ইউটিউবে কি শিখছে আপনার শিশু?

সোমা দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে ইউটিউবে জনপ্রিয় সিরিজ মি. বিন দেখছিল। দেখার সময় সোমা লক্ষ্য করলো ‘লনলি ওয়াইফ’ নামের একটি ভিডিও সাজেস্ট করা হচ্ছে দেখার জন্য। মাকে প্রশ্ন করলো বাচ্চা মেয়েটি লনলি ওয়াইফ মানে কী? ব্রাক ব্যাংকের কর্মকর্তা মিসেস রেহেনা এই ছোট বাচ্চার মুখে এই কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে গেলেন।

তিনি মোবাইল হাতে নিয়ে দেখলেন বাচ্চা সোমা সেই অনিরাপদ ভিডিও ক্লিপ ওপেন করে বসে আছে! যেখানে এমনকিছু দেখানো হচ্ছিলো যেটা একটি শিশুর মস্তিষ্ককে ধ্বংস করে দিবে অল্প বয়সেই।

শাহরিয়ার চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র। বাবার মোবাইলে ইউটিউবে মীনা কার্টুন দেখছিল। হঠাৎ বাবাকে প্রশ্ন করে রাজু হাজবেন্ড ওয়াইফ লাভ স্টোরি বলতে কী বুঝায়? জনাব মোস্তাক বেসরকারি এয়ারলাইন্স জব করেন। ছেলের হাত থেকে মোবাইল নিয়ে দেখেন ভয়ানক কিছুই দেখতে যাচ্ছিল তার চতুর্থ শ্রেণীতে পড়া বাচ্চা ছেলেটি।

নিঝুম সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে। মা মারা যাওয়া মেয়েটিকে সবসময়ই ভালো রাখার চেষ্টা করেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বড় ভাই রাজীব। একদিন দুপুরে খাবার টেবিলে নিঝুম তার ভাইকে জিজ্ঞাসা করে বসে, পতিতা বলতে কী বুঝায়? সপ্তম শ্রেণীর মেধাবী ছাত্রী বোনের এমন কথায় চোখ দিয়ে ধোঁয়া বের হয়ে যায় রাজীবের।

জিজ্ঞাসা করে ছোট বোনকে, কীভাবে সে পতিতা শব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে? নিঝুম উত্তর দেয় ইউটিউবে গান দেখার সময় স্ক্রল করতে চোখে পড়ে “স্কুলের মেয়েরা কীভাবে পতিতা হচ্ছে দেখুন”।

সেদিন থেকেই ছোট নিঝুমের ইউটিউব দেখা বন্ধ হয়ে যায়। রাজীব আবিষ্কার করে ইউটিউবে এমনকিছু যদি একটা বাচ্চা শিশু দেখার জন্য নাও খুঁজে তবুও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে সামনে চলে আসে।

এটা শুধু রাজধানীর সমস্যা নয়। পুরো বাংলাদেশের চিত্র এখন এটি। সচেতন অভিভাবকরা মানসিক আতংকে থাকে অনিরাপদ ইন্টারনেট (ইউটিউব) নিয়ে। সমস্যা দিন দিন বাড়ছে দেখার নেই কেউই। এমন অনিরাপদ ভিডিও সংখ্যা দেশি-বিদেশি মিলে কয়েক লাখ।

শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউটিউবে যে কেউই চাইলে ভিডিও আপলোড করতে পারছেন। যেখানে মানহীন ও শিশুদের জন্য অনিরাপদ ভিডিও সংখ্যা অনেক বেশি।

এ ব্যাপারে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের আলোচিত শিশু গণমাধ্যম এক্সপার্ট ও বাংলাদেশে শিশুদের জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট আন্দোলনের প্রধান আরিফ বলেন, ভিউ বাড়ানোর জন্য এমনকিছু কনটেন্ট লেখা হয় যেটা দেখে বেশি ক্লিক করছে শিশু কিশোরেরা। মিউজিক ভিডিওর নামে অসভ্যতাকে তুলে ধরা হচ্ছে ও স্বল্প সময়ের নাটক, সিনেমার নামে অশ্লীল ভাষা, পোশাক গল্প তুলে ধরা হচ্ছে ইউটিউবে।

তিনি বলেন, এসব কারণে ইউটিউবকে শিশুদের জন্য মারাত্মক হুমকি বলে আমি মনে করি। দেশ বিদেশের গণমাধ্যমে প্রশংসিত “কিডস মিডিয়া’ প্রধান আরিফ আরও বলেন, অনেক নায়িকা, মডেলের নামে অসভ্য শ্রেণীর কিছু মেয়েও রাতারাতি সেলেব্রিটি হতে ইউটিউবকে ব্যবহার করছে।

আয়ের আশায় ভিউ বাড়ানোর জন্য এমনকিছু ইউটিউবে আপলোড হচ্ছে দিনের পর দিন যেগুলো একজন শিশু কিশোর দেখলে মানসিক ধাক্কা ও সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে। আর সবচেয়ে ভয়ানক হচ্ছে ইউটিউবের নোংরা দেশি-বিদেশি ভিডিওগুলো না খুঁজলেও চোখের সামনে হাজির হয়।

শিশু কিশোরদের হাতে একা ইউটিউব চালাতে দেওয়া এখন মারাত্মক হুমকি। আমি সকল অভিভাবককে বলবো, আপনার শিশু কিশোর ইউটিউবে কি দেখছে খেয়াল রাখুন। ইউটিউবে নোংরা ভিডিওগুলো আপলোডকারীদের দ্রুত গ্রেফতার ও আইনের আওতায় আনা জরুরী বলেও মনে করেন বাংলাদেশের শিশুদের জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট আন্দোলনের প্রধান আরিফ রহমান শিবলী।

Comments

comments