ঘুষ না পেয়ে পিবিআই কর্মকর্তার অদ্ভুত চার্জশিট!

২০ লাখ টাকা ঘুষ না দেওয়ায় মৃত ব্যক্তি, দেশের বাইরে থাকা লোককে সাক্ষী করে একটি হত্যা মামলার সম্পূরক চার্জশিট দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক মো. হারুনুর রশিদের বিরুদ্ধে। এছাড়া, আরও ২৪ জন সাক্ষী আদালতে হলফনামা দিয়ে বলেছেন তারা কোন সাক্ষ্য না দিলেও তাদের সাক্ষী হিসেবে দেখিয়েছেন তদন্তকারী ওই কর্মকর্তা।

রোববার রবিবার দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলনে এই অভিযোগ করেন নবীনগরের বিদ্যাকুট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হান্নান ভূঁইয়া।

তিনি জানান, ডিআইজিসহ সকল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে দেওয়ার কথা বলে তার কাছে তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসাবে হারুনুর রশিদ এই টাকা দাবি করেন। এ ছাড়া দু’বার ঘুষ বাবদ পিবিআই’র ওই কর্মকর্তাকে ৬০ হাজার টাকা দিয়েছেন তিনি ও তার পরিবার।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, নবীনগরের শিবপুর ইউনিয়নের বাঘাউড়া গ্রামে ২০১৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে আল আমিন (২২) নামের এক ব্যক্তি খুন হন। এ ঘটনায় নিহতের পিতা কসবার খাড়েরা ইউনিয়নের সোনারগাঁও গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বাদী হয়ে নবীনগর থানায় ১০ জনকে এজাহারনামীয় এবং ২/৩ জনকে অজ্ঞাত দেখিয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় পার্শ্ববর্তী সেমন্তঘর গ্রামের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল হান্নান ভূঁইয়া, তার কলেজ পড়ুয়া ছেলে পলাশসহ (ইফতেখার মাহমুদ) মোট ৫ জনকে আসামি করা হয়। মামলাটি নিয়ে নবীনগর থানা-পুলিশ, সিআইডি এবং জেলা গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। এই তিনটি সংস্থার তদন্তেই প্রকাশ পায় আবদুল হান্নান ভূঁইয়ার সঙ্গে আল আমিনের ভগ্নিপতি জাকির হোসেনের জমিজমা সংক্রান্ত পূর্ব বিরোধ রয়েছে। আবদুল হান্নানকে শায়েস্তা করতে নিজের শ্যালককে হত্যা করে জাকির হোসেন। এরপর আবদুল হান্নান, তার ছেলেসহ ১০ জনকে হত্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়। প্রতিটি সংস্থার অভিযোগপত্রে বলা হয় ঘটনার আগের দিন ২০১৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি নিহতের স্ত্রী ইতির নানির বাড়িতে দাওয়াত খেতে যায় আল আমিনের ভগ্নিপতি জাকির ও তার সহযোগী শাওন, বিল্লাল ও মোবারক। খাওয়ার পর জাকির ইতিকে ঘুমের ওষুধ মিশ্রিত খাবার দিয়ে আল আমিনকে নিয়ে পাশের বাড়িতে নাছির ফকিরের মাহফিলে চলে যায়। সেখান থেকে ফেরার পথে তাকে হত্যা করে। এরপর লাশ গ্রামের একজনের বাড়িতে ফাঁস দিয়ে ঝুলিয়ে রাখে। দীর্ঘ তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং সাক্ষীদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির প্রেক্ষিতে নবীনগর থানা, সিআইডি এবং গোয়েন্দা পুলিশ জাকির হোসেন (৩৮), তার সহযোগী বিল্লাল (৩৭), শাওন ওরফে রানা (৪২), মোবারক মিয়াকে (৩৬) অভিযুক্ত করে এ ঘটনায় জড়িত বলে অভিযোগপত্র দেয়। এরপর মামলাটির তদন্তে নামে পিবিআই।

সাংবাদিক সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, পিবিআই’র তদন্তকারী কর্মকর্তা হারুনুর রশিদ মোট ৩৯ জনের জবানবন্দি গ্রহণ করেন। এর মধ্যে বিদ্যাকুট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুর রউফ (৭৩) অন্যতম। ২০১৮ সালের ২ নভেম্বর আবদুর রউফ ইন্তেকাল করলেও সাক্ষী হিসেবে তার জবানবন্দি নেয়ার তারিখ দেখানো হয়েছে ২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারি। অর্থাৎ তার মৃত্যুর ২ মাস ২৯ দিন পর তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। আরেকজন মেরকুটা গ্রামের অজন্ত কুমার ভদ্রের (৬৬) সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারি। কিন্তু তিনি বৈধ পাসপোর্টে ২০১৯ সালের ৯ জানুয়ারি ভারত যান। সেখান থেকে দেশে ফেরেন ৮ ফেব্রুয়ারি। শিবপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহীন সরকারসহ ২৪ জন সাক্ষী আদালতে অ্যাফিডেভিট জমা দিয়েছেন এই বলে যে, তারা পিবিআই’র ওই কর্মকর্তার কাছে কোন রকম সাক্ষীই দেননি। অন্যদিকে পিবিআই এ ৪ জনকে নির্দোষ বলে তাদের অভিযোগপত্রে উল্লেখ করে। এমনকি সিআইডি’র প্রথম দিকের তদন্তে ঘটনায় জড়িত বলে যে ৬ জনের নাম প্রকাশ পায় তাদেরকে সাক্ষী বানিয়ে অভিযোগপত্র দেয় পিবিআই।

সাংবাদিক সম্মেলনে পিবিআই কর্মকর্তা হারুনুর রশিদ খানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং ন্যায় বিচার প্রার্থনা করেন সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল হান্নান ভূঁইয়া।

এ ব্যাপারে পিবিআই এর পরিদর্শক হারুনুর রশিদ ২০ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি তদন্তে যা পেয়েছেন তাই আদালতে জমা দিয়েছেন। আবদুল হান্নান ভূঞা তদন্তে অভিযুক্ত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করছেন।

Comments

comments