ঋণখেলাপিদের সুবিধা বহাল

ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা প্রজ্ঞাপনের কার্যকারিতার ওপর স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে হাইকোর্টের দেওয়া আদেশ শর্ত সাপেক্ষে আরো দুই মাসের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেছেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগ গতকাল সোমবার স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ানোর আদেশ দেন। এর ফলে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ১০ বছরের জন্য ঋণ পুনঃ তফসিলের বিশেষ সুবিধাসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন আপাতত কার্যকর থাকছে।

তবে শর্ত হিসেবে আপিল বিভাগ বলেছেন, কোনো ব্যবসায়ী প্রজ্ঞাপনের ওই সুবিধা (২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ১০ বছরের জন্য ঋণ পুনঃ তফসিল) নিলে দুই মাসের মধ্যে অন্য কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারবে না।

একই সঙ্গে এ বিষয়ে জারি করা রুল নিষ্পত্তির জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চকে। আগামী দুই মাসের মধ্যে ওই রুল নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চের প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানোর কারণেই রুল নিষ্পত্তির দায়িত্ব অন্য আদালতকে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।

আপিল বিভাগ শর্ত জুড়ে দেওয়ায় অ্যাটর্নি জেনারেল আপত্তি জানিয়ে বলেন, ‘এই আদেশ দিলে আমাদের সার্কুলারের কার্যকারিতা থাকবে না।’ ওই সময় আদালত বলেন, ‘আপনি কি মুচলেকা দিতে পারবেন যে এই সুযোগটা নেওয়ার পর বেসিক ব্যাংক, ফার্মার্স ব্যাংকের মতো আর কোনো ব্যাংকে ধস নামবে না? আমাদের উদ্বেগের বিষয়, আর যেন বেসিক ব্যাংক বা ফার্মার্স ব্যাংক তৈরি না হয়।’ কিন্তু অ্যাটর্নি জেনারেল সন্তোষজনক কোনো জবাব দিতে পারেননি।

শুনানিকালে আদালত উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘সামান্য ঋণ নেওয়ার কারণে গ্রামের কৃষকদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে। বড় বড় ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে কি কোনো আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার? বিশেষ শ্রেণিকে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে কি না সেটা খতিয়ে দেখতে হবে। মনে রাখতে হবে, দেশটা জনগণের।’

আদেশের পর অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই আদেশের পর কোনো ব্যবসায়ী প্রজ্ঞাপনের সুবিধা নিলে তিনি আগামী দুই মাস আর কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারবেন না।’ তিনি আরো বলেন, ‘এই আদেশের ফলে ব্যাংকের টাকা তারা (ঋণখেলাপিরা) নিতে পারবেন না। এর মধ্য দিয়ে আমরা আশা করছি, জনগণের রক্ষিত টাকা রক্ষা করা সম্ভব হবে।’

গত ১৬ মে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ১০ বছরের জন্য ঋণ পুনঃ তফসিলের বিশেষ সুবিধাসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জ করে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) করা এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট গত ২১ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনের ওপর স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেন। গত ২৪ জুন এর মেয়াদ আরো দুই মাস বাড়ানো হয়। পরে ওই আদেশের বিরুদ্ধে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২ জুলাই আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালত ৮ জুলাই পর্যন্ত স্থগিতাদেশ দেন। একই সঙ্গে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে ৮ জুলাই শুনানির দিন ধার্য করেন। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল নির্ধারিত দিনে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে অর্থ বিভাগের আবেদনের ওপর শুনানি হয়। অর্থ বিভাগের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। রিট আবেদনকারীর পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ।

এইচআরপিবির করা এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি এক আদেশে ঋণখেলাপির তালিকা দাখিলের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে রুল জারি করেছিলেন। রুলে আর্থিক খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা বন্ধ করতে কমিশন গঠনের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না এবং এই কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছিল।

Comments

comments