৩ বছরেও ফেরেনি আযমী ও আরমান, মেঝেতে লুটিয়ে কাঁদছে সন্তানেরা!

তিন বছর চলে গেলেও হদিস মেলেনি না আব্দুল্লাহিল আমান আযমী এবং ব্যারিস্টার আহমেদ বিন কাসেম আরমানের। তারা কোথায় আছেন সে সম্পর্কে কারো কাছেই কোনো তথ্য নেই। পরিবারের সদস্যরা জানেন না; আদৌ তারা বেঁচে আছেন কি না। সবাই পথ চেয়ে আছেন হয়তো তারা ফিরে আসবেন। ছেলের প্রতীক্ষায় থাকতে থাকতে চলে গেলেন  আমান আযমীর মা আফিফা আযমও। মেঝেতে লুটিয়ে কাঁদছে আমানের দুই মেয়ে।

২০১৬ সালের ২২ আগস্ট জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমের ছেলে বিগ্রেডিয়ার আবদুল্লাহিল আমান আযমীকে বাড়ি থেকে ফিল্মি স্টাইলে উঠিয়ে নিয়ে যায় সাদা পোষাকের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে তাঁর আর কোন খবর নেই। এ নিয়ে কারো তেমন কোনো মাথাব্যাথাও দেখা যায়নি। তৎকালীন সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক তোলপাড় হলেও বাংলাদেশের গণমাধ্যম ছিল একেবারেই নীরব। বরং সত্যকে আড়াল করে অনেক বিভ্রান্তিকর সংবাদ তখন প্রচার হয়েছে।

তিন বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেলো আমান আযমী ফিরে আসেননি। পরিবার তাকিয়ে রয়েছে প্রয়াত বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পুত্র হুম্মামের মতোই একদিন ফিরবেন সেই আশায়। বার বার প্রশাসন, রাষ্ট্রের কাছে স্বজনরা দৌঁড়ঝাপ করেও কোন লাভ হয়নি।

তিন বছর পরে গতকাল রবিবার বড়ভাই সালমান আযমী ফেসবুকে লিখেছেন, তিনটি বছর পেরিয়ে গেল আমার ভাইটিকে ওরা গুম করেছে। আমার মা অপেক্ষা করতে করতে চলেই গেলেন। আর আমরা এই আশায় বসে আছি যে আল্লাহ্ আমাদের ভাইটিকে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দেবার ব্যবস্থা করবেন। ছোট ভাইয়া, আপনি যেখানেই থাকুন, আল্লাহ আপনাকে হেফাজতে রাখুন।

শুধু আমান আযমী নয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের গত দশ বছরে ৫২৪ জন মানুষেরও বেশী বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে গিয়েছে। এদের বেশিরভাগেরই কোন হদিস মেলেনি। আদৌ তারা ফিরবেন কি না জানেনা পরিবার।

একই সময়ে জামায়াতের সাবেক নেতা মীর কাসেম আলীর ছোট ছেলে ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমানকেও গুম করা হয়। রাতের আঁধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে তাকেও তার বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

ব্যারিস্টার আরমানের মা আয়েশা খন্দকার হ্যাশ ট্যাগ দিয়ে লিখেছেন, তিন তিনটি বছর পুরো হয়ে গেল আমার নিরপরাধী ল’ইয়ার ছেলে কে ল’ এনফোর্স দিয়ে জোর করে নিয়ে লোক চক্ষুর অন্তরালে বন্দী করে রাখার।গুমের তিন বছর #FREE ARMAN #GIVEBACKARMAN #আরমান কে ফিরিয়ে দিন #WE WANT. JUSTICE#FREE BAR.AHMADBINQUASEM ARMAN

গত বছর আরমানের দুই মেয়ে ছবি দিয়ে আরমানের মা লিখেছিলেন – ‘ওদের আব্বুকে এ দেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জোর করে নিয়ে গেছে আজ ২০ মাস। ১বছর ৮ মাস। ওদের স্মৃতির অনেকটা জুড়েই বাবাকে ধাক্কা মেরে মেরে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটাও ছোট্ট চোখের মনি জুড়ে রয়েছে।

পুলিশ সদরদপ্তরের রিপোর্ট অনুসারে আওয়ামী সরকারের দশবছরে (২০০৯-২০১৮) অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ৭৪৫২টি। এর মধ্যে ২০০৯ সালে ৮০০ জন, ২০১০ সালে ৮৮১ জন। ২০১১, ২০১২ এবং ২০১৩ সালে ৮৭০ জন করে অপহৃত হয়েছে। ২০১৪ সালে ৯২২ জন, ২০১৫ সালে ৮০৬ জন, ২০১৬ সালে ৬৩৯ জন, ২০১৭ সালে ৫০৯ জন, ২০১৮ সালের জুলাই পর্যন্ত ২৮৫ জন অপহরণের শিকার হয়েছে।

২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল গুম করা হয় বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে। আজ পর্যন্ত তার কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। একই বছরে ৪ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রকে ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া যাওয়ার পথে বাস থেকে নামিয়ে গুম করে র‍্যাব। দুই ছাত্র ওয়ালীউল্লাহ ও মুকাদ্দাসের আজ পর্যন্ত কোন খোঁজ মেলেনি। চৌধুরী আলমের পরিবার জানেনা কোথায় আছে তাদের পরিবারের বটবৃক্ষ। বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন আহমেদ কিংবা সুখরঞ্জন বালির পরিবার জানেনা কবে দেশে ফিরতে পারবে তাদের অভিভাবক।

গত জুন মাসের ২৯ তারিখে চলে গেলেন ব্রিগেডিয়ার (অব.) আমান আযমীর মা আফিফা আযম। জীবনের শেষ সময়েও ছোট ছেলের মুখে হাত বুলানোর জন্য অপেক্ষায় ছিলেন। এভাবে সন্তান, স্বামী, বাবাদের জন্য অপেক্ষা করতে করতে কেটে যাচ্ছে হাজারও মায়ের দিন।

বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করলেও সে পরিস্থিতির বাস্তব কোনো উন্নয়ন ঘটেনি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেয়া এই মানুষগুলো আদৌ কোনোদিন ফিরবে কিনা কেউ আজও পর্যন্ত বলতে পারছেনা।

Comments

comments