ডেঙ্গুজ্বরে আসলেই কি আতঙ্কের কিছু নেই?

ছেলেধরা আতঙ্ক ও গুজবের সাথে সাথে ডেঙ্গুজ্বরে কাঁপছে দেশ। অন্যান্য বছরগুলোর তুলনায় ডেঙ্গুর ভয়াবহতার মাত্রা ও ভিন্নতা এবছর বেড়েছে। তা স্বত্বেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার বদলে “আতঙ্কের কিছু নেই নেই” বলে এই ভয়াবহতাকে অবহেলা করে পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে সিটি করপোরেশন ও সরকারের বিভিন্ন কর্তাব্যক্তি। পাশাপাশি জনগণের ডেঙ্গুর ব্যাপারে সচেতনতার অভাব তো আছেই। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচীর অভাব। নিম্নমানের মশানাশকে মরছে না মশা। হাসপাতালগুলোতে রোগীর ভিড় বাড়ছেই, সবমিলিয়ে এক দিশেহারা পরিস্থিতিতে জনগন।

ডেঙ্গুজ্বরের কারণ:
এডিস (Aedes aegypti) মশার কামড়ের মাধ্যমে ডেঙ্গুজ্বর ছড়ায়। এই একই মশা চিকুনগুনিয়া, জিকা, মায়ারো এবং হলুদ জ্বরের ভাইরাস ছড়ানোর জন্যও দায়ী। ডেঙ্গুজ্বরের রোগীর রক্তে ডেঙ্গু ভাইরাস থাকে। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীকে কামড়ানোর সময় ডেঙ্গু ভাইরাসগুলো মশার শরীরে প্রবেশ করে। এর এক থেকে দুই সপ্তাহ পরে ওই জীবাণুগুলো সংক্রমণ উপযোগী হয়। তখন থেকে ওই মশা অন্য সুস্থ মানুষকে কামড়ালে এই জীবাণুগুলো ওই সুস্থ মানুষের শরীরে প্রবেশ করে এবং ডেঙ্গুজ্বর হয়।

সাধারণত যেকোনো এক প্রকারের ডেঙ্গু ভাইরাস দিয়ে কারো একবার ডেঙ্গু জ্বর হলে সেই প্রকারের ভাইরাস দিয়ে তার আর ডেঙ্গু জ্বর হয় না। কিন্তু অন্য বাকি ৩ প্রকারের ডেঙ্গু ভাইরাসের যেকোনো প্রকারের ভাইরাস দিয়ে দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থবার সংক্রমণ হতে পারে।

ডেঙ্গুজ্বর সংক্রমনের সময়কাল:
সাধারণত বর্ষাকাল এবং বর্ষার পরপরই ডেঙ্গু জ্বর বেশি হয়। জুলাই থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ থাকে। কারণ এ সময়টিতে এডিস মশার বিস্তার ঘটে। কিন্তু এবছর দেখা যাচ্ছে ডেঙ্গু জ্বরের সময়কাল আরো এগিয়ে এসেছে।

এডিস মশা কখন কামড়ায়?
এডিস মশা ‘ভদ্র মশা’ হিসেবে পরিচিত এডিস মশা অন্ধকারে কামড়ায় না। সাধারণত সকালের দিকে এবং সন্ধ্যার কিছু আগে এডিস মশা তৎপর হয়ে উঠে। এসব মশা সুন্দর-সুন্দর ঘরবাড়িতেও বাস করে এবং ডিম পাড়ে স্বচ্ছ পানিতে।

ডেঙ্গু জ্বরের প্রকার:
ডেঙ্গু ভাইরাস চার রকমের ডেন -১ থেকে ডেন -৪। (DENV -1 to DENV -4) এগুলো থেকে তিন ক্যাটেগরির সংক্রমন হয়ে থাকে

১ম ক্যাটাগরির রোগীরা নরমাল থাকে। তাদের শুধু জ্বর থাকে। অধিকাংশ ডেঙ্গু রোগী ‘এ’ ক্যাটাগরির।
তাদের হাসপাতালে ভর্তি হবার কোন প্রয়োজন নেই।

২য় ক্যাটাগরির ডেঙ্গু রোগীদের সবই স্বাভাবিক থাকে, কিন্তু শরীরে কিছু লক্ষণ প্রকাশ পায়।

সাধারণত ডেঙ্গুজ্বরের লক্ষণ:

হঠাৎ ১০২-১০৪ ডিগ্রি জ্বর সাথে মাথাব্যথা
চোখে ব্যথা বা আলোর দিকে তাকাতে সমস্যা হওয়া
শরীরের চামড়ায় লালচে ছোপ বা র‌্যাশ ওঠা
পেটে ব্যথা, বমিভাব, বমি হওয়া ও খাওয়ার অরূচি হওয়া
অনেক সময় দেখা যায়, দুইদিন জ্বরের পরে শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যায়। এক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি হওয়াই ভালো।

ডেঙ্গুর নতুন লক্ষণ:
এ বছর ডেঙ্গু জ্বর ভিন্নমাত্রা ও উপসর্গ নিয়ে দেখা দিচ্ছে।

  • সচরাচর টানা পাঁচ–ছয় দিন জ্বর থাকে। কিন্তু এবার অপেক্ষাকৃত কম সময় ধরে জ্বরের পরই হঠাৎ ক্রিটিক্যাল ফেজে মোড় নিচ্ছে।
  • র‌্যাশ বা গায়ে ব্যথার পরিবর্তে কাশি, পাতলা পায়খানা, বমির মতো নতুন ধরনের উপসর্গ দেখা যাচ্ছে।
  • দ্রুত এসজিপিটি ও ক্রিয়েটিনিন বাড়তে থাকা, কারও কারও লাইপেজ বেড়ে যাওয়া।
  • মাল্টি অর্গান ফেইলিউর বা বিভিন্ন অঙ্গে আঘাত হানা (যেমন কিডনি ফেইলিউর, যকৃতের সমস্যা, মায়োকার্ডাইটিস), বুক ও পেটে পানি জমার মতো জটিলতা।
  • অনেকের ডেঙ্গু হওয়া সত্ত্বেও রক্তে ডেঙ্গু অ্যান্টিজেন নেগেটিভ থেকে যাচ্ছে। যাতে ডেঙ্গু নির্ণয়ও কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
  • এ ধরনের নতুন বিশেষত্ব নিয়ে দেখা দিচ্ছে ডেঙ্গু। তৃতীয় বা চতুর্থবারের মতো আক্রান্ত হওয়ার কারণেই তীব্রতার এ মাত্রা। তাই এ সময় জ্বর হলেই দ্রুত সতর্ক হওয়া এবং ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়াই ভালো।

মৃত্যুর কারণ যে ডেঙ্গু:
৩য় ক্যাটাগরির ডেন -২ ভাইরাসজনিত হেমোরেজিক ডেঙ্গুজ্বর খুবই বিপজ্জনক। কিছু-কিছু ক্ষেত্রে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ’র প্রয়োজন হতে পারে। এ ডেঙ্গু ভাইরাসের আক্রমণে হেমোরেজিক ফিভার হয়। তাছাড়া একবার ডেঙ্গু হবার পর দ্বিতীয়বার হলে হেমোরেজিক ফিভার হবার আশংকা বেড়ে যায়। ডেঙ্গু হেমোরেজিকে রক্তনালির অন্তর্গাত্রে ছোট ছোট ছিদ্র হয় একে মাইক্রোলিকেজ বলে। সাধারণত ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বর শুরুর তিন থেকে ছয় দিনের মাথায় এমনটি হয়ে থাকে।

এ সময় রক্তে ভাইরাসের পরিমাণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌছায়। ভাইরাসের আক্রমণে রক্ত কোষগুলো থেকে বিভিন্ন রকমের ইনফ্লামেটরি মেডিয়েটর নিঃসৃত হয় এবং এই মেডিয়েটরগুলোর প্রভাবেই রক্তনালির দেয়ালে ছিদ্র বা মাইক্রোলিকেজ সৃষ্টি হয়। এই মাইক্রোলিকেজ দিয়ে রক্তনালী থেকে রক্ত বের হতে থাকে। এতে লালা চোখ নাক মুখ প্রস্রাব ও পায়খানার সঙ্গে রক্ত যাওয়া শুরু হয়। অনেক সময় দেহের ভেতরে রক্তক্ষরণ হতে থাকে যা বাইরে থেকে দেখা যায় না।ফলে হাইপোভলিউমিয়া, নিম্ন রক্তচাপ ও রক্তশুন্যতা দেখা দেয়। এ থেকে রোগী শকে চলে যায় এ অবস্থাকে বলে ‘ডেঙ্গু শক সিনড্রোম’এতে রোগি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

ডেঙ্গুজ্বর প্রতিরোধে করণীয়:

  • দীর্ঘমেয়াদে না করলেও অন্তত এই সময়ে মশা তাড়ানোর ঔষধ, কয়েল বা স্প্রে ব্যবহার করুন
    দিনে বা রাতে যেকোনো সময় ঘুমাতে মশারি ব্যবহার করুন
  • ফুলের টব, এসি, ফ্রিজের নিচের, অথবা যেকোনো আবদ্ধ পানি পরিস্কার করুন
  • পরিত্যক্ত গাড়ির টায়ার, নারকেলের মালা বা ডাবের খোসা ইত্যাদি যেন যেখানে সেখানে পড়ে না থাকে সেটা খেয়াল রাখুন।
  • ঘরের আনাচে কানাচে অন্ধকার জায়গায় নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় মশানাশক/কীটনাশক ঔষধ বা স্প্রে ব্যবহার করুন।
  • দিনের বেলা মশার কামড় থেকে বাঁচতে ফুলহাতা জামা, প্যান্ট বা পায়জামা পরিধান করুন।

ডেঙ্গুজর প্রতিকার ও চিকিৎসা:
ডেঙ্গু জ্বরের সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। সাবধানতা অবলম্বন করলে এক সপ্তাহের মধ্যেই সাধারণ ডেঙ্গুজ্বর নিজে থেকে ভালো হয়ে যায়। এছাড়াও যা করবেন-

  • স্বাভাবিক খাবারের পাশাপাশি রোগীকে প্রচুর তরল খাবার যেমন ডাবের পানি, লেবুর শরবত, ফলের জুস এবং খাবার স্যালাইন খাওয়ানো।
  • রোগীকে সবসময় মশারির ভেতর বিশ্রামে রাখা। যাতে তার থেকে অন্যদের মধ্যে ডেঙ্গু না ছড়ায়।
  • জ্বরে প্রয়োজনে শুধুমাত্র প্যারাসিটামল খাওয়া যেতে পারে।
  • অ্যাসপিরিন/NSAID বা কোনো ব্যথানাশক ঔষধ সেবন না করা।
  • গিটে ব্যথার ক্ষেত্রে ঠান্ডা পানির সেঁক বা হালকা ব্যায়াম করা যেতে পারে।
  • প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

তথ্য সূত্র:
অধ্যাপক ডা: মো: শহীদুল্লাহ্
অধ্যাপক এবিএম আবদুল্লাহ

ড. সানিয়া তাহমিনা
ডা. মো. সাঈদ এনাম, সাইকিয়াট্রিস্ট

Comments

comments