বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি কেলেঙ্কারি: ২৩০ কোটি টাকা আত্মসাৎ!

বড়পুকুরিয়া কয়লা কেলেঙ্কারির ঘটনায় সাবেক একাধিক এমডিসহ কোল মাইনিং কোম্পানির দুই ডজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে দুদক। পেট্রোবাংলার তদন্তে কয়লা দুর্নীতির বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ায় ওই কমিটির সদস্যরা আসছেন জিজ্ঞাসাবাদের আওতায়।

ওই রিপোর্টে সিস্টেম লসের কারণে কয়লার ঘাটতির কথা বলা হয়। কিন্তু দুদকের তদন্তে প্রমাণ মিলেছে, কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণেই খনির কয়লা কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটে। জড়িতদের বিরুদ্ধে খুব শিগগির কমিশনে রিপোর্ট দাখিল করবে কমিটি।

জানা গেছে, বড়পুকুরিয়া খনির কয়লা চুরির ঘটনা কর্তৃপক্ষের প্রথম নজরে আসে গত বছরের জুনে। যখন বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কাছে কয়লা সরবরাহে ঘাটতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে। দেশের একমাত্র কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বড়পুকুরিয়ার খনি থেকেই কয়লা সরবরাহ করা হয়।

সেখানে এক লাখ ৪২ হাজার টন কয়লা গায়েব হয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠার পরই বিষয়টি আলোচনায় আসে। এ কয়লা চুরির ঘটনায় মামলার তদন্ত শুরুর পর দুদকের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদও বলেছিলেন, দ্রুত তদন্ত শেষ করে এর প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করবে দুদক।

শিগগির এর ফলাফল, আইনি ভাষায় যাকে বলা হয় ফাইনাল রিপোর্ট অথবা চার্জশিট (সেটা) আমরা আদালতে সাবমিট করব। ‘দিস ইজ আ ভেরি সিম্পল কেস’। তদন্তের এ পর্যায়ে অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, তদন্ত চলমান।

খনি দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, মামলায় যে ১৯ জনকে আসামি করা হয়েছিল তারা ছাড়াও আরও কিছু নতুন নাম যুক্ত হচ্ছে। দুদক সূত্রে জানা গেছে, স্বল্পসময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করে জড়িতদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিলের জন্য কমিশন থেকে তদন্ত টিমকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

ওই নির্দেশনা পাওয়ার পর টিমের সদস্যরা নড়েচড়ে বসেছেন। তারা সংগ্রহ করেছেন ২০০৫ থেকে ২০১৮ সালের ২৫ জুলাই পর্যন্ত এমডিসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের নাম-ঠিকানা।

মামলার ১৯ আসামির মধ্যে কে কোথায় আছেন, কতজন জামিনে আছেন তাদের বিষয়েও খোঁজখবর শুরু হয়েছে। মামলার পরপরই সাবেক এমডি প্রকৌশলী হাবিব উদ্দিন আহমেদসহ ১৯ জনের বিদেশ গমনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

তালিকায় হাবিব উদ্দিন আহম্মেদ ছাড়াও সাময়িক বরখাস্তকৃত বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির মহাব্যবস্থাপক (মাইন অপারেশন) নূর-উজ-জামান চৌধুরী, কোম্পানি সচিব ও মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) আবুল কাশেম প্রধানিয়া, মহাব্যবস্থাপক নূর-উজ-জামান চৌধুরী, উপ-মহাব্যবস্থাপক (স্টোর) একেএম খালেদুল ইসলামসহ ব্যবস্থাপক, উপ-ব্যবস্থাপক ও সহকারী ব্যবস্থাপক পর্যায়ের ১৯ জনের বিরুদ্ধে খনির ওই কয়লা চুরির ঘটনায় অভিযোগ আনা হয়।

মামলার পরপরই ১৯ জনের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে দুদক। সেই নিষেধাজ্ঞা এখনও বলবৎ। তদন্ত পর্যায়ে দুদকের তদন্ত টিম সাবেক একাধিক এমডিসহ ৩২ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তারা একে অপরের কাঁধে দায় চাপিয়ে নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করেন।

খনির কয়লা কেলেঙ্কারি মামলার তদন্ত করছেন দুদকের উপ-পরিচালক মো. সামসুল আলম। এই তদন্ত তদারক করছেন পরিচালক কাজী শফিকুল আলম। অনুসন্ধান শুরুর পরপরই কাজী শফিকুল আলম কয়লা খনি পরিদর্শন করে অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

তিনি বেশ কিছু তথ্য-প্রমাণ নিয়ে আসেন। দুদক কর্মকর্তারা পরিদর্শনে গিয়ে খনির ইয়ার্ডে দুই হাজার টন কয়লা পান। যদিও কাগজে-কলমে সেখানে এক লাখ ৪৬ হাজার টন কয়লা মজুদ থাকার কথা। তদন্ত কর্মকর্তা সামসুল আলম বলেন, এটি একটি পেন্ডিং মামলা। আমরা তদন্ত শেষ করে কমিশনের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করব।

সূত্রমতে, দুদকের তদন্ত টিম দ্রুত কাজ শেষ করতে বেশ কিছু কৌশল গ্রহণ করেছে। তবে টিমের সদস্যরা তাদের কৌশল প্রকাশ করতে চাচ্ছেন না। তবে এটুকু ধারণা পাওয়া গেছে, যাদের বিরুদ্ধে মামলার তদন্ত চলামান, তারা কেউ জামিনের বাইরে থাকলে গ্রেফতার হচ্ছেন।

আর নতুন করে তদন্তে যাদের নাম উঠে এসেছে তাদের ওপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে। তারা যাতে দেশত্যাগ করতে না পারেন, সেদিকেও নজর রাখছে দুদক।

খনি কর্তৃপক্ষের দায়ের করা মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে এক লাখ ৪৪ হাজার ৬৪৪ টন কয়লা খোলা বাজারে বিক্রি করে ২৩০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়।

এ ছাড়া ক্ষমতার অপব্যবহার, জালিয়াতি, বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ও এর সঙ্গে যোগ করা হয়। কয়লা কেলেঙ্কারিতে জড়িতরা ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি দমন প্রতিরোধ আইনের ৫(২) এবং ৪০৯ ধারা অনুযায়ীও শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন বলে এতে উল্লেখ করা হয়।

সে কারণে মামলার এজাহারে ‘তদন্তসাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা’ নেয়ার বিষয়ে অনুরোধ করা হয়েছিল। দুদক টিম মনে করে, অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে মামলার অভিযোগেই ধারণা দেয়া হয়েছে। তদন্ত করে তার সত্যতা পাওয়ায় এখন এর পেছনে আর কারা জড়িত তাদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।

সূত্র জানায়, দুদকের তদন্তে বেশ কিছু নতুন নাম বেরিয়ে এসেছে। ২০০৫ সাল থেকে ২০১৮ সালের ২৫ জুলাই পর্যন্ত ৯ জন এমডি দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের তালিকা সংগ্রহ করা হয়েছে।

এ তালিকায় রয়েছেন- গোলাম মোস্তফা, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, মাহবুবুর রহমান, আবদুল আজিজ খান, প্রকৌশলী খুরশীদুল হাসান, প্রকৌশলী কামরুজ্জামান, মো. আমিনুজ্জামান, প্রকৌশলী এসএম নুরুল আওরঙ্গজেব ও প্রকৌশলী হাবিব উদ্দিন আহমেদ। এদের মধ্যে সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম মোস্তফা মারা গেছেন।

আর প্রকৌশলী হাবিব উদ্দিন আহমেদ মামলার আসামি। কয়লা কেলেঙ্কারিতে বাকি ৭ জনের সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

যেভাবে জানাজানি হয় ঘটনা : কয়লা চুরির ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের প্রথম টনক নড়ে গত বছরের জুনে। বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কাছে কয়লা সরবরাহে ঘাটতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে।

যন্ত্রপাতি স্থানান্তর করতে জুন মাসের মাঝামাঝি থেকে খনির উৎপাদন কিছুদিন বন্ধ থাকবে- এ খবর পাওয়ার পর বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। জুলাই মাসে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ করে দেয়া হয়।

এরপর জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। জুলাইয়ের মাঝামাঝি তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ হয়। এতে দেখা যায়, ২০০৫ সাল থেকে বড়পুকুরিয়া খনির কয়লা উৎপাদন এবং সরবরাহের হিসাবের মধ্যে বড় ধরনের গরমিল রয়েছে।

কাগজে-কলমে গরমিলের পরিমাণ ১ লাখ ৪৪ হাজার ৬৪৪ টন। তখনই ফাঁস হয়, ১৪ বছর ধরে খনি থেকে কয়লা চুরি হয়েছে। খনি কর্তৃপক্ষের মামলায়ও অভিযোগ করা হয়, ২০০৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ১৯ জুলাই পর্যন্ত ১ লাখ ৪৪ হাজার ৬৪৪ টন কয়লা চুরি হয়েছে। যার আনুমানিক মূল্য ২৩০ কোটি টাকা।

এদিকে পেট্রোবাংলা কর্তৃক গঠিত কমিটির তদন্ত রিপোর্টে সত্য গোপন করে কাউকে রক্ষার চেষ্টা করা হয়েছে কি না, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এ জন্য ওই কমিটির সদস্যদের সঙ্গে দুদকের কর্মকর্তারা কথা বলবেন বলে জানা গেছে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইন্স) মো. কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গত বছর ২৫ জুলাই সরকারের কাছে ওই রিপোর্ট দাখিল করে। রিপোর্টে বাতাসের সঙ্গে ডাস্ট, বৃষ্টির পানিতে ফাইন পার্টিকেল ওয়াশ আউট কয়লার মজুদ হ্রাস করেছে বলে উল্লেখ করা হয়।

এতে আরও বলা হয়, বৃষ্টির পানিতেও মজুদ কয়লা থেকে কোল ডাস্ট বা ফাইন পার্টিকেল ধুয়ে যাচ্ছে। এসব কারণেও কয়লার ঘাটতি হতে পারে। এ বিষয়ে ব্যাপক তদন্তের প্রয়োজন আছে বলে রিপোর্টে মতামত তুলে ধরা হয়।

তবে কয়লা ঘাটতির জন্য খনির সাবেক এমডি মার্কেটিং ও মাইন অপারেশন বিভাগের কর্মকর্তারা দায়ী বলে রিপোর্টে বলা হয়। এতে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৫২৫ টন কয়লা ঘাটতির কথা স্বীকার করে সাবেক এমডিসহ মার্কেটিং ও মাইন অপারেশন বিভাগের কর্মকর্তাদের অদক্ষতা ও অজ্ঞতাকে দায়ী করা হয়।

এ ছাড়া ২০০৫ সালের পর থেকে কখনোই কয়লার মজুদ পরিমাপ করা হয়নি বলে মন্তব্য করা হয়। পেট্রোবাংলা গঠিত কমিটির তদন্তে কয়লা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করা বা কয়লা গায়েব বা চুরির সঙ্গে জড়িত কারও বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশও না করায় বিষয়টি দুদকের তদন্তের আওতায় আনা হয় বলে জানা গেছে।

কর্মকর্তারা বলেন, বাতাসের সঙ্গে ডাস্ট উড়ে যাওয়ায় কয়লার মজুদ হ্রাস’ পাওয়ার গল্প অবিশ্বাস্য।

Comments

comments