মনের যুদ্ধ!

মোস্তাফিজুর রহমান

অনেক সময় আপনার ইসলামী অনুশাসন মানতে ইচ্ছা করবে না। ইচ্ছে জাগে খারাপ কিছু করার। আমরা খুব ভালোভাবেই জানি যে, ইসলাম আমাদের কাছ থেকে যা চায় সেটাই সঠিক। আমাদের বিবেকও সেটাকে সঠিক বলে মেনে নেয়। কিন্তু তবুও, কখনো কখনো আমাদের সঠিকটা করতে ইচ্ছে করে না। আমাদের মন চায় খারাপ কিছু একটা করতে, ওদের মত বন্য হয়ে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সে সময় আবার জাহান্নামের আগুনের কথা মনে পড়ে যায় এবং মারাত্মক ভীত হয়ে পড়ি। আমরা জানি যে, যদি আমরা আমাদের নফসের কথা শুনি তাহলে ভয়ঙ্কর শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। আর এই শাস্তি আমরা চাই না।

মনের এই লড়াই প্রতিনিয়ত চলতে থাকে। বিশেষ করে তাদের মাঝে এটা বেশি দেখা যায়, যারা ইসলামকে সত্য জানা সত্ত্বেও, জান্নাত-জাহান্নামকে সত্য মনে করা সত্ত্বেও বিভিন্ন খারাপ অভ্যাসে জড়িয়ে পড়েছেন। এখন এর সমাধান কী?

প্রথমত, আমাদের বুঝতে হবে এইসব কিছু একটা উদ্দেশ্যের অংশ। এই বিষয়ে একটি চমৎকার হাদিস রয়েছে। হাদিসটি হল – ‘আল্লাহ তা‘আলা যখন জান্নাত সৃষ্টি করলেন, তখন জিবরাইল (আ.)-কে বললেন, যাও, জান্নাত দেখে আস। তিনি গিয়ে উহা এবং উহার অধিবাসীদের জন্য যেই সমস্ত জিনিস আল্লাহ তা‘আলা তৈরী করে রেখেছেন, সবকিছু দেখে আসলেন, এবং বললেন, হে আল্লাহ! তোমার ইজ্জতের কসম! যে কেহ এই জান্নাতের অবস্থা সম্পর্কে শুনবে, সে অবশ্যই উহাতে প্রবেশ করবে। (অর্থাৎ, প্রবেশের আকাঙ্খা করবে)।

অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতের চারপার্শে কষ্টসমূহ দ্বারা বেষ্টন করে দিলেন, অতঃপর পুনরায় জিবরাইল (আ.)-কে বললেন, হে জিবরাইল! আবার যাও এবং পুনরায় জান্নাত দেখে আস। তিনি গিয়ে উহা দেখে আসলেন এবং বললেন, হে আল্লাহ! এখন যা কিছু দেখলাম, উহার প্রবেশপথ যে কষ্টকর। আমার আশংকা হচ্ছে যে, কোন একজনই উহাতে প্রবেশ করবে না। রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেন, অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা যখন জাহান্নামকে সৃষ্টি করলেন, তখন বললেন, হে জিবরাইল! যাও, জাহান্নাম দেখে আস।

তিনি দেখে এসে বললেন, হে আল্লাহ! তোমার ইজ্জতের কসম! যে কেহ এই জাহান্নামের ভয়ংকর অবস্থার কথা শুনবে, সে কখনও উহাতে প্রবেশ করবে না। (অর্থাৎ, এমন কাজ করবে, যাতে উহা হতে বেঁচে থাকতে পারে)। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নামের চারপার্শে প্রবৃত্তির আকর্ষণীয় বস্তু দ্বারা বেষ্টন করলেন এবং পুনরায় জিবরাইলকে বললেন, আবার যাও এবং দ্বিতীয়বার উহা দেখে আস।

তিনি গেলেন এবং এবার দেখে এসে বললেন, হে আল্লাহ! তোমরা ইজ্জতের কসম করে বলছি, আমার আশংকা হচ্ছে, একজন লোকও উহাতে প্রবেশ ব্যতীত বাকী থাকবে না।” [আবু দাউদ- হা/৪৭৪৬, তিরমিযী- হা/২৫৬০, নাসাঈ- হা/৩৭৬৩, মিশকাত- হা/৫৪৫২]

সুতরাং আপনার নফস যদি খারাপ কিছু করতে চায়, এটা খুবই স্বাভাবিক। এখানেই আপনার পরীক্ষা। যখন আপনার মন আল্লাহর অবাধ্য হতে চায়, তখন আপনি কার কথা শুনেন? আল্লাহর কথা নাকি আপনার প্রবৃত্তির কথা?

তখন আল্লাহর কথা শুনুন, যদিও আপনার মন না চায়। জাস্ট, আল্লাহর আনুগত্য করুন, তাঁর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করবেন না। সেই মুহূর্তে আল্লাহ আপনার কাছ থেকে এটাই চান। আর তা হল, তাঁর নিকট আত্মসমর্পণ। আপনাকে অবশ্যই তাঁর হুকুম অনুযায়ী কাজ করতে হবে। ইচ্ছায় হউক অনিচ্ছায় হউক তাঁর বিধান অনুযায়ী কাজ করুন। আল্লাহ জানেন আপনি আপনার কামনার অনুবর্তী হতে চান। আল্লাহ আপনাকে এভাবেই তৈরি করেছেন। যে শয়তান সবসময় আপনাকে ওয়াসওসা দিয়ে যায়, সেই শয়তানও আল্লাহর সৃষ্টি। আপনার ভেতরের সকল কামনা আকাঙ্ক্ষা তাঁরই সৃষ্টি। এই সব কিছু সেই বড় পরিকল্পনার অংশ। আর তা হল, আপনাকে পরীক্ষা করা। যখন আপনার মন খারাপ কিছু করতে চায়, তখন আপনি কার কথা অনুযায়ী কাজ করেন? যখন শয়তান আপনার মনে ওয়াসওসা দেয়, তখন আপনি কার কথা অনুযায়ী কাজ করেন? আপনি কি আল্লাহর কথা শুনেন নাকি আপনার মনের কথা শুনেন?

সে সময় যদি আপনি আল্লাহর আনুগত্য করেন এবং বার বার তা করতে থাকেন তাহলে একসময় ইসলাম পালন করা আপনার জন্য সহজ হয়ে পড়বে। মনের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়ে পড়বে। ইসলামের প্রতি ভালবাসা তৈরি হয়ে যাবে।

রাসুলুল্লাহ (স) এর সময়ে তায়েফের লোকজন জেনা ছাড়তে চায়নি, সুদ ছাড়তে চায়নি, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে অপারগতা প্রকাশ করেছিল। তারা ইসলাম গ্রহণ করতে রাজি হয়েছিল, কিন্তু ইসলামের বিধিবিধান মানতে চায়নি। তাদের একদল প্রতিনিধি মদিনায় এসে রাসুল (স) এর সাথে এ নিয়ে কয়েকদিন যাবত আলোচনা চালিয়ে যায়। যাই হউক, পরবর্তীতে ইসলাম তাদের অন্তরে প্রবেশ করে। ইসলামের বিধিবিধানের প্রতি ভালবাসা তৈরি হয়ে যায়। তাই, মন না চাইলেও আল্লাহর আনুগত্য করুন।

আল্লাহর বিধান মানা ছাড়া কোন পথ নেই। জাহান্নাম কখনো কোন অপশন হতে পারে না।

শয়তান হয়তো আপনাকে ওয়াসওসা দিয়ে বলতে পারে – ” তুমি তোমার মনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে পারবে না।” কিন্তু এটা সত্য নয়। আল্লাহ বলেছেন – “আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোন কাজের ভার দেন না।” আপনার নফসের বিরুদ্ধে জেতার সামর্থ্য দিয়েই আপনাকে তৈরি করা হয়েছে। সূরা তীনে আল্লাহ বলেছেন – ” অবশ্যই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম গঠনে।” আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন সর্বোত্তম গঠনে, জটিল ডিজাইনে, এবং যে কাজের জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে মানুষ সেই কাজ করার সামর্থ্য রাখে।

শয়তান আপনার অন্তরে নেগেটিভ সব চিন্তা ঢুকিয়ে আপনাকে হতাশ করে দিতে চায়। আপনাকে হতাশ করে দিলে তার কী লাভ? তার লাভ হল, যদি হতাশ হয়ে পড়েন তাহলে আবার খারাপ অভ্যাসগুলোতে সহজেই জড়িয়ে পড়বেন। কিন্তু যদি আলস্য ছেড়ে দ্রুত উঠে পড়েন, নামাজ আদায় করা বাকি থাকলে নামাজ আদায় করেন, খারাপ কোন কাজ করতে থাকলে সাথে সাথে তা থামিয়ে দেন, তাহলে পরকাল নিয়ে আপনার মাঝে আশা তৈরি হবে। আর যখন আপনি পরকাল নিয়ে আশাবাদী হয়ে উঠবেন, আপনার অন্তরে খারাপকে মোকাবেলা করার শক্তি তৈরি হবে, ভালো কাজ করার উৎসাহ বেড়ে যাবে।

শয়তান আমাদেরকে আমাদের সবচেয়ে দুর্বল মুহূর্তে আক্রমণ করে। সেই দুর্বল সময়টি বের করুন। সে সময়টি হতে পারে অফিস থেকে বাসায় ফেরার পর বা অন্য কোন সময়। সে সময় ভালো কিছু করুন, বাইরে থেকে ঘুরে আসুন বা জোর করে কোন লেকচার শুনুন, কুরআন তিলাওয়াত শুনুন বা আমাদের রাসুলুল্লাহ (স) এর জীবনী পড়ুন। এমন কিছু শুরু করবেন না যা আরও বড় খারাপ কাজের দিকে তাড়িত করে। অনেক সময় ক্লান্ত থাকলে মনের জোর কমে যায়। তাই কোন কিছু করতে না চাইলে, দোয়া পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়ুন।

মনে রাখুন, এই লড়াইয়ে আপনার জেতার সামর্থ্য আছে এবং আপনি জিতবেন। কারণ আপনাকে যে জিততেই হবে।

Comments

comments