হার্ডলাইনে শেখ হাসিনা, ছাত্রলীগসহ ১৫০ নেতাকে শোকজ

হার্ডলাইনে টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকারপ্রধানের দায়িত্বে থাকা শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের বিশৃঙ্খলার লাগাম টানতে চান আওয়ামী লীগ সভাপতি। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নানা অভিযোগে অভিযুক্ত ছাত্রলীগের কমিটি ভেঙে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে কাজ করা নেতাদের বিরুদ্ধেও শুরু হয়েছে ‘অ্যাকশন’। রেজিস্ট্রি ডাকযোগে ১৫০ নেতাকে শোকজ চিঠি পাঠানো শুরু হয়েছে। সন্তোষজনক জবাব না দিলে দলীয় পদসহ স্থায়ী বহিষ্কার হবেন এসব অভিযুক্ত নেতা।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তৃতীয় মেয়াদে সরকারের আট মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও অনেক মন্ত্রী, দলের বেশ কয়েকজন নেতা ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কর্মকাণ্ডে মোটেই সন্তুষ্ট নন প্রধানমন্ত্রী। উপজেলা নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে বিদ্রোহী প্রার্থীদের যারা সমর্থন দিয়েছেন তাদের প্রতি নাখোশ তিনি। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ও দুর্নীতি রোধে ব্যর্থতার কারণে সরকার ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। মন্ত্রী, এমপি ও দায়িত্বশীলদের শিথিলতায় বিরক্ত তিনি।

জানা গেছে, ১৫০ নেতার তালিকায় মন্ত্রী, এমপি ও দলটির প্রভাবশালী নেতাও আছেন। এই চিঠির জবাব দিতে হবে তিন সপ্তাহের মধ্যে। চিঠিতে ‘কেন স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে না’, তা-ও জানতে চাওয়া হবে। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে যারা বিদ্রোহী ছিলেন, তাদের শোকজের সিদ্ধান্ত আগে থেকেই ছিল। ১৫০ জনের মতো নেতাকে শোকজ নোটিস ইস্যু করা হবে। শোকজের জবাবের জন্য তিন সপ্তাহ সময় দেওয়া হবে।’ তবে শোকজ পাওয়া নেতাদের তালিকা প্রকাশ করেনি দলটি।

এদিকে শনিবার গণভবনে দলের এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডে বিরক্তি প্রকাশ করেন। ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ রয়েছে জানিয়ে তিনি কমিটি ভেঙে দিতে নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তারা দুপুরের আগে ঘুম থেকে ওঠে না।’ এ সময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মেলনে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের বেলা ১১টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত ছাত্রলীগ সভাপতি ও সম্পাদকের জন্য অপেক্ষা করা, ছাত্রলীগের অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির পরে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের পৌঁছানো, সিনিয়র নেতা তোফায়েল আহমেদকে প্রধান অতিথি করে আয়োজন করা ছাত্রলীগের অনুষ্ঠানে দুই শীর্ষ নেতার দেরিতে উপস্থিত হওয়া নিয়ে আলোচনা হয়।

এছাড়াও বৈঠকে দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার সামনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ইডেন কলেজের সম্মেলনের দুই মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও কমিটি দিতে না পারা, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটি করার বিষয়ে অনৈতিক অর্থনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ আসা, বিবাহিত ও জামায়াত-বিএনপি সংশ্লিষ্টদের পদায়ন করার অভিযোগ, কেন্দ্রীয় কমিটিতে অনেক বিতর্ক ও বিশৃঙ্খলা নিয়ে আলোচনা হয়।

এ সময় গণভবনে অবস্থান করছিলেন ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। সভা শেষে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চাইলেও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের পরামর্শে গণভবন থেকে বেরিয়ে যান তারা।

সংসদের রংপুর-৩ আসনে উপনির্বাচন এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের প্রার্থী চূড়ান্ত করতে আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ড ও স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের ওই বৈঠকে উপস্থিত এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ক্ষোভ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমন নির্দেশ দিয়েছেন। তবে বিষয়টি বাস্তবে কার্যকর না-ও হতে পারে।’ এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘কথা প্রসঙ্গে হয়তো কথা আসে। এটা নিয়ে সিদ্ধান্ত আকারে কোনো কথা হয়নি। কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফোরাম ওটা (বৈঠক) ছিল না। ওখানে ইনসাইডে আমরা অনেক কথাই বলতে পারি, অনেক আলোচনাই করতে পারি। এখানে কোনো কোনো প্রসঙ্গে ক্ষোভের প্রকাশও হতে পারে বা কারও কারও রিঅ্যাকশনও আসতে পারে। কিন্তু অ্যাজ এ জেনারেল সেক্রেটারি অব দ্য পার্টি আমার এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত না এটা ইমপ্লিমেন্টেশন প্রসেসে যায়। এখানে ক্ষোভের প্রকাশ ঘটতে পারে, প্রতিক্রিয়া হতে পারে কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত আকারে কিছু হয়নি।’

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ নিয়ে ছাত্রলীগে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা। একাংশ বলছেন, ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি এ নির্দেশ। দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই ‘ড্যাম কেয়ার’ ভাব কাল হয়েছে শোভন-রাব্বানীর। আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারাও বিরক্ত তাদের কর্মকাণ্ডে। আরেক অংশের বক্তব্য, ছাত্রলীগের বর্তমান নেতৃত্বকে কোণঠাসা করতে সাবেক কিছু নেতা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের কান ভারী করছেন।

এ প্রসঙ্গে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য বলেন, ‘কেন্দ্রীয় কমিটি পরিকল্পনামাফিক কাজ করে যাচ্ছে। সারা দেশে কমিটি হচ্ছে। এসব পজিটিভ কাজে ঈর্ষান্বিত হয়ে সাবেক কিছু নেতা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের কান ভারী করছেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছেও নালিশ করেছেন বিভিন্ন সময়। শনিবারের মিটিংয়ে প্রধানমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বের কর্মকাণ্ডে। এটাকে অনেকে কমিটি ভেঙে দেওয়ার নির্দেশ বলে প্রচারণা চালাচ্ছে।’

টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকায় ‘হাইব্রিড’ নেতাদের সংখ্যা বেড়েছে আওয়ামী লীগে। কিছু ক্ষেত্রে এসব নেতার প্রতাপে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন ত্যাগী নেতারা। এরই চূড়ান্ত রূপ ফুটে উঠে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে। আওয়ামী লীগ এসব নেতার ব্যাপারে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে এগুচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী দিনের রাজনৈতিক বাস্তবতা মোকাবিলায় দলের শক্তি অক্ষু্ন্ন রাখতে দলীয় প্রধানের এই হার্ডলাইনে যাওয়া।

Comments

comments