নিষিদ্ধ খাদ্যপণ্য এখনো বাজারে, তুলে নিতে উদ্যোগ নেই কারও

জাতীয় মান নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউটের (বিএসইটিআই) অভিযান অব্যাহত থাকলেও নিষিদ্ধ খাদ্যপণ্য বাজার থেকে তুলে নেয়ার আগ্রহ নেই প্রাণের।

বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে নিষিদ্ধ পণ্য হওয়ার পরও প্রাণের ‘প্রিমিয়াম ঘি’ পাওয়া গেছে দোকানে দোকানে। এ ব্যাপারে বিএসটিআইর নির্দেশনা আমলে নিচ্ছে না প্রাণ। এমনকি পণ্য বিক্রি না করার জন্য ডিলারদের কোনো চিঠিও দেয়নি প্রাণ।

বিক্রেতারা বলছেন, তারা টাকা দিয়ে পণ্য কিনেছেন। আর টাকা ফেরত দিয়ে কোম্পানি থেকে পণ্য না নিলে তাদের কিছুই করার নেই। তবে এসব বিষয়ে জানতে কোম্পানিটির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা এ নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী নয়।

তবে বিএসটিআই বলছে, ভেজাল পণ্য বিক্রি করে কেউ পার পাবে না। এ ব্যাপারে আইন অনুসারে ব্যবস্থা নেয়া হবে। অন্যদিকে প্রাণের নিষিদ্ধ পণ্য বিক্রি করায় গত শনিবার ৫টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে বিএসটিআই।

জানতে চাইলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের উপপরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, আমরা প্রাণের ‘প্রিমিয়াম ঘি’সহ লাইসেন্স স্থগিত ও বাতিলকৃত পণ্য বাজার থেকে উচ্ছেদের জন্য বাজার মনিটরিং করছি। রাজধানীর সবক’টি বাজারে অভিযান চালাব। এসব পণ্য পেলে ভোক্তা আইনের আওতায় শাস্তি দেয়া হব।

জানা গেছে, ভেজাল রোধে গত রমজানে বাজার থেকে পণ্য নিয়ে পরীক্ষা করে বিএসটিআই। দুই দফায় এতে প্রাণের ৪টি পণ্যেই ভেজাল পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে- প্রাণের গুঁড়া হলুদ, কারি পাউডার, লাচ্ছা সেমাই ও প্রিমিয়াম ঘি।

পরবর্তীকালে এসব পণ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিএসটিআই, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর এবং নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন আদালত। পরে পণ্যগুলোর লাইসেন্স স্থগিত করে বিএসটিআই। একই সঙ্গে উৎপাদন, বিপণন ও বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞার পরও বাজারে প্রাণের ‘প্রিমিয়াম ঘি’ বিক্রি হচ্ছে।

রাজধানীর শান্তিনগর কাঁচাবাজারে নিত্যপণ্য কিনতে আসা মো. জিল্লুর রহমান বলেন, খাদ্যপণ্য নিয়ে আমরা ভোক্তারা অনেক শঙ্কিত। আগে জানতাম ছোট কোম্পানিগুলো খাদ্যে ভেজাল দেয়। এখন দেখছি প্রাণের মতো আস্থা তৈরি করা কোম্পানির পণ্যেও ভেজাল।

তিনি বলেন, ভোক্তার জন্য প্রাণ কোম্পানি শুধু চটকদার বিজ্ঞাপন তৈরি করছে। আর বিক্রি করে ভেজাল পণ্য। এ ব্যাপারে জানতে প্রাণের মার্কেটিং ডিরেক্টর কামরুজ্জামান কামালের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে তাকে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

বাজারে এসে এসিআই কোম্পানির লবণ কিনেছেন আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘কিসের বাজার থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে? তুলে নিলে আমি কীভাবে কিনলাম?’।

বিএসটিআই থেকে বলা হয়েছে, প্রথম দফায় মে মাসের শুরুতে প্রাণের তিনটি পণ্যে ভেজাল পাওয়া যায়। এগুলো হল- গুঁড়া হলুদ, কারি পাউডার ও লাচ্ছা সেমাই। পরে এসব পণ্যের লাইসেন্স স্থগিত করে পণ্যগুলো নিষিদ্ধ করা হয়।

এরপর দ্বিতীয় দফায় সপ্তাহখানেক আগে ভেজাল ধরা পড়ায় প্রাণের ‘প্রিমিয়াম ঘি’সহ কয়েকটি কোম্পানির পণ্যের লাইসেন্স স্থগিত করে বিএসটিআই। একই সঙ্গে এসব পণ্য ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বাজার থেকে তুলে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয় কোম্পানিগুলোকে।

সে হিসাবে শুক্রবারের মধ্যে ওই পণ্য তুলে নেয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিষয়টি আমলে নেয়নি প্রাণ। বাজারে এখনও প্রাণের ‘প্রিমিয়াম ঘি’ বিক্রি হচ্ছে।

খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, কোম্পানির পক্ষ থেকে তাদের কাছে এখনও ওইভাবে কোনো নির্দেশনা আসেনি। এ কারণে তারা বিক্রি করছেন। রাজধানীর কেরানীগঞ্জের সর্ববৃহৎ পাইকারি ও খুচরা বাজার জিনজিরা বাজারে প্রাণের এই পণ্য এখনও দেদারসে বিক্রি করতে দেখা গেছে।

এছাড়া রাজধানীর পুরান ঢাকার নয়াবাজারের একাধিক দোকানে বিক্রি হচ্ছে প্রাণের ঘি। ব্যবসায়ীদের দাবি- কোম্পানিটির কাছ থেকে এই পণ্য বাজারে বিক্রি করা যাবে না এমন কোনো চিঠি তারা পাননি।

জিনজিরা বাজারের খুচরা মুদি ব্যবসায়ী সাক্কুর আলম বলেন, প্রাণ কোম্পানি থেকে এখন পর্যন্ত প্রাণের ‘প্রিমিয়াম ঘি’ বিক্রি করতে বারণ করেনি। যার কারণে আমরা ব্যবসায়ীরা এখন পর্যন্ত দোকানে এই ঘি রেখেছি। কিন্তু কোম্পানির উচিত তাদের জনবল দিয়ে এই পণ্য বাজার থেকে উঠিয়ে নেয়া। কারণ ভেজাল পণ্য আমরাও বিক্রি করতে চাই না। শান্তিনগর কাঁচাবাজারের কয়েকটি দোকানেও এই ঘি বিক্রি হতে দেখা যায়।

রাজধানীর নয়াবাজারের ব্যবসায়ী আতিকুর রহমান জানান, কোম্পানি থেকে এখনও পাইকারি ও খুচরা পর্যায় এই ঘি বিক্রি না করা বা বাজার থেকে উঠিয়ে নেয়ার কোনো চিঠি পাইনি। কোম্পানির কোনো প্রতিনিধিও এই পণ্য বাজার থেকে সরানোর জন্য আসেনি। তাই এখনও দোকান থেকে প্রাণের ‘প্রিমিয়াম ঘি’ সরানো হয়নি। তবে আমরা শঙ্কায় আছি বাজার মনিটরিং টিম যদি এই পণ্য দোকানে পায়, তাহলে জেল-জরিমানা করবে। আমরা ব্যবসায়ীরা কি করব বুঝতে পারছি না।

জানতে চাইলে বিএসটিআইর পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার এসএম ইসহাক আলী বলেন, এই পণ্যগুলো বাজারে এখনও আছে, এটি মোটামুটি সবারই জানা। তবে একটি বিষয় আমি জোর দিয়ে বলব, আমরা বসে নেই। বিএসটিআইর অভিযান চলছে।

তিনি বলেন, দ্বিতীয় দফার পণ্যগুলোর জন্য দেয়া সময়সীমা শেষ হওয়ার পর গত শনিবার থেকে এই অভিযান শুরু হয়। আগামীতেও এটি অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, নিষিদ্ধ কোনো পণ্য পাওয়া গেলে আইন অনুসারে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Comments

comments