আহ্বায়ক কমিটিতেই ছাত্রদল সংকটের সমাধান?

ছাত্রদলের বিলুপ্ত কমিটির নেতাদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সৃষ্টি হওয়া সংকটের সমাধানে এখনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে পারেনি বিএনপির হাইকমান্ড। এতে একদিকে যেমন আহ্বায়ক কমিটি গঠন প্রক্রিয়া থমকে আছে তেমনি ঘোষিত কাউন্সিল প্রক্রিয়াও আটকে গেছে। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতার দফায় দফায় বৈঠকের পর সঙ্কট সমাধানের দ্বারপ্রান্তে গিয়েও অজ্ঞাত কারণে ঝুলে আছে সিদ্ধান্ত। এখন সবাই তাকিয়ে আছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দিকে। এদিকে, নিজেদের দাবি আদায়ে সমঝোতার পাশাপাশি কঠোর আন্দোলনেরও প্রস্তুতি নিচ্ছেন বিলুপ্ত কমিটির নেতারা। সংগঠনের নতুন কমিটি গঠনে বিএনপির সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়ে স্বল্পকালীন সময়ের জন্য আহ্বায়ক কমিটি গঠনের দাবি জানিয়ে আসছেন তারা। আন্দোলনকারীরা সমঝোতার জন্য তাদের আগের তিন দফা আন্দোলন থেকে সরে এসেছেন। সিনিয়র নেতাদের আশ্বাসে ইতোমধ্যে সংবাদ সম্মেলন করে বিগত দিনের আন্দোলনের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সঙ্গে নিজেদের দুরত্বও কমিয়ে এনেছেন। তবে এখন পর্যন্ত বহিষ্কৃত ১২ জন ছাত্রনেতার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারসহ তাদেরকে দিয়ে কাউন্সিল পর্যন্ত আহ্বায়ক কমিটি গঠনের কোনো দাবি বাস্তবায়ন হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে নিজেদের করণীয় ঠিক করতে বৈঠক করেছেন বিক্ষুব্ধ ছাত্রনেতারা। রোববার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে নেতারা নিজেদের দাবি আদায়ের জন্য একদিকে সব রাস্তা উন্মুক্ত রাখছেন, অন্যদিকে দাবি মানা না হলে কঠোর আন্দোলনেরও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ আন্দোলনে তারা দলের চিহ্নিত সিন্ডিকেটকেই বেশি টার্গেট করবেন বলে ছাত্রদলের কয়েকজন বিক্ষুব্ধ নেতা জানিয়েছেন। বৈঠকে দেড় শতাধিক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।

গত ৩রা জুন ছাত্রদলের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠনের কার্যক্রম শুরু করে বিএনপির হাইকমান্ড। কিন্তু এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এবং বয়সসীমা না রেখে নিয়মিত কমিটি গঠনের দাবিতে গত ১১ই জুন থেকে আন্দোলন শুরু করে বিলুপ্ত কমিটির নেতারা। এ সময় দলীয় কার্যালয়ের মূল ফটকে তালা মারা, দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে লাঞ্ছিত করা, বিক্ষুব্ধ ছাত্রদলের ১২ নেতাকে বহিষ্কার করাসহ নানা অঘটনের সৃষ্টি হয়।

সংগঠনের এরকম অবস্থায় সংকট সমাধানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালকে দায়িত্ব দেন তারেক রহমান। দায়িত্ব পাওয়ার পর তারা আন্দোলনকারীসহ ছাত্রদলের কমিটি গঠনের জন্য গঠিত সার্চ কমিটির নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে সমাধানের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছান। আন্দোলনকারী ছাত্রনেতারা দলের সিদ্ধান্তের অবস্থান ধরে রাখতে ছাত্রদলের কমিটি গঠনের প্রক্রিয়াকে সমর্থন জানান। কাউন্সিলের মাধ্যমে এসএসসি ২০০০ ব্যাচকে সামনে রেখে সংগঠনের কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত মেনে নেন। তবে কাউন্সিল অনুষ্ঠানের আগ পর্যন্ত বিলুপ্ত কমিটির নেতাদের সমন্বয়ে একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠনের দাবি জানান। আন্দোলনরত যে কোনো নেতাকে আহ্বায়ক করে কেন্দ্র থেকে কমিটি ঘোষণা করলে তাতে তাদের সবার সম্মতি থাকবে বলেও দলের হাইকমান্ডকে নিশ্চয়তা দেন।

এদিকে, তাদের দাবির মুখে ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠনের জন্য ঘোষিত কাউন্সিল ২০১৯ এর তফসিল কার্যক্রমও স্থগিত রাখা হয়। ছাত্রদল নেতাদের দলীয় আনুগত্য এবং তিন দফা দাবি থেকে সরে গিয়ে স্বল্পকালীন সময়ের আহ্বায়ক কমিটি গঠনের দাবিকে নেতারা অনেকটা যৌক্তিক বলে তাদেরকে আশ্বস্থ করেন। এ প্রক্রিয়ায় এবং দলের সিনিয়র নেতাদের আশ্বাসে গত বুধবার বিক্ষুব্ধ ও বহিষ্কৃত ছাত্রদল নেতারা দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন। তারা দলীয় সিদ্ধান্তের ব্যাপারে অনুগত থেকে তারেক রহমানের নির্দেশনাবলী পালনে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। একইদিন দলের শীর্ষ নেতাদের পরামর্শে বহিষ্কৃত ছাত্রনেতারা নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর কাছে যান। তার সঙ্গে দূরত্ব কমানোর জন্য নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন নেতারা। এসময় রিজভী আহমেদ তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে আশীর্বাদ করেন। তবে ছাত্রদল নেতাদের সমঝোতা এবং আহ্বায়ক কমিটি গঠনের প্রক্রিয়ায় তৎপর হয়ে ওঠেন দলের চিহ্নিত একটি সিন্ডিকেট।

দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও ছাত্রদলের সঙ্কটের বিষয়টিকে উত্থপান করেন দায়িত্বপ্রাপ্ত মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তবে এখানেও সিন্ডিকেটের ভবিষ্যৎ রোষাণলে পড়ার শঙ্কায় নেতারা সঙ্কট সমাধানে ভূমিকা পালনে অনীহা প্রকাশ করেন। এক নেতা তারেক রহমানের একক ক্ষমতায় সমাধানের প্রস্তাব দেন। তখন স্থায়ী কমিটির এক সদস্য ওই নেতাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, সবকিছুই যদি তারেক রহমানকে করতে হয় তাহলে দলের এতো বড় পদে আপনার থাকার দরকার কি? ওই নেতার পিছুটান দেয়ার ঘটনায় কোন সমাধান ছাড়াই শেষ হয় ছাত্রদলের সংকট ইস্যু। এই অবস্থায় বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারসহ অন্যান্য সিদ্ধান্ত ঝুলে যায়। সঙ্কট সমাধানের সর্বশেষ অবস্থানে সার্চ কমিটির নেতারা গত শনিবার ও রোববার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বৈঠক করেন। গতকাল সোমবারও মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তারা। তবে কোন সিদ্ধান্ত হয়েছে কিনা সে বিষয়ে কিছু জানা যায়নি। তবে একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ১৫ই জুলাই ছাত্রদলের কাউন্সিলের পরিবর্তে ২৭শে জুলাই কাউন্সিল করার ব্যাপারে একমত হয়েছেন নেতারা। এর মধ্যেই সকল সংকটের সমাধান হতে পারে।

দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ছাত্রদলের আন্দোলনকারীদের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এটি বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও আলোচনা হয়েছে। সর্বশেষ এটি এখন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিবেচনায় রয়েছে। তিনি কাউন্সিল উপলক্ষে গঠিত সার্চ কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন। আশা করছি খুব শিগগিরই ভালো একটা রেজাল্ট আসবে। ছাত্রদলের বিলুপ্ত কমিটির সহ সভাপতি ইখতিয়ার রহমান কবির বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রদল করি। ভবিষ্যতেও বিএনপি করব। তাই দলের শীর্ষ নেতাদের অনুগত্য মেনে কাজ করতে চাই। আমরা তাদের কাছে রাজনীতি করার সুযোগ চাই।

সূত্র: মানবজমিন

Comments

comments