নির্বাচন কমিশন ভবনে আগুন : ২৪ কোটি টাকার ইভিএম ক্ষতিগ্রস্ত

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ভবনে আগুন লাগার ঘটনায় এক হাজারের মতো ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছে নির্বাচন কমিশন। তবে এই সংখ্যা নিয়েও ইসির মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অতিরিক্ত সচিব বলছেন, আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ইভিএমের সংখ্যা এক হাজারের কম হবে না। ইভিএম, বিশেষ করে ব্যালট ইউনিট, মনিটর এগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর এনআইডির মহাপরিচালক জানান, ক্ষতিগ্রস্ত ইভিএমের সংখ্যা এত বেশি হবে না। আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে ইসি ও ফায়ার সার্ভিস কেউই চূড়ান্তভাবে কিছু বলতে পারেনি। তদন্তের পর তারা প্রকৃত তথ্যটি প্রকাশ করবেন বলে জানান। সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও বিশ্লেষকেরা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, নতুন বিল্ডিংয়ে শর্ট সার্কিট কেন হবে। আর শর্ট সার্কিট হলে ভবনের দেয়াল ফেটে যাবে। বিষয়টি ভালোভাবে বিশেষজ্ঞদের তদন্ত করা উচিত। নেপথ্যে অন্য কোনো কিছু আছে কি না সেটিও দেখা দরকার। কেননা, ইসি ভবন একটা স্পর্শকাতর ক্ষেত্র।

ইসির তথ্যানুযায়ী, রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনের নিচতলায় রোববার আনুমানিক রাত ১১টায় আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিট একযোগে কাজ করে প্রায় দেড় ঘণ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানাতে পারেননি তারা। সাড়ে চার হাজার ইভিএম ওই বেজমেন্টে ছিল। ২০১৮ সালে এই ইভিএম তৈরির জন্য তিন হাজার ৫১৫ কোটি ৬০ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়। তাতে দেড় লাখ সেট ইভিএম কেনার কথা। সেই হিসাব অনুযায়ী প্রতিটি ইভিএমের দাম হয় দুই লাখ ৩৪ হাজার ৩৭৩ টাকা। সেই হিসাব অনুযায়ী অতিরিক্ত সচিবের দেয়া তথ্যমোতাবেক এক হাজার ইভিএম ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাতে প্রায় ২৪ কোটি টাকার আর্থিক সংশ্লিষ্টতা হবে।

এ দিকে, ইসি কর্মকর্তাদের ইভিএম মেশিন ক্ষতির পরিমাণ গণনা করে দেখার নির্দেশও প্রদান করা হয়েছে। হিসাব করলে সুনির্দিষ্ট তথ্য দেয়া যাবে উল্লেখ করে ইসি সচিব বলেন, ‘সেখানে ইভিএম মেশিন পাঁচ থেকে ছয় হাজারের মতো ছিল। আমার কাছে মনে হয়, ক্ষতিগ্রস্ত ইভিএম মেশিন এক হাজারের কম হবে না।’

তদন্তে ৬ সদস্যের কমিটি : ইসি ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তের জন্য ছয় সদস্যের কমিটি গঠন করেছে নির্বাচন কমিশন। গতকাল সকালে ইসির উপসচিব (সাধারণ সেবা) রাশেদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এ-সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে ইসির অতিরিক্ত সচিব মো: মোখলেছুর রহমানকে সভাপতি করা হয়েছে। এই তদন্ত কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা হলেনÑ সদস্যসচিব, ইসির সহকারী সচিব (সেবা-২) খ ম আরিফুল ইসলাম, সদস্যরা জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম, গণপূর্তের ই/এম বিভাগ-৮-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল হালিম, গণপূর্ত বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী শাহ ইয়ামিন-উল-ইসলাম ও ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের প্রতিনিধি।

জানা গেছে, এই কমিটিকে তিনটি বিষয় নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এগুলো হচ্ছে : অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার কারণ ও উৎস নির্ণয়, অগ্নিকাণ্ডের ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ (আর্থিক মূল্যসহ) এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের অগ্নিকাণ্ড যাতে না ঘটে সে সংক্রান্ত সুপারিশ প্রণয়ন।

এ দিকে, গতকাল দুপুরে এই অগ্নিকাণ্ড সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক ব্রিফিংয়ে অতিরিক্ত সচিব মো: মোখলেছুর রহমান বলেছেন, এতে ক্ষতির পরিমাণ অল্প। আসন্ন রংপুর-৩ আসনের নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) দিয়ে ভোট করতে সমস্যা হবে না। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ইভিএমের সংখ্যা এক হাজারের কম হবে না বলে জানান তিনি। এ সময় জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইদুল ইসলামও ঘটনাটি নিয়ে কথা বলেন।

মোখলেছুর রহমান বলেন, আপনারা জানেন, গত রোববার রাত ১১টায় আমাদের বেজমেন্ট-১-এর বেশ কয়েকটি কক্ষের মধ্যে একটিতে আগুন লাগে। সেখানে আমাদের ইভিএমের কন্ট্রোল ইউনিট, মনিটর ও ব্যালট ইউনিট আছে। ফায়ার সার্ভিসের প্রায় ১২টি দল এখানে চলে আসে। অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তারা এই আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়। অতিরিক্ত সচিব বলেন, আমি আজকে (সোমবার) ভেতরে গিয়ে দেখলাম, সেখানে অল্পই ক্ষতি হয়েছে। ভেতরে কয়েকটি এসি আছে, সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসির লাইন, বিদ্যুতের ওয়ারিংগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইভিএম, বিশেষ করে ব্যালট ইউনিট, মনিটরগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে কন্ট্রোল ইউনিট যেটা বেশি মূল্যবান সেগুলো পাশের কক্ষে ছিল। সেগুলোর ক্ষতি হয়নি বলে এই কর্মকর্তা জানান।

এক হাজার ইভিএম মেশিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না, জানতে চাইলে ব্রিফিংয়ে থাকা এনআইডির ডিজি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম বলেন, এত হবে না। তিনি বলেন, আমরা যে পরিমাণ ক্ষতির আশঙ্কা করেছিলাম, সে রকম কোনো ক্ষতিই হয়নি। ক্ষতির পরিমাণ নগণ্য। আমি বলব, ফায়ার সার্ভিসের দ্রুত পদক্ষেপের জন্য এত বড় ক্ষতির হাত থেকে বেঁচে গেলাম।

আগামী ৫ অক্টোবর রংপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনে সমস্যা হবে না উল্যেখ করে এনআইডির ডিজি বলেন, রংপুর সিটি করপোরেশনে ১৭৫টি কেন্দ্র রয়েছে। এই কেন্দ্রগুলো চালানোর জন্য আমাদের যে ইভিএম কাস্টমাইজ (ব্যবহার) করা দরকার, সেটি আমরা বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করব। তারপর আমরা কমিশনের কাছে বিষয়টা উপস্থাপন করব। কমিশনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমরা ব্যবস্থা নেব। তবে এনআইডি উইংয়ের পক্ষ থেকে মনে হচ্ছে, ইভিএম ব্যবহার করতে পারব। তিনি বলেন, যেটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা আগুন নেভাতে পানি স্প্রে করার কারণে হয়েছে। সে পানিতে যাতে ব্যালটগুলো ক্ষতিগ্রস্ত না করে সেই ব্যবস্থা নিচ্ছি।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) সাখাওয়াত হোসেনের সাথে কথা হলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, ওই বিল্ডিংয়ের প্ল্যানটা আমাদের সময়ে করা হয়েছিল। তখন ভবনের নিরাপত্তাসহ সব কিছু নিয়ে দফায় দফায় মিটিং করেছি। নিরাপত্তা নিয়েই বেশি সময় আমরা আলোচনা করেছি। তিনি বলেন, অনেকেই আমাকে বলেছে আমাদের করা নকশা অনুযায়ী বিল্ডিংটি হয়নি। তবে অডিটোরিয়ামটা দেখেছি। সিটগুলো আরামদায়ক নয়।

তিনি বলেন, আগুনটা কিভাবে লেগেছে এটাকে আগে চিহ্নিহ্নত করতে হবে। তবে শর্ট সার্কিট থেকে যদি হয় তাহলে সেটা ভাবার বিষয়। কারণ এসব বিল্ডিংয়ে দেয়ালের ভেতর দিয়েই মূলত ইলেক্ট্রিক্যাল লাইন নেয়া হয়। ফলে যদি শর্ট সার্কিট হয় তাহলে দেয়াল ফেটে যাওয়ার কথা সাধারণ জ্ঞানে যা মনে হয়। তাই প্রকৃত ঘটনা ও কারণ উদঘাটনের জন্য তিন ধরনের তদন্ত টিম করা প্রয়োজন। ইসির একটি, যেহেতু ভবনের বিষয় তাই গণপূর্ত বিভাগের একটি এবং আগুনের বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের একটি।

ইভিএম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ব্যাপারে সাবেক এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, যদি এক হাজার ইভিএম মেশিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে তাহলে অনেক টাকার বিষয়। এসবের ইন্স্যুরেন্স করা নেই। আর এসব ইভিএম হলো স্পর্শকাতর। এই এক হাজার ইভিএম পূরণ করা কঠিন হয়ে যাবে।

নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমদের মতে, বড় ধরনের অর্থ ব্যয়ে তিন বছর হলো করা এই বিল্ডিংয়ে শর্ট সার্কিট কেন হবে? এটা প্রশ্ন। নির্বাচন কমিশনের স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানের ভবন অবশ্যই ফায়ার প্রুভড হওয়ার কথা। এখানে ইভিএমের মতো স্পর্শকাতর মেশিনকে সংরক্ষণ করা হবে। জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডির মূল সার্ভার থাকবে। এটি করা হয়েছে কি না সেটা দেখার বিষয়। তিনি বলেন, আগুন কতটা সময়ের মধ্যে ছড়ালো আর ফায়ার সার্ভিসকে কখন জানানো হয়েছে এসব দেখার বিষয়। যদি দেরিতে জানানো হয়ে থাকে তাহলে বিষয়টিকে বিচারের আওতায় আনতে হবে।

তিনি বলেন, তদন্তে দেখতে হবে ফায়ার ফাইটিং ছিল কি না, নিরাপত্তাব্যবস্থা, সরবরাহকৃত ইভিএমের মান টেন্ডার অনুযায়ী ছিল কি না তাও খতিয়ে দেখতে হবে। আর বিশেষজ্ঞদের দিয়ে এই তদন্ত করাতে হবে। যদি কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র বা ডকুমেন্ট নষ্ট হয়ে থাকে তাহলে সেটি ভাবনার বিষয়।

সূত্র: নয়াদিগন্ত

Comments

comments