৬০ সনে, অন্যটাতে আছে ১৬৪০ হিজরী মুতাবিক ২১৫২ সনে।

 খাজা হাসান নিজামী এর ২৮ লাইন প্রকাশ করেন, শাবিস্তান প্রকাশ করে ৪০ লাইন, তবে অধিকাংশ প্রকাশকগণ ৩৫ ও ৩৬ লাইন প্রকাশ করেছেন।

৩- তৃতীয় কবিতা শুরু হয়েছেঃ
আঁ/ চুঁ আখেরি যামানা আয়াদ বাদিন যামান
শাহবায-ই-সিদরাহ বিনি আয দাস্ত-ই- রাইগানা
অর্থাৎ তখন ই হবে যামানার শেষ, যখন সিদরাতুল মুনতাহার ঈগল হয়ে যাবে হাতছাড়া।

এই কবিতার শেষ হয়েছে:

খামোশ নিয়ামাতুল্লাহ আসরারে হাক্ব মাকুন ফাশ
দার সাল-ই- কুনতু কানযান বাশাব চুনিন বায়ানা

অর্থাৎ ও নিয়ামাতুল্লাহ চুপ হয়ে যাও, রবের গোপন রহস্য আর প্রকাশ করোনা। আর এইটা “কুনতু কানযান” সালে লেখা হয়। আরবী আবজাদ হাওওয়াযের নিয়ম অনুযায়ী “কুনতু কানযান” এর ডিজিটে ৫৪৮ হিজরী হয়, অর্থাৎ ১১৫৩ ইংরেজি।

এই কবিতার বৈশিষ্ট্য হলোঃ

 এটা যত যায়গা থেকে প্রকাশিত হয়েছে, সবটাতে রয়েছে চোখে পড়ার মত ভিন্নতা।
 এর সংক্ষিপ্ততমটা হলো ২৫ লাইন, এর সবচেয়ে লম্বাটা হলো ৯৯ লাইন।
 এতে মোঘল বাদশাহগণের ৭ জেনারেশনের বর্ণনার পাশাপাশি ইংরেজদের হাতে তাদের পতনের কথা বলা আছে।
 এই কবিতায় বিশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত যা যা ঘটেছে তার বর্ণনা এসেছে। যেমনঃ
– ইংরেজদের অত্যাচারের কথা
– দুই আহমাদের আগমন যারা ইচ্ছা মত কুরআন হাদীসের ব্যাখ্যা করবে
– দূর্ভিক্ষ ও মহামারী
– জাপানের ভূমি ধ্বস
– ১৩৮৮ হিজরি বা ১৯৬৪ ভারতে মারাত্মক সমস্যা
– দুইটা বিশ্বযুদ্ধ
এরপরে এসেছে ভবিষ্যতে যা ঘটবে তার বর্ণনা, যেমনঃ
– তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ
– কোন এক হজ্জের সময় ইমাম মাহদীর আগমন। দাজ্জালের আবির্ভাব ও ঈসা (আ) এর পুনুরাগমন ইত্যাদি

কবিতা গুলোর ইতিহাসঃ

এই কবিতা ৩টা পড়ার সময় মনে রাখতে হবেঃ

একঃ প্রথম কবিতাটা হয় শাহ নি’মাতুল্লাহর কাব্য গ্রন্থে পাওয়া গেছে, অথবা তার মাজারের লাইব্রেরি থেকে উদ্ধার করা গেছে। ফলে এর অথেন্টিসিটি নিয়ে আস্থা রাখা যায়।

দুইঃ দ্বিতীয় ও তৃতীয় কবিতা দুটোর পুরাণো কোন হদীস পাওয়া যায়না। এটা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থান থেকে আলাদা আলাদা ছাপানো হয়, কোন কাব্য গ্রন্থের অংশ ছিলোনা, এখনো কোন কাব্যগ্রন্থে এই দুইটা নেই।

তিনঃ দ্বিতীয় ও তৃতীয় কবিতা ভারত, পাঞ্জাব, দিল্লি, বাংলা, কেরালা ইত্যাদি নিয়ে লেখা। যেগুলো পড়লে মনে হবে শাহ নি’মাতুল্লাহ কিরমানের নয়, ভারতেরই ছিলেন। এবং এই জন্যই অনেক গবেষক ও আলিম উলামা তাকে ভারতের বলে দাবী করেছেন, এবং তার কবর কাশমীরে বলে মনে করেছেন।

ভারতবর্ষে প্রথম কবিতাটা প্রকাশ হয় ১৮৫১ বালাকোটের শহীদ শাহ ইসমাঈলের লেখা “ আরবাঈন ফী আহওয়াল আল-মাহদিয়্যায়” বা মাহদীর অবস্থা নিয়ে ৪০টা বক্তব্য। এর ই মধ্যে শায়খ নি’মাতুল্লাহর প্রথম কবিতাটা স্থান পায়। এই বইটির প্রকাশক মাওলানা বদীউজ্জামানের একটা উক্তিতে জানা যায় নি’মাতুল্লাহ দিল্লীর আলিম ছিলেন, যিনি ১২ শতাব্দীর, অথচ কিরমানের নি’মাতুল্লাহ ছিলেন ১৪শ শতকের। ১৮৭১ সালে এই কবিতা ক্যালকাটা রিভিউ তে প্রকাশ পায়। স্যার সৈয়দ আহমাদ এই রিভিউয়ে কবিতা ও তার দেয়া ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন (Khan, review, 31-32)।

এর পরে উইলিয়াম হান্টার তার দ্যা ইন্ডিয়ান মুসলিমস এ এই কবিতার উল্লেখ করেন। এবং উত্তর ভারতের গ্রামে গঞ্জে এই কবিতার গীত হতেও তিনি শুনেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। এতে বুঝা যায় এই কবিতা মূল কবির চেয়ে অন্যের বানানোও আছে।

প্রথম কবিতা প্রকাশের সাথে দ্বিতীয় কবিতাও মানুষের হাতে হাতে পৌঁছে যায়। যেহেতু এখানে ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে হুমকি ছিলো, এই জন্য সেই সময়ের মেজিস্ট্রেইট রাভেনশ’ এই কবিতার ২০ লাইন অনুবাদ করেন, এবং এই গুলো ইংরেজ হটানোর ষড়যন্ত্রে ব্যবহৃত বই হিসেবে বাজেয়াপ্তের মধ্যে গণ্য করেন।

দ্বিতীয় কবিতাটা পরে হায়দ্রাবাদ থেকে বেনামে একজন ছাপিয়ে বাজারে ছাড়ে। যাতে অনেক নতুন লাইন ও জুড়ে দেয়া হয়।

মুসলমানদের জাগৃতির হাতিয়ার বানাতে মিথ্যার আশ্রয়ঃ

প্রথম কবিতাটার প্রকাশ নিয়ে সন্দেহ আমাদের খুব না থাকলেও দ্বিতীয় ও তৃতীয় কবিতা নিয়ে, যা ভারতের ভাগ্য নিয়ন্তা নিয়েই আবর্তিত, আমাদের যথেষ্ঠ সন্দেহ রয়েছে।

কারণগুলো হলোঃ

একঃ ভারতের মুসলমানদের একেক ক্রান্তিকালেই এই কবিতা গুলো প্রকাশ পেয়েছে, এবং নিত্য নতূন লাইন সেখানে জুড়ে দেয়া হয়েছে। ১৭৫৭ সালে পলাশীর বিপর্যয়ের পর ইংরেজরা আসে ভারতে। মুসলিমদের মারাত্মক ভাবে দমন করা হয়। এই বিপদের ঘোরে ১৮৫১ সালে প্রথম ভবিষ্যদ্বাণী প্রকাশ পায়। মানুষের মনে আসে শক্তি ও সঞ্চিত হয় নতূন আশা।

দুইঃ ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের করুণ বিপর্যয়ে মুসলমানদের দাঁড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই সময় আসে দ্বিতীয় কবিতা। যা কোন কবিতার গ্রন্থে কোনদিন ছিলোনা। এলো ভবিষ্যদ্বাণীর আকারে।

তিনঃ ১৮৫৭ সালের কালো অধ্যায়ের পর তুর্কীর খেলাফত ছিলো ভারতের মুসলমানদের একটা আশ্রয়স্থল। তাদের বাদশাহদের জন্য প্রতি জুমুয়ার খুতবাহে দুয়া করা হতো। এই সবেরই একটা আঁকর আমরা দেখি তৃতীয় কবিতায়। এটা ঊনিশ শতকের প্রথমে প্রকাশ পায় (১৯১৩ সনে)।

চারঃ খাজা হাসান নিজামি ছিলেন বিশ শতকে সুফী সাংবাদিকতার প্রাণপুরুষ। তিনি লিবিয়ার সানুসি আন্দোলন দ্বারা দারুন ভাবে প্রাভাবিত ছিলেন। এদের নেতা সৈয়দ মুহাম্মাদ আল মাহদী (১৮৪৫-১৯০২) নিজকে ইমাম মাহদী দাবী করতেন। এই মতবাদে বিশ্বাসী হয়ে হাসান নিজামি অনেকগুলো বই প্রকাশ করেন। যার একটার নাম ছিলো কিতাবুল আমর, বা নির্দেশ নামা। এর ই একটা চ্যাপ্টার ছিলো কথিত নি’মাত উল্লাহর ভবিষ্যদ্বাণী সম্বলিত তৃতীয় কবিতা। সূফীদের ইমাম ইবনে আরাবী ধারণা করতেন, ইমাম মাহদী ১৩৩৫ হিজরিতে (১৯১৭) আসবে, এর উপর ভিত্তি করে হাসান নিজামী নানা যায়গা থেকে বিশেষ করে শাহ নি’মাতুল্লাহ ওয়ালীর ভবিষ্যদ্বাণী গুলো একত্রিত করেন বলে স্বীকার করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন আফগানিস্তানের আমির আমানুল্লাহ ছিলেন ইমাম মাহদী। ফলে ভবিষ্যদ্বাণীর দরকার হতে থাকে। এইভাবে নি’মাতুল্লাহর ভবিষ্যদ্বাণী বলে ভারতীয়দের হাতে বানানো কবিতা সরব হয়ে ওঠে। তিনি একথা অকপটে স্বীকার ও করেছেন তার লেখা ‘হাযরাত ইমাম মাহদী গ্রন্থের ৬৩-৬৪ পৃষ্ঠায়।

কবিতার লাইন বাড়ানোর কারণঃ

আগে বলেছি দ্বিতীয় ও তৃতীয় কবিতা দুটি শাহ নি’মাতুল্লাহর না হওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ঠ কারণ আছে। এর প্রমান আমরা দেখতে পাই ভারতীয় মুসলমানদের একেক সমস্যার সময় কবিতায় চরণ সংখ্যা বেড়েছে। তুর্কি খেলাফাত ভেঙে যায় ১৯২৩ সালে। সে সময় খেলাফত আন্দোলন দানা বাঁধে ভারতে। এই সময়ে নি’মতুল্লাহর কবিতায় আসে প্রায় ১১টা অতিরিক্ত চরণ। ১৯৪৭-৪৮ এ ভারত স্বাধীন হয়, দুইভাগ হয়, মুসলমানদের রক্তে ভারতের মাটি লাল হয়। সে সময়ের কবিতায় ও নি’মাতুল্লাহর ভবিষ্যদ্বাণীর লাইন ও বেড়ে যায়। এই সময়েই প্রাকশিত কবিতা “জং” এ, “মাআরিফ” এ, “ইমরোজে” দেখা যায়।

যেহেতু আযমগড়ের “মাআরিফ” হলো গবেষণা জার্ণাল, ফলে এই কবিতা গুলো অথেন্টিসিটি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তারা প্রথম কবিতাটার বিশ্বস্ততা খুঁজে পায়, কিন্তু দ্বিতীয় ও তৃতীয় কবিতা দুটো জাল, ও অন্যের কবিতা নি’মাতুল্লাহর নামে চালিয়ে দেয়া বলে প্রমান পায়। তারা একে বানানো ও রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার বলে গণ্য করে। (মাআরিরফ, ভলিউম ৬১, নং২, ফেব্রু ১৯৪৮)।

এরপরে আসে ১৯৭১-৭২ সাল, যখন পাকিস্তান ভাগ হয়ে যায়। ভারত ও জড়িয়ে যায় যুদ্ধে। এই যুদ্ধে ভারতের বিজয় নিয়ে নি’মাতুল্লাহ শাহের ভবিষ্যদ্বাণী সম্বলিত কবিতা দিল্লীর জামিআত টাইমস এ প্রকাশ হয়। এবং দাবী করা হয় ৮০০ বছর আগে শাহ নি’মাতুল্লাহর বক্তব্য অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেছে। এই সময়ে লাক্ষ্ণৌএর “আযাইম” সম্পর্কে সুচিন্তিত অভিমত চেয়ে পত্র লেখা হয়। যার জবাব আসে দুই জনের কাছ থেকেঃ

প্রথম জন ছিলেন ভূভারতের সেরা আলিমগণের একজন, শায়খ মানজুর নো’মানী। তিনি খুব কড়া ভাষায় এর জবাব দেন। এক পর্যায়ে এই সব নিরর্থক বিষয়ে বিশ্বাস করাকে মুসলিম মেধার অবমূল্যায়ন হিসেবে মনে করেন তিনি। তিনি এই ভবিষ্যদ্বাণীগুলোকে দুই ভাবে সমালোচনা করেনঃ

একঃ এই কবিতাগুলো ভাষাতাত্বিক মান খুবই নিচু। যারা নি’মাতুল্লাহ শাহ ওয়ালীর দিওয়ান বা কাব্য গ্রন্থ পড়েছেন তারা সহজেই বুঝতে পারবেন ফারসী ভাষায় সুপ্রসিদ্ধ একজন কবির ভবিষ্যদ্বাণীর ভাষা এত দূর্বল হতে পারেনা।

দুইঃ এই ধরণের ভবিষ্যদ্বাণী ইসলামের অথেন্টিক চর্চার বহির্ভূত। আমাদের নবী (সা) বা প্রখ্যাত সালাফের ভবিষ্যদ্বাণী করার পদ্ধতির বাইরে এটা এক ধরণের পদস্খলন। (আযাইম, লাক্ষ্ণৌ, ২১ মার্চ ১৯৭২, ১০-১১)

দ্বিতীয়জন ছিলেন হাসান সানী নিজামী, যার আব্বা খাজা হাসান নিজামি স্বীকার করেছেন নি’মাতুল্লাহর ভবিষ্যদ্বাণীতে অনেক জালিয়াতি আছে। তিনি পাঠকেদেরকে হাদীসের কথা, প্রথমে তোমার উঁটের রশি বাঁধো, পরে নির্ভর করো আল্লাহর উপর- স্মরণ করিয়ে বলেন, “এইসব ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে ব্যস্ত হওয়া ঠিক নয়। আমরা কোন শায়খের ভবিষ্যত বলার শক্তি থাকার কথা অস্বীকার করিনা, কিন্তু তারা গণকের মত আচরণ করেন না। যদি শাহ নি’মাতুল্লাহ এটা জেনেও থাকবেন, তার উচিৎ ছিলো গোপন করা”। (আযাইম, ২৮ মার্চ, ১৯৭২, ১০-১১)

ক্বামার ইসলামপুরীর ভাষায়ঃ ভারত বর্ষে গত ১০০ বছরে শায়খ নি’মাতুল্লাহের নামের কবিতা দুটিতে ৮০টা লাইন বানিয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। বিশেষ করে পাকিস্তানে ২৫ বছরে বানানো হয়েছে ৫৮টি লাইন। (ইসলামপুরী, হাযরাত মাহদী, ৫৭)।

এই সব গুলো বিস্তারিত আলোচনার পর ডঃ চৌধুরি মুহাম্মাদ নাইম বলেনঃ আমি ১৯৭১ সালে মাশরিক (লাহোর), চাটান (লাহোর) এ ১৯৭২ সালে এই কবিতা প্রকাশ হতে দেখেছি। এব্যাপারে ইহসান কুরাইশি সাবিরি একটা আর্টকেল লেখেন, তিনি বলেনঃ নি’মাতুল্লাহর প্রথম কবিতা ছাড়া আর দুইটি কবিতা ছিলো বানানো, জালিয়াত। (চাটান, ১০ জানুয়ারী ১৯৭২, পৃ ১৩)।

এই কবিতাগুলোর প্রচারে বেশি কাজ করেছে “দীনদার আঞ্জুমান” নামক এক সংস্থার সামরিক শাখা “হিযবুল্লাহর” এর বিভিন্ন অফিস ও জনশক্তি। এদের নেতা সৈয়দ সিদ্দীক হুসাইন ঘোষণা দিয়েছেন যে, তিনি স্বপ্নের মাধ্যমে মহানবী (সা) কর্তৃক নির্দেশ প্রাপ্ত দাঈ ইলাল্লাহ। তারাই এই কবিতা গুলো সারা পাক-ভারতে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করেছে। এরা নি’মাতুল্লাহ শাহ ওয়ালির নামে ৪টা কবিতা সম্বলিত একটা বই বের করে, যার মাধ্যমে কবির পরিচয় ও নতুন করে দেয়। তিনি নাকি সমরকন্দের লোক ছিলেন বটে, কিন্তু কিরমান ও কাশ্মীরের মানুষদের খেদমাত করেছেন। বইটার নাম হলো “হাক্বীক্বাতে ক্বীয়ামে পাকিস্তান বা তাওসীক্বে বিশারাত” মানে ভবিষ্যদ্বাণীর আলোকে পাকিস্তান রাস্ট্র প্রতিষ্ঠার মূল হাকিকাত।

এদের হাত ধরে বইটা পাকিস্তান সেনা বাহিনীর কাছে যায়, এবং বলা যায় তার প্রতি বিশ্বাসী হয়ে ওঠে পাকিস্তানের বিভিন্ন স্তরের মানুষেরা। কারণ এতে ভারতের বিরুদ্ধে জয়লাভের ভবিষ্যদ্বাণী আছে। মেজর মুহাম্মাদ আফজাল খান, কর্ণেল আব্দুর রঊফ, কর্ণেল কর্ণেল মাতলুব হুসাইন, কর্ণেল আব্দুল কাদির, কর্ণেল মুহাম্মাদ প্রভৃতিগণ এই কবিতাগুলোর অনুবাদ থেকে শুরু করে আধুনিক মনস্কদের কাছে নিয়ে গেছেন।

তবে যিনি এই ভবিষ্যদ্বাণীগুলোকে অনলাইনে এনে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে নিয়েছেন, তিনি হলেন যাইদ হামিদ। তিনিই এই সব কবিতায় ১৯৭১ সালের মুক্তিবাহিনীর কথা পেয়েছেন বিশেষ করে পেয়েছেন “গাযওয়ায়ে হিন্দ” নির্দেশনা। তার দৃষ্টিতে ভারত পরাজিত হতে যাচ্ছে, আর পাকিস্তান হবে এই যুদ্ধে বিজয়ী। এই যুদ্ধের পাকিস্তানী সেনাপতি হবে পাকিস্তানের সন্তান তবে বড় হয়েছে পাশ্চত্যে। তার ইউটিউব ভিডিও গুলোর পরে এর প্রসারের মাত্রা অনেক অনেক বেড়ে গেছে।

ইসলামের দৃষ্টিতে এই ভবিষ্যদ্বাণীঃ

আল্লাহ তাআলা আলকুরআনে স্পষ্টতঃ ঘোষণা করেছেনঃ

وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ مَّاذَا تَكْسِبُ غَدًا وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضٍ تَمُوتُ.
অর্থাৎ মানুষ কাল কি অর্জন করবে তা সে জানেনা, জানেনা কোন ভূমিতে তার মরণ হবে। (লুক্বমানঃ ৩৪)। আমাদের নবী (সা) বলেছেন, অদৃশ্য বিষয়ের উদ্ঘাটক ৫টা। আল্লাহ ছাড়া আর কেও তা জানেনা। কাল কি হবে তা আল্লাহ ছাড়া আর কেও জানেন না। (বুখারী)।

ইসলামের এই মৌলিক নীতিমালা সামনে রেখে এটা স্পষ্টতঃ বলা যায় যে এই ধরণের ভবিষ্যত বলার চেষ্টা করা উচিত নয়।

মানুষ সাধারণতঃ ভবিষ্যতের কথা বলে ৩ভাবেঃ

১. কিছু মানুষ আছে যারা জিন ও দুষ্ট আত্মার সাহায্য নিয়ে ভবিষ্যত বলার চেষ্টা করে। এটা কুরআন ও হাদীসে স্পষ্টতঃ নিষেধ।

২.অভিজ্ঞতা, বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম, রাজনৈতিক বাসামাজিক পট পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট অবস্থা ইত্যাদি লক্ষ্য করে অনেকেই ভবিষ্যতে কি হবে তার একটা অনুমান করেন। এগুলো হতেও পারে, নাও হতে পারে। এটা বিশ্বাস ও যেমন ফরয নয়, অবিশ্বাস করার জন্য ও আদেশ দেয়া হয়নি। বরং এই ধরণের ধারণা করে ভবিষ্যত পথের প্লান করাকে “তাওয়াসসুম” বলেছে, ও তাদেরকে “মুতাওয়াসসিম” বা আলামত দেখে পরিকল্পনাকারী বলে। মূসা (আ) কে প্রতিদান দেয়ার জন্য যে মেয়েটি তার বাবাকে বুঝাচ্ছিলেন, সেখানে বলেছিলেন, প্রতিদান দেয়ার সেরা লোক হলো সে ই, যে শক্তিশালী ও আমানাতদার। (ক্বাসাসঃ ২৬)। আবু বকর (রা) উমার (রা) কে খিলাফতে বাসানোর চিন্তায় এই তাওয়াসসুম ও ফিরাসাতকে কাজে লাগায়েছিলেন। এটা এখনো আছে।

৩. চন্দ্র সূর্যের পরিভ্রমন, তারকারাজির আবর্তন, ষড়ঋতু পরিবর্তনের আবহ ইত্যাদিতে পৃথিবীর অনেক কিছু পরিবর্তন হয়। তার উপর ভিত্তি করে অনেক সময় ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়। যার অনেক খাটে, অনেক খাটেনা। এই গুলোতেও ঐ সব জিনিষ ই পরিবর্তন করায় এটা বিশ্বাস করা যাবেনা।

নি’আমতুল্লাহ শাহ ওয়ালী দাবী করেছেন তিনি আল্লাহর রহস্য দেখতে পাচ্ছেন, এবং তার আলোকে এটা বলছেন, এই কথা ইসলামের মৌলিক নীতিমালার বাইরে যায়। “মালাকুতুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্ব” বা আসমান জামিনের রহস্য ও সাম্রাজ্য আল্লাহ নবী রাসূল বা অলীদের দেখিয়ে থাকেন। তাতে বিশ্ববাসীর উপকার করানোর চেয়ে সংশ্লিষ্ট নবী, রাসূল বা অলীর উপকারার্থে হয়ে থাকে। ইব্রাহীম, মূসা, খিদর, ও মুহাম্মাদ আলাইহিমুস সালামকে সেই রহস্য উন্মোচন করে দিয়ে তাই করেছেন।

আমাদের নবীর (সা) পরে কি ঘটবে তার একটা বর্ণনা তিনি দিয়ে গেছেন, কিন্তু ঐ রকম নাম বলে যান নি। তার ইমেডিয়েট পরে যারা ঝামেলা করবে তার একটা তালিকা তিনি হুযায়ফা (রা) ও আবু হুরায়রাকে (রা) বলে গিয়েছিলেন, কিন্তু তাও ছিলো এমন সিক্রেট যা তিনি কাওকে বলতে দেননি। কাজেই এইসব ভবিষ্যদ্বাণীকে বিশ্বাস করা উচিৎ নয়।

নি’মাতুল্লা শাহ ওয়ালীর ভবিষ্যদ্বাণীর প্রথম কবিতাটা পড়ে দেখেন, ইসলামী নীতিমালার আলোকে বলে যাওয়া। কিন্তু পরের কবিতা দুটো যে বানানো, এবং তার নামে জালিয়াত করা তা বুঝা যায়।

আরেকটা বিষয় এখানে মনে রাখতে হবে, তা হলো যে সব ভবিষ্যদ্বানী ইতিমধ্যে হয়ে গেছে বলে তার অনুসারীরা দাবী করছেন, তারা আরো সামনে কি হবে সে গুলো স্পষ্ট করে বলতে পারছেন না কেন। আর সে সবে নাম আসে না কেন? নামের আদ্য অক্ষর গাফ দিয়ে গান্ধী ইনদিরাকে বুঝাচ্ছে, মিম দিয়ে শেখ মুজিব কেও তারা দেখাচ্ছে, এর পর কি হবে তাদের নাম কই। মোঘল বাদশাহদের নাম আসলো। কত রাজা বাদশহের নাম আসলো। যারা মুসলিম দেশের চিন্তা দর্শন চালায় তাদের কোন নাম নেই কেন? আলিম উলামার নাম তার কাছে খারাপ ভাবেই এসেছে। আরো মজার ব্যাপার হলো তার ভবিষ্যদ্বাণীগুলো বুঝার মত একজন আলিম ও বর্তমানে নেই। যারা এই গুলো ছড়াচ্ছে তারা হয় সরকারের আমলা, না হয় সাধারণ শিক্ষিত। যারা ইসলামি জ্ঞানে একেবারে কাঁচা।

গাযওয়া-ই-হিন্দঃ

গাযওয়া-ই- হিন্দ অর্থ ভারতের যুদ্ধ। ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নিয়ে আমাদের নবী (সা) এর কিছু হাদিস আছে। আবু হুরায়রা (রা) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদেরকে ওয়াদা করেছেন যে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হবে। যদি আমি সেখানে শহীদ হই তা হলে হবো সেরা শহীদ, আর যদি ফিরে আসতে পারি তবে আমি মুক্ত আবু হুরায়রা, (মানে দোযখ থেকে মুক্ত)। এই হাদীসটা ইমাম আহমাদ (২/২২৯) ইমাম নাসাঈ (৩১৭৩, ৩১৭৪) বর্ণনা করেছেন। এই হাদীস দূর্বল, কারণ এর বর্ণনাকারীদের মধ্যে জাবর ইবন আবীদাহ আছেন যিনি মুহাদ্দিসগণের নিকট অজ্ঞাত। ইমাম যাহাবী বলেন (১/৩৮৮) আবু হুরায়রা থেকে তার এই বর্ণনাটা মুনকার হাদীস হিসেবে এসেছে, এবং তার থেকে এই হাদীস আসার ব্যাপারে জানা যায়না। ইমাম আলবানী ও এই হাদীসকে দাঈফ বলেছেন, ঠিক এই মত ই দিয়েছেন শায়খ শুয়াইব আলআরনাঊত মুসনাদের তাখরীজে, (১২/২৯)।

আবু হুরায়রাহ থেকে আরেকটি হাদীস হলোঃ আমার বন্ধু রাসূলুল্লাহ (সা) আমাকে হাদীস শুনিয়েছেন যে, এই উম্মাতের একটা দল সিন্ধু ও হিন্দে যাবে। যদি আমি তাদের পাই তা হলে তো ঐটা, যদিও আমি (এখানে একটা শব্দ বলেছেন), আর যদি ফিরে আসি তা হলে আমি মুক্ত আবু হুরায়রা, আল্লাহ আমাকে দোযখ থেকে মুক্ত করেছেন। ইমাম আহমাদ, ২/৩৬৯। তার এই সনদে দুটো সমস্যা আছে। এই হাদীস আল বারা ইবন আব্দুল্লাহ আলগানাওয়ী বর্ণনা করেছেন। তিনি দূর্বল রাওয়ী। হাসান বসরী আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন, অথচ হাসান বসরী আবু হুরায়রার কাছ থেকে শুনেননি। সর্ব বিচারে এই হাদীস সহীহ হাদীস নয়।

এই ব্যাপারে আরেকটি হাদীস আসে, যেটা মহনবী (সা) এর দাস সাওবান বর্ণনা করেছেন। মহানবী (সা) বলেছেনঃ আমার উম্মাতের দুইটা দলকে আল্লাহ দোযখ থেকে মুক্তি দেবেন, একদল হলো যারা ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, আরেকটা দল ঈসা (আ) এর সাথে থেকে যুদ্ধ করবে”। এই হাদীস ও ইমাম আহমাদ (৫/২৭৮) ও ইমাম নাসাঈ (৩১৭৫) বর্ণনা করেছেন। এই হাদীস সহীহ হবার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।

এই হাদীসগুলোর মূল কথা হলো মুসলমানদের বিজয় পতাকা ভারতে আসবেই, এব্যাপারে আমাদের নবী (সা) ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন এবং ইতিহাসে তা হয়েছে।

উমার (রা) এর সময়ে বাহরাইন ও উমানের গভর্ণর ছিলেন উসমান ইবন আবুল আস। তিনি তার ভাই আলহাকাম ইবন আল আসের নেতৃত্ব ১৫ হিজরীতে একদল সেনাবাহিনী পাঠান “থানা” নামক স্থানে। তারা এটা জয় করে ব্রুস, এবং গুজরাটের উজ্জ নামক এলাকা পর্যন্ত পৌঁছান।

এর পর বছর তিনি আল মুগীরাহ আসসাক্বাফীকে করাচির দেবল পাঠান জল দস্যুদের শেষ করার জন্য। এদের দেখার জন্যই আসেন আলহাকীম এবন জাবালাহ আল আদাওয়ী (রা) খালীফা উসমান (রা) এর আমলে। ( ইসমাঈল নাদাওয়ী, তারীখুস সিলাত বায়নাল হিন্দ ওয়াল বিলাদিল আরাবিয়্যাহ, ৩৭)।

৩৯ হিজরিতে সাইয়্যিদুনা আলী (রা) এর সময় তিনি আলহারিস ইবন মুররাহ আলআব্দী (রা) কে সিন্ধুর জালিমদেরকে শায়েস্তা করতে পাঠান, যারা ঐখানে গড়ে ওঠা মুসলিম দাঈদের উপর জুলুম করতেছিলো। তিনি সেখানে যান এবং কাফিরদের শক্তি চুরমার করে দেন। (আব্বাস আলী খান, বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস, ৩৮)।

সাইয়িদুনা মুয়াওয়িয়া (রা) এর সময় আলমুহাল্লাব ইবন আবু সুফরাহ ও আব্দুল্লাহ ইবন সিওয়ার আলআব্দীকে মুলতানে আসেন, এবং কাবুলের পাশে আহওয়াজ পর্যন্ত পৌঁছান। সেখানে উড়তে থাকে মুসলিমদের বিজয় কেতন। (ইসমাঈল নাদাওয়ী, ৩৯)।

খালীফা আলওয়ালিদ ইবন আব্দুল মালিকের সময় মুহাম্মাদ ইবন আলক্বাসিম আসসাক্বাফীর নেতৃত্বে হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ একদল সেনা বাহিনি পাঠান ৯৩ হিজরিতে। তিনিও হৃত মুলতান আবার পুনরুদ্ধার করেন। কিন্তু সুলায়মান ইবন আব্দুল মালিকের খলীফা হয়ে আসায় সেই বিজয় অভিযান বেশি দূর এগুতে পারেনি।

খালীফা আবু জাফার আলমানসূর হিশাম ইবন উমার আলতাঘলিবীকে ভারত জয়ের জন্য পাঠান, তিনি সিন্ধু হয়ে মুলতান দিয়ে কাশমীর পর্যন্ত পৌঁছান ও সেখানে ইসলামের আলো জ্বালান। (মুহাম্মাদ হাসান আলআযামী, হাক্বাইক আন পাকিস্তান, ১৬)।

এইসব আক্রমন ছিলো ডিফেন্সিভ, এবং সর্ব ভারতীয় নয়।

ভারতের বিরুদ্ধে সফল বিজয় অভিযান শুরু হয় সুলতান মাহমূদ আলআফগানীর হাতে। তুরস্কের এই সুলতান (৯৯৭-১০২৪ ) পর্যন্ত ১৭বার ভারত আক্রমন করেন। এবং তার অনেক অংশ দখল করেন। এর পর থেকে ভারত আস্তে আস্তে ইসলামের অধীনে চলে আসে। ভারতের বিরুদ্ধে গাযওয়া চলতে থাকে মুহাম্মাদ ঘোরীর সময়ে, বিজয় আসে কুতুবুদ্দীন আইবেকের হাতে, বিজয় আসে খিলজীদের হাতে, আসে তুঘলকদের হাতে, আসে বাবরের হাতে। এই যে সব যুদ্ধ হলো, শতাব্দীর পর শতাব্দী ভারত মুসলমানদের হাতে শাসন হলো এর মাধ্যমে কি সেই গাযওয়ায়ে হিন্দের ভবিষ্যত বারতা সত্যি হয়নি?

বর্তমান যামানায় “দীনদার আঞ্জুমান” ই এই সব ভবিষ্যদ্বাণী ও গাযওয়া-ই-হিন্দ ইস্যু মুসলমানদের মাঝে নিয়ে আসে। । এই দলেরই গুণগ্রাহী যাইদ হামিদ গাযওয়া-ই-হিন্দএর আধুনিক প্রবক্তা হয়ে ওঠেন। তিনি এর নতুন রূপ দেন ঐ নি’মাতুল্লাহর কথিত কবিতার উপর ভিত্তি করে। তার বক্তব্য হলো, ভারতের অভ্যন্তর থেকে মুসলিমরা বিদ্রোহ করবে। তাদের পাশেই আফগানিস্তান, চায়না, ইরান, তুর্কি এবং আরব দেশগুলো একত্রিত হবে। এর পর ছয় বছর ব্যাপী একটা যুদ্ধ হবে যার পরিণতি হবে ভারতের পরাজয়। এইভাবে সমগ্র ভারত হবে ইসলামের ছায়াতলে। এখানে ৪০ বছর শাসন করবে একজন ভালো বাদশাহ, এরপর ইস্পাহান থেকে দাজ্জালের আবির্ভাব হবে এবং পরপর ইমাম মাহদী ও ঈসা (আ) ও আসবেন।

গাযওয়া-ই-হিন্দ এর হাদীস আমি বলেছি। এতে কিন্তু কোন সময় এই যুদ্ধ হবে তার কোন কথা আমাদের নবী (সা) বলেন নি। তবে সেই উমার (রা) এর পর থেকে যারাই এসেছে ভারত আক্রমন করতে তাদের মূল প্রণোদনা তো ঐ হাদীস ছিলোই তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখেন। কাজেই গাযওয়া-ই-হিন্দ হয়ে এসেছে, আরো হতেও পারে। ভারত যখন ইংরেজদের হাতে যায় তখন তা ইসলামি দেশ ছিলো। বৃটেইন চলে যাওয়ার পর ও তিনভাগের একভাগ মুসলিম দেশ হিসেবে আছে, বাকি দুইভাগ হিন্দুদের দিয়ে দেয় তারা। হয়ত কাল ক্রমে এটা আবার মুসলিম হয়ে যেতেও পারে, অথবা হয়ে যেতে পারে স্পেনের মত হাতছাড়া। গোটা পৃথিবী আল্লাহর, যারা ইবাদে সালিহূন, তথা যোগ্য বান্দাহ তারাই এর আবাদ করবে এইটাই নিয়ম।

এতো বড় আর্টিকেল লেখার পেছনে কারণ হলো, আমাদের কিছু কিছু লোক এখন উঠেছে যারা পৃথিবী আবাদের মূল কার্যকরণ মেধা, যোগ্যতা, অর্থ, পরিকল্পনা, শক্তি, ও রাজনীতি ইত্যাদি্র পরোয়া না করে বসে বসে ভবিষ্যদ্বাণী নিয়েই কপচাচ্ছে, আর নিত্য নতুন ব্যাখ্যা দিয়েই যাচ্ছে যার সাথে মেইনস্ট্রীম মুসলিম মননের কোন সম্পর্ক নেই। আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন।

Comments

comments