ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দু’টি ফুসফুস!

আসাদুল হক

আমি দাঁড়িয়ে আছি, আমার মাথার উপরে একটি শতবর্ষী বৃক্ষ। স্বগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আমি তাকে অনুভব করার চেষ্টা করছি। রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “সকল মুসলিম একটি দেহের মত, যদি দেহের এক অংশে ব্যথা অনুভূত হয়, তাহলে দেহের অন্যান্য অংশ তাতে আক্রান্ত হয়।”

বিশ্বের সকল গাছেরাও কি একটি দেহের মত? জগদীশ চন্দ্র বসু স্যার তো প্রমান করেছেন গাছেরও প্রাণ আছে। তবে আমাজনের তিনশত নব্বই বিলিয়ন গাছের একটি গাছ আক্রান্ত হলে কি সেও ব্যথা অনুভব করে? করে হয়তো, হয়তোবা করে না।

মানুষ হিসেবে আমি, আমরা কতটুকু অনুভব করছি?

পৃথিবীর ফুসফুস আমাজনকে বলা হয়। বলা হয় কারণ পৃথিবীবাসীর প্রয়োজনের প্রায় বিশ শতাংশ অক্সিজেনের ঘাটতি পূরণ হয় এই মহাবন থেকে। এই মহাবনে আছে ৪৫ লাখ প্রজাতির পোকামাকড়, ৪২৮ প্রজাতির উভচর, ৩৭৮ প্রজাতির সরিসৃপ এবং ৪২৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী।

প্রাণীদের সবচে’ বড় কষ্ট হচ্ছে তারা তাদের কষ্টের কথা কারো কাছে বলতে পারে না।

জ্বলছে আমাজন, গাছের সাথে পুড়ে ছাই হচ্ছে প্রাণীরাও। অথচ তারা চিৎকার করে বলতে পারছে না– “আমি পুড়ে যাচ্ছি, আমাকে একটু পানি দাও। ঐখানে আরো দু’জন আটকা পড়েছে তাদেরকে উদ্ধার করো। এখানে কিছু অক্সিজেন মাক্স লাগবে আমরা নিশ্বাস নিতে পারছি না।”

যাকে আমরা ফুসফুস বলছি, বেঁচে থাকার জন্য শরীরের যে অংশটি সুস্থ-স্বাভাবিক রাখা অতি জরুরী। পৃথিবীর সেই অংশটিই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অথচ আমরা নির্বিকার। কিছুই যেন করার নেই।

হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন–”যদি কোনো মানুষের এক উপত্যকা ভরা স্বর্ণ থাকে, তবে সে তার জন্য দু’টি উপত্যকা (ভর্তি স্বর্ণ) হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করে। তার মুখ মাটি ছাড়া আর কিছুতেই ভরে না।”
মানুষ তার প্রয়োজনে বৃক্ষ নিধন করেছে, প্রাণী হত্যা করেছে। এবার সে নেমেছে সোনার খনির সন্ধানে। এই কর্মযঞ্জেও গাছ কেটে বন উজাড় করা হচ্ছে অবলীলায়। শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মানুষ যেদিন মরতে থাকবে সেদিনই কেবল বুঝতে পারবে বৃক্ষ নিধনের ক্ষতি কতটুকু হয়েছে।

এবার আসা যাক বাংলার ফুসফুসে।

আমাজনকে যদি পৃথিবীর ফুসফুস বলা হয় তবে সুন্দরবনকে বাংলার ফুসফুস বলা যায়। বাংলার ফুসফুসকে ধ্বংস করার জন্যও আমাদের প্রচেষ্টা নিরন্তর। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট কীভাবে খুব দ্রুত ধ্বংস করা যায় সে প্রচেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছি খুব জোরেশোরে।

বাগেরহাটের রামপালে তৈরি করা হচ্ছে কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র। তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য প্রতি বছর ৪.৭২ মিলিয়ন টন কয়লা আমদানি করতে হবে। এর জন্য ৮০,০০০ টন ক্ষমতার প্রায় ৫৯ টি বিশাল মালবাহী জাহাজের প্রয়োজন হবে এবং জাহাজগুলিকে পশুর নদীর তীরে জাহাজ বন্দরে নিয়ে যাওয়া হবে। বন্দর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে নদী পথে কয়লাবাহী জাহাজ চলাচল করবে এবং এর মধ্যে নদীর প্রবাহ পথও রয়েছে। পরিবেশ বিশারদদের মতে এই কয়লা বহনকারী যানবাহন প্রায়ই আবৃত হয়, যার ফলে ফ্লাই অ্যাশ, কয়লার ধুলো, সালফার, এবং অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিক বিশাল পরিমাণে ছড়িয়ে পড়বে প্রকল্প এলাকার আশেপাশে। যেটি সুন্দরবনের পরিবেশ বিপর্যয়ের জন্য যথেষ্ট।

ঐ গাছটির নিচে দাঁড়িয়ে আমি চিন্তা করছিলাম ফুসফুস রক্ষায় আমার করণীয় কী!

এমন সময় সেই গাছে একটি পাখি এসে বসলো। আশ্চর্য আমি তার কথা বুঝতে পারছি। সে যেন বক্তৃতা দিচ্ছে!–”এইযে আশরাফুল মাখলুকাত, আচ্ছা তোমাদেরকে সৃষ্টির সেরা জীব কি আদৌ বলা যায়? তোমাদের কাজের প্রায় সবগুলোইতো সৃষ্টির নিকৃষ্ট জীবের মত। তোমাদের নেতারা রাস্ট্রীয় খরচে চোখের চিকিৎসা করাতে লন্ডন যায়। হার্টের বাইপাস সার্জারীর জন্য সিঙ্গাপুর যায়। অথচ তোমাদের ফুসফুস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ধিরে ধিরে সেদিকে তোমাদের দৃষ্টিই ফেরানো যাচ্ছে না। তোমরা কি মনে করেছো যে এখন তোমাদের তেমন কিছু হবে না? তোমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিয়ে কি তোমরা ভাবো না? তাদের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়া কি তোমাদের দ্বায়িত্ব নয়?

হে মাখলুকাত তোমরা আশরাফুল মাখলুকাত হবে কবে?”

Comments

comments