বৃদ্ধ নিবাসে পরিনত হচ্ছে ঢাকা শহরের বাড়িগুলো!

আলী আহমদ মাবরুর

আমার কাছে মনে হয়, ঢাকা শহরের বাড়ি বা ফ্ল্যাটগুলো ধীরে ধীরে যেন ওল্ড হোম বা বৃদ্ধ নিবাসে পরিনত হচ্ছে। কেউ ক্ষেপতে পারেন আমার কথায়। তারপরও চিন্তা করে মিলিয়ে দেখুন। আপনি যে বাসায় থাকেন, যে এপার্টমেন্টে থাকেন, সেখানে কয়টি ফ্ল্যাট। কয়টি ফ্ল্যাটে ছেলে মেয়ে নিয়ে মানুষ থাকছেন, আর কয়টিতে বুড়ো বুড়ি থাকেন? বিশেষ করে একটু মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত স্ট্রাকচারের পরিবারে বিষয়গুলো খুব বেশী চোখে পড়ে।

নামাজের সময় দেখবেন, একেকটা ফ্ল্যাট বা বাড়ি থেকে বৃদ্ধ মানুষ বের হয়। আবার কখনো কখনো ভোরের বেলায় জগিং করার সময় হয়তো বৃদ্ধা মহিলাকেও দেখার সুযোগ পাবেন। এদের অধিকাংশের সাথেই ছেলে মেয়ে থাকেনা। দেশের বাইরে থাকে। বছরে/দু’বছরে একবার আসে। নতুবা বাবা-মাকে বিদেশে নিয়ে একবার ঘুরিয়ে নিয়ে আসে।

বাবা-মার উপর চাপ দেয়, আপনারা বাইরেই চলে আসুন। বাবা-মা রাজি হয়না। তারা মাসখানেক বা বড়জোড় দু’মাস থেকে দেশে চলে আসেন। তারপর আবার স্বামী-স্ত্রীর একাকী জীবন। আমি যখন ব্যক্তিগত কোন প্রয়োজনে কোন হাসপাতালে বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যাই, তখনও এরকম বৃদ্ধ দম্পতি দেখি প্রায়শই। তারা গুটি গুটি পায়ে হাঁটছেন, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বাইরে থাকা সিকিউরিটি গার্ডরা তাদেরকে ধরে রিকশা বা গাড়ি থেকে নামাচ্ছেন। তাদের হাত ধরে হাঁটানোর কেউ নেই, লাঠির উপর ভর করেই তাই চলতে হয়।

এই জীবনের পরিনতি কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে তা মাঝে মাঝে দেখারও সুযোগ হয়। পশ্চিমা দেশগুলোতে থাকা আমার আত্মীয়দের কাছ থেকে গল্প শুনেছি, বুড়ো মানুষ সেখানে মরে পড়ে থাকে। পাশের বাড়ির লোকেরাও হয়তো জানেও না। পরে উৎকট গন্ধ বের হলে কিংবা বাড়ির কুকুরের ডাকাডাকিতে হয়তো সেই লাশের হদিশ পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের অবস্থা এখনো সেই মানে যায়নি। স্বল্পন্নত দেশ তো। কিন্তু এই অবস্থা অলরেডি দেখা যাচ্ছে যে, বৃদ্ধ বাবা-মা মারা গেলে তাদের জানাজার আয়োজন করারও লোক নেই। বাড়ির দারোয়ান আর কেয়ারটেকাররা মিলে যা করার করছে। ছেলে মেয়ে এত দূরে থাকে, আসতেও দু-তিন দিন লাগে। তাও যদি টিকেট ম্যানেজ করতে পারে।

তাই দাফন করতে বলে দেয়া হয়। ছেলেমেয়েরা কেয়ারটেকারকে ফোন দিয়ে বলে, “মাটি দিয়ে দাও। দোয়া তো যে কোন জায়গা থেকেই করা যায়, আমরা এখান থেকে করছি। আগামী শীতে আসার কথা ছিল, তখন আসবো।”

অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসা, বা মৃত্যুর পর জানাজা ও দাফন সব কিছু মিলিয়ে কি যে এক পরিস্থিতি হয়, কতটা অসহায় পরিনতি হয় এটা যারা পাশে থেকে দেখে, তারা জানে। আমি জানিনা, এই সঙ্কটের সমাধান কি? তবে ভাল লাগেনা, কষ্ট হয় ভীষণ এটুকু বলতে পারি।

মূল্যবোধ ও মমতাভিত্তিক পরিবার গঠন ছাড়া শেষ বয়সের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবেনা। নানা ধরনের সঙ্কট, সমস্যা আর বাস্তবতার মাঝেও আমাদের ও আমাদের অগ্রজদের বৃদ্ধ বয়সের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে ভাবা জরুরী হয়ে পড়েছে বলেই মনে করি।

Comments

comments