কুমিল্লার বুক থেকে চিরদিনের মত হারিয়ে গেল তিতাস

কুমিল্লা নামটি শোনার সাথে সাথেই হয়তো পাঠকের “কুমিল্লা জেলার” নামটি সবার আগে স্মরণে চলে এসেছে । আর হয়তো মনে পড়ে গিয়েছে কুমিল্লার বুক চিরে প্রবাহমান মেঘনা নদীর শান্ত মেয়ে তিতাসের কথা অথবা ও অদ্বৈত বল্লবর্মন এর বিখ্যাত উপন্যাস “তিতাস একটি নদীর নাম” কাব্যগ্রন্থের কথা । তবে বর্তমানে তিতাস একটি হত্যাকাণ্ডের নাম। কবি আল মাহমুদ এর রচিত “ভর দুপুরে” কবিতাটির কিছু লাইন মনে পড়ে গেল- মেঘনা নদীর শান্ত মেয়ে তিতাসে মেঘের মতো পাল উড়িয়ে কি ভাসে, ওমা এযে কাজল বিলের বোয়ালে পালের দড়ি আটকে আছে চোয়ালে । কোথায় যাবে কোন উজানে ও-মাঝি আমার কোলে খোকন নামের যে পাঁজি হাসছে, তারে নাও না তোমার নায়েতে। গাঙ্গ শুশুকের স্বপ্ন ভরা গাঁয়েতে, সেথায় থাকে শালুক পাতার চাদরে জলপিপিরা ঘুমায় মহা আদরে । শাপলা ফুলের শীতল সবুজ পালিশে থাকবে খোকন ঘুমিয়ে ফুলের বালিশে।

খোকা যেন আজ সত্যিই ঘুমিয়ে আছে । তবে এ ঘুম মহাকালের ঘুম। কবি আল মাহমুদ এর কবিতার মেঘনার শান্ত মেয়ে তিতাস এর মত মানব শিশু তিতাস ঘোষ আজ শান্ত নিথর হয়ে রয়েছে। এ যেন এক অন্য তিতাস। উচ্ছল, প্রাণবন্ত কোমলমতি শিশু, মানুষ “তিতাসের” চিরদিনের মত জীবনের আলো নিভে গেল, উত্তাল পদ্মার নদীর বুকে। গ্রাস করে নিল পদ্মা নদীর বুকে ভাসমান অভিশপ্ত ‘কুমিল্লা নামক ফেরিটি”। তবে এবার তিতাসে ভাসছে না। তিতাস নিজেই ভেসে চলেছে অজানা কোন গন্তব্যে, আর মেঘের মতো পাল উড়িয়ে নয়, মেঘের রাজ্যে চিরদিনের মত হারিয়ে যেতে। এ তিতাস মেঘনা কন্যা তিতাস নয় এই তিতাস হচ্ছে নড়াইল জেলার কোমলমতি শিশু মানুষ তিতাস ঘোষ (১১)।

গত বৃহস্পতিবার (২৫ জুলাই) নড়াইলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র তিতাস ঘোষ (১১) মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়। ওই সময় তাকে খুলনার একটি হাসপাতালে তাৎক্ষণিক ভর্তি করা হলে অবস্থার অবনতি হওয়ায় কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় স্থানান্তর করার পরামর্শ দেন এবং তিতাস ঘোষকে বহনকারী আই সী ইউ সম্বলিত অ্যাম্বুলেন্সটি রাত আটটার দিকে মাদারীপুরের কাঠাল বাড়ির এক নম্বর ঘাটে ‘কুমিল্লা’ নামক ফেরিতে উঠে । তবে এটা ‘কাজল বিল’ নয় কাঠালবাড়ি ফেরিঘাট। আর ফেরির দড়ি আটকে আছে কাঠালবাড়ি ঘাটে। এ মাঝি উজানে যাত্রাত করছে না। কারণ, ভিআইপি নামধারী মানুষগুলো যে এখনো ঘাটে পৌঁছেনি।

অ্যাম্বুলেন্সে মায়ের কোলে পাজি নয় তিতাস নামের শান্ত খোকাটির দেহ ধীরে ধীরে নিথর হয়ে যাচ্ছে । আর ফেরির মাঝির কাছে আকুতি করছে তিতাসের স্নেহময়ী মা সোনামণি ঘোষ । খোকার এ্যম্বুলেন্সটিকে যেন তরী পার করে দেয়। কারণ, শান্ত খোকা যে আসছে না, ঘুমিয়ে পড়ছে নিস্তেজ দেহ নিয়ে । হারিয়ে যাচ্ছে জীবনের আলো আমাবস্যার অন্ধকারে। সেথায় মহা আদরে শালুক পাতার চাদরে জলপিপি ঘুমায় কিনা আমার জানা নেই , শাপলা ফুলের শীতল সবুজ পালিশে খোকার ফুলের বালিশে ঘুমনো হবে কিনা তাও আমার জানা নেই। তবে মায়ের স্নেহের আঁচল ছিন্ন করে পরম মমতার কোশ শূন্য করে তিতাস যেন হারিয়ে যাচ্ছে ঘোর অমাবস্যার অন্ধকারে চলে যাচ্ছে চিরদিনের মত না ফেরার দেশে। তবে সেথায় কি গাঙ্গ শুশুক এর মত স্বপ্নে ঘেরা নির্মল স্বচ্ছ কোন গাঁ আছে কিনা সেটাও আমার জানা নেই। তবে এটা নিশ্চিত মহাকালের পথে কোনো অন্যায়, অবিচার, পক্ষপাতদুষ্টতা, দুর্নীতি ও ভিআইপি নিশ্চয়ই নেই। নিহত শিশু তিতাস ঘোষ(১১) নড়াইল জেলার ‘কালিয়া পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের’ ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র ছিল। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয় সে। কবি আল মাহমুদের কবিতার মত ভরদুপুরে তিতাস নদী পার হতে চায়নি। তিতাস ঘোষ কে বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সটি কাঁঠাল বাড়ির এক নম্বর ঘাটে রাত আটটার দিকে এসে পৌঁছলে । ঘাটে কর্তব্যরত ফেরির লোক জানিয়ে দেন ভি আই পি না আসা পর্যন্ত ফেরি ছাড়া সম্ভব নয়, উপরের নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু ভিআইপি যুগ্ন সচিব এবং ভিআইপি অন্য একটি জেলার সাবেক ডিসি সাহেব যিনি ওই পথে আসছিলেন তাই তিনি ফেরি ধরতে বর্তমান ডিসি কে ফোন করেন। এবং তিনি নির্দিষ্ট সময়ের তিন ঘন্টা পরে রাত ১১ টার দিকে একটি সাদা গাড়িতে করে আসেন এবং “কুমিল্ল”‘ নামক ফেরিটিতে উঠেন। এরপর ফেরি ছাড়ে। কিছুদূর যেতেই নদীর মাঝখানে রাত সাড়ে এগারোটার দিকে তিতাস ঘোষ এম্বুলেন্স এর ভিতরেই মারা যায়। ভিআইপি হলেন সরকারের যুগ্ম সচিব আব্দুল সবুর মন্ডল।

ক্ষমতার কাছে যেন বলি হতে হলো তিতাস নামের প্রাণবন্ত কিশোর তিতাস ঘোষকে। অকাল প্রয়াত ও হলো একটি সম্ভাবনাময় উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।

Comments

comments