কোরবানিতে চাঙ্গা অর্থনীতি

ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদের মাত্র ৫ দিন বাকি। মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় এই উৎসবকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে দেশের অর্থনীতি। বিভিন্ন পণ্যের ব্যবসায়ীদের চলছে চূড়ান্ত প্রস্তুতি।

ইতিমধ্যে দেশে মজুদ রয়েছে কোরবানির মূল আকর্ষণ ১ কোটি ১৮ লাখ পশু। সীমান্তে কড়াকড়ির মধ্যেও ভারত ও মিয়ানমার থেকে কোরবানির পশু আসতে শুরু করেছে।

এ ছাড়াও চামড়া, মসলা, দা, বঁটি, পরিবহন, পোশাকসহ বিভিন্ন খাতের উদ্যোক্তাদের ব্যাপক কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। বাড়ছে টাকার প্রবাহ। ইতিমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে রেমিটেন্স (প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ)।
ইতিমধ্যে বোনাস পেয়েছেন সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীরা। শহর থেকে টাকা যাচ্ছে গ্রামে। সবকিছু মিলে দেশের অর্থনীতিতে কোরবানির আমেজ শুরু হয়েছে। তবে এর নেতিবাচক দিকও রয়েছে।

বাজারে বাড়তি টাকার প্রবাহের কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। তবে এ বছর ব্যতিক্রম চিত্র রয়েছে। দেশের ২০টিরও বেশি জেলায় বন্যার কারণে এবার উৎসবে কিছুটা ঘাটতির আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ।

জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, দুই ঈদেই বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়ে যায়। শহর থেকে গ্রামমুখী হয় টাকা।

অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক দিক হল, বণ্টন ব্যবস্থায় একটি পরিবর্তন হয়। এতে অধিকাংশ মানুষের কাছেই টাকা পৌঁছে যায়। আর নেতিবাচক দিক হল মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। ১২ আগস্ট দেশে পবিত্র ঈদুল আজহা। এই হিসাবে কোরবানির বাকি মাত্র ৫ দিন। কোরবানিতে পশু জবাইকে কেন্দ্র করেই উদযাপিত হয় মূল উৎসব। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে বর্তমানে দেশে গবাদিপশুর সংখ্যা ৫ কোটি ১০ লাখ।

এর মধ্যে গরু ও মহিষ ২ কোটি ৩৫ লাখ এবং ছাগল ও ভেড়া ২ কোটি ৫৫ লাখ। এ বছর কোরবানির উপযোগী ১ কোটি ১৭ লাখ পশু রয়েছে। এর মধ্যে ৪৪ লাখ ৫৭ হাজার গরু ও মহিষ এবং ৭১ লাখ ছাগল ও ভেড়া। গত বছর কোরবানি হয়েছিল ১ কোটি ১১ লাখ পশু। অর্থাৎ মন্ত্রণালয়ের হিসাব বলছে, কোনো কারণে ভারত থেকে গরু আমদানি না হলেও এ বছর পশুর সংকট হবে না। অন্যদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বিজিবির হিসাব অনুসারে, প্রতিবছর গড়ে ২০ লাখ গরু ভারত থেকে বাংলাদেশে আসে। সরকারি হিসাবে ২০১৩ সালে ভারত থেকে গরু আসে ২৩ লাখ ৭৪ হাজার।

২০১৪ সালে এসেছে ২০ লাখ ৩২ হাজার। ২০১৫ সালে ২২ লাখ। তবে সীমান্তে কড়াকড়ির কারণে এবার আসার পরিমাণ কিছুটা কমবে। এর কারণ হল, সাম্প্রতিক সময়ে ভারত থেকে গরুর মাংস রফতানি বেড়েছে।

এদিকে পশু কোরবানির সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতিতে চামড়ার ব্যাপক গুরুত্ব রয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, প্রতিবছর দেশে দেড় কোটিরও বেশি পশুর চামড়া পাওয়া যায়। এর বড় অংশই আসে কোরবানির পশু থেকে।

চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ খাতের মূল বাজার ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িত অন্যান্য বাজারসহ এ খাতে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়। এ বছর কোরবানির চামড়া কিনতে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে কয়েকটি ব্যাংক। জানা গেছে, প্রতিবছর দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ২২ লাখ টন। রসুনের চাহিদা ৫ লাখ টন, আদা ৩ লাখ টন। এর উল্লেখযোগ্য অংশই কোরবানিতে ব্যবহার হয়। অন্যদিকে গরম মসলা বিশেষ করে এলাচি, দারুচিনি, লবঙ্গ, জিরা, তেজপাতার উল্লেখযোগ্য অংশ কোরবানিতে ব্যবহার হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২ হাজার ৫০০ টন এলাচি, ৭ হাজার ৬০০ টন দারুচিনি, ১৭০ টন লবঙ্গ এবং ৩৭০ টন জিরা আমদানি করা হয়েছে। পণ্য কোরবানির বাজারে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হবে এসব পণ্যের। কোরবানির আরেকটি গুরুত্বপুর্ণ উপকরণ হল কামার আইটেম।

ছুরি, বঁটি, দা, চাপাতি, কুড়াল, রামদা ছাড়া কোরবানিই সম্ভব নয়। সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কোরবানিতে পণ্যটির বাজার এক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। অন্যদিকে বাজারে বাড়ছে টাকার প্রবাহ। ঈদ সামনে রেখে প্রবাসীরা গত বছর রেমিটেন্স পাঠিয়েছিলেন ১৩২ কোটি ডলার। প্রতি ডলার ৮৫ টাকা হিসাবে স্থানীয় মুদ্রায় যা ১১ হাজার ২০০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, এ বছর রেমিটেন্স প্রবাহ কিছুটা বাড়ছে। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের এক সমীক্ষায় বলা হয়, ঈদে পরিবহন খাতে অতিরিক্ত যাচ্ছে ৬০০ কোটি টাকা। এই উৎসবে ভ্রমণ ও বিনোদন বাবদ ব্যয় হয় ৪ হাজার কোটি টাকা। এসব খাতে নিয়মিত প্রবাহের বাইরে যোগ হচ্ছে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা।

এর বাইরে আরও কয়েকটি খাতের কর্মকাণ্ড অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে। যেমন- ২১ লাখ সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সম্ভাব্য বোনাস বাবদ ১২ হাজার কোটি, দেশব্যাপী ৬০ লাখ দোকান কর্মচারীর বোনাস ৫ হাজার কোটি, পোশাক ও বস্ত্র খাতের ৭০ লাখ শ্রমিকের সম্ভাব্য বোনাস ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ঈদ ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তৃতি ঘটায় শহর ও গ্রামে প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

সূত্র: যুগান্তর

Comments

comments