ছাত্রলীগের দাপটে চলত রিফাতের খুনিরা

বরগুনায় রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের সবাই ছাত্রলীগ নেতাদের আশীর্বাদপুষ্ট বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে; এর সপক্ষে পাওয়া গেছে কয়েকটি ছবিও। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের একাধিক নেতাও বলছেন এমন অভিযোগের কথা। অভিযোগ অস্বীকার করে জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি বলছেন, আসামিদের কেউ কেউ বিভিন্ন মিছিল-মিটিংয়ে থাকতে পারেন, তবে কারও পদ নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই নেতারা গত বৃহস্পতিবার বলেন, এই হত্যা মামলার আসামিরা জেলা ছাত্রলীগ নেতাদের ক্যাডার হিসেবে শহর দাপিয়ে বেড়াত। তাদের মধ্যে রাব্বী আকন জেলা ছাত্রলীগের কার্যকরী কমিটির সদস্য। সাবেক এমপি ও বর্তমানে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের ভায়রার দুই ছেলে রিশান ফরাজী ও রিফাত ফরাজীর কোনো পদবি না থাকলেও কমিটির নেতাদের সঙ্গে ছিল সুসম্পর্ক। এ ছাড়া মামলার প্রধান আসামি সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড ছিল ছাত্রলীগ সভাপতি জুবায়ের আদনান অনিকের বিশ্বস্ত সহচর। যেকোনো প্রয়োজনে নয়নকে অপারেশনে পাঠাতেন তিনি।

জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, শহরের দোয়েল চত্বরে সিফাত চৌধুরী নামে একজনের ওষুধের দোকান ছিল। চার বছর আগে জেলা ছাত্রলীগের বর্তমান সভাপতির ভাইয়ের বিরুদ্ধে ফেইসবুকে পোস্ট দেওয়ায় নয়ন বন্ডকে পাঠিয়ে তাকে বেদম পেটানো হয়েছিল। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবীরের ছেলে বিরুদ্ধে নয়ন বন্ড, রিশান ও রিফাত ফরাজীদের ‘ক্যাডার বাহিনী’ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে।

এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুবায়ের আদনান অনিক বলেন, ‘রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডে জড়িত কোনো আসামির সঙ্গে জেলা ছাত্রলীগের রাজনৈতিক সম্পর্ক নেই। আসামিদের কেউ কেউ বিভিন্ন মিছিল-মিটিংয়ে থাকতে পারেন, তবে কারও পদ নেই। ’

এ হত্যা মামলার আসামি রাব্বী আকনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘রাব্বী আকন নামে (কমিটিতে) কোনো সদস্য নেই। তবে মো. রাব্বী নামে এক সদস্য রয়েছেন।’ জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আরও বলেন, ‘জেলা ছাত্রলীগ সব সময় মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ইতিপূর্বে মাদকবিরোধী বিভিন্ন মানববন্ধন ও সমাবেশে এই আসামিদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছি। কিন্তু প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। আজ সেই মাদকের কারণেই তারা এমন বর্বর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটানোর সাহস পেয়েছে।’

জেলা ছাত্রলীগের একাধিক নেতা জানান, শীর্ষ নেতাসহ বর্তমান কমিটির অনেকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। কমিটির সহসম্পাদক আসাদুজ্জামান রাজুর নামে এক পাগলীকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা আছে। আমতলী উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মাহবুব র‌্যাবের হাতে ৫ কেজি গাঁজাসহ ধরা পড়েছিলেন, সেই মামলাও বিচারাধীন। এ বিষয়ে অনিক বলেন, ‘আমতলীর দুটি গ্রুপের দ্বন্দ্বের জেরে একপক্ষের লোকজন র‌্যাবের সহায়তায় মাহবুবকে মাদক দিয়ে ফাঁসিয়ে দিয়েছিল। এ ঘটনায় মামলা হলেও আদালতের রায়ে খালাস পেয়েছেন তিনি। এ ছাড়া আমাদের তদন্তেও তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন।’

স্থানীয় ছাত্রলীগের এক নেতা বলেন, জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তানভীর হোসাইন ও সহসভাপতি তুহিনের সঙ্গে এই খুনের মামলার আসামিদের দহরম-মহরম ওপেন-সিক্রেট। ছাত্রলীগের প্রত্যক্ষ যোগসূত্রের কারণেই প্রকাশ্য দিবালোকে বর্বর এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়েছে তারা। এ অভিযোগের বিষয়ে জানতে জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তানভীর হোসাইনের মোবাইলে ফোন করলেও সেটি বন্ধ পাওয়া গেছে।

স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, রিফাত হত্যাকাণ্ডের পর বরগুনা-১ আসনের এমপি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে এলেও ছাত্রলীগ নেতাদের বিষয়টি গোপন থেকে যায়। এরই মধ্যে দু’পক্ষই ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে খুনিদের ঘনিষ্ঠতার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। এতে খুনিদের সঙ্গে বিভিন্ন উপলক্ষে তাদের অন্তরঙ্গ ছবি প্রকাশ হয়ে পড়ে।

বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন বলেন, ‘ফেইসবুকে একটি গ্রুপ খুলে সংগঠিত হয়ে এই খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে আসামিরা। তাদের সঙ্গে যাদেরই সম্পর্ক থাকুক, সেটি পুলিশের তদন্তের ক্ষেত্রে বাধা হতে পারে না। আমরা সব বিষয় খতিয়ে দেখছি।’

সূত্র: দেশ রূপান্তর

Comments

comments