নৌ মন্ত্রীর ভাইয়ের সমার্থকেরা কুপিয়ে হত্যা করলো যুবলীগ নেতাকে

মঙ্গলবার রাত ও বুধবার দুপুর পর্যন্ত মাদারীপুর সদর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে নির্বাচন পরবর্তী সহিংস ঘটনায় এক যুবলীগ নেতাকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচনপরবর্তী সহিসংসতায় বিভিন্ন স্থানে কমপক্ষে ২৫ জন আহত হয়েছে। প্রতিপক্ষের হামলায় দোকানপাটসহ ৪০ বাড়িঘর ভাংচুর ও লুটপাটের সংবাদ পাওয়া গেছে।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, মাদারীপুর সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় এক যুবলীগ নেতাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী ও সাবেক নৌ মন্ত্রী শাজাহান খানের ছোট ভাইয়ের সমর্থকদের বিরুদ্ধে।

বুধবার বেলা ১টার দিকে মাদারীপুর পৌর শহরের সবুজবাগ এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত জসিম গৌড়া পলাতক রয়েছে।

নিহতের পরিবার ও স্থানীয়রা জানান, বুধবার বেলা ১টার দিকে মাদারীপুর পৌর শহরের সবুজবাগ এলাকার নদীর পাড় দিয়ে যাচ্ছিলেন নৌকা প্রতীকের সমর্থক ও পৌরসভার ৩নং ওয়াড যুবলীগের সদস্য এরশাদ মুন্সী (২৩)। এ সময় ওৎ পেতে থাকা বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থক ও যুবলীগ কর্মী জসিম গৌড়া তার দলবল নিয়ে এরশাদকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে। এ সময় এরশাদের আত্মচিৎকারে এলাকাবাসী এগিয়ে এসে মুর্মূষু অবস্থায় উদ্ধার করে মাদারীপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এরশাদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে আওয়ামীলীগের নেতা-কর্মীরা হাসপাতালে ছুটে আসেন। এরশাদ সবুজবাগ এলাকার বেলায়েত মুন্সীর ছেলে। সে মঙ্গলার অনুষ্ঠিত মাদারীপুর সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী কাজল কৃষ্ণ দে’র সমর্থক ও এজেন্ট ছিলেন। নির্বাচনে জসিম গৌড়া বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী চেয়ারম্যান ও সাবেক নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের ছোট ভাই এ্যাড. ওবাইদুর রহমান খানের সমর্থক-কর্মী। তবে এর আগেও এরশাদ এবং জসিম গৌড়ার সাথে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় প্রভাব নিয়ে বিরোধ চলে আসছিল। যুবলীগ কর্মী এরশাদের নিহত হওয়ার ঘটার কিছু সময় পরেই জসিম গৌড়ার বাড়িঘরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এ সময় দোকান পাটসহ বেশ কয়েকটি বাড়িঘর ভাংচুর করা হয়।

মাদারীপুর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা প্রায় দুই ঘন্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রনে আনে। ঘটনার পর মাদারীপুর পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও র‌্যাব ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ওই এলাকাসহ আশ-পাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়ন করা হয়েছে।

নিহতের মামা যুবলীগ নেতা কাওছার হোসেন অভিযোগ করে জানান, এরশাদ নৌকার সমর্থক হওয়ায় জসিম গৌড়া তার সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে এরশাককে নির্মম ভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে। জসিমের বিরুদ্ধে ডাকাতি, খুনসহ একাধিক মামলা রয়েছে। নির্বাচনে আমাদের হত্যা করতে পারে, এই বিষয়টি পুলিশ সুপারকে বার বার বলা হলেও তাকে গ্রেফতার করেনি। এটা পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। আমরা জসিমসহ খুনিদের বিচার দাবী করি।

এদিকে, বুধবার বেলা ১০ টার দিকে সদর উপজেলার পেয়ারপুর ইউনিয়নের গাছবাড়িয়া এলাকায় প্রতিপক্ষরা হামলা চালিয়ে কমপক্ষে ২৫ বাড়িঘর ভাংচুর ও ব্যাপক লুটপাট করা হয়েছে। এ সময় মহিলাসহ আহত হয় ১৫ জন। ভাংচুর ও লুটপাটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন-বজলু মাতুব্বর, আরিফ হাওলাদার, আউয়াল হাওলাদার, ইনু হাওলাদার, রায়হান হাওলাদার, সবুজ জমাদার, ওমর আলী, সাইদুল হাওলাদার ও আবুল মাতুব্বর।

অন্যদিকে মঙ্গলবার রাতে সদর উপজেলা চেয়ারম্যান নৌকার সমর্থক শফিক খানের বাসায় হামলা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। মঙ্গলবার উৎসবমূখর পরিবেশ ও শান্তিপূর্ণভাবে সদর উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। রাত ১০টায় নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার পর পরই শুরু হয় সংহিংস ঘটনা। এ সময় তার বাসায় গেটের সামনের সার্টার কুপিয়ে ও বাসায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। রাত ১১টার দিকে সদর উপজেলার দত্তকেন্দুয়া গ্রামের নৌকার সমর্থক চিত্তরঞ্জন মৃধার বাড়িতে হামলা চালিয়ে ১০টি ঘরে ভাংচুর করা হয়। এ সময় বাড়ির মহিলাসহ আহত হয় ১০জন। একই রাতে সদর উপজেলার মস্তফাপুর বাজারে আনিছ চৌকিদার, নূরল হক চৌকিদার ও হারেজ চৌকিদারের দোকান ভাংচুর ও লুটপাট করা হয়। এতে ৭ লক্ষাধিক টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে ক্ষতিগ্রস্থরা দাবী করেন।

সদর উপজেলা চেয়ারম্যান শফিক খানের বড় ভাই ও জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এবিএম বজলুর রহমান মন্টু খান বলেন, আমার ভাইয়ের বাসা লক্ষ্য করে বোমা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেছে। বাড়ির সামনের সাটার কুপিয়ে ভাঙচুর করেছে। আমরা আওয়ামীলীগের দলীয় লোক আমাদের বাসায় হামলা হলে সাধারণ মানুষের কি অবস্থা হবে? আমরা দোষিদের বিচার চাই।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার উত্তম প্রসাদ পাঠক বলেন, নিহতের ঘটনার সাথে কে বা করা জড়িত, তা এখনো বলা যাচ্ছে না। তবে এ এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। কোন কারণে খুন হয়েছে, এখন তা বলা যাচ্ছে না। তবে যেই হত্যার সাথে জড়িত থাকুক না কেন, তদন্ত সাপেক্ষে বের করে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে ।

এদিকে বুধবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে সিভিল সার্জন অফিসের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামীলীগ প্রার্থী কাজল কৃষ্ণ দে। তিনি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, নৌকার সমর্থক হয়ে কাজ করায় দুপুরে যুবলীগ নেতা এরশাদকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এছাড়াও নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর পরই রাতে উপজেলা চেয়ারম্যান পাভেলুর রহমান শফিক খানের বাসায় হামলা, শ্রীনদী আওয়ামীলী নেতা মিন্টুর বাড়ীতে হামলা ও লুটপাট, ছিলারচরের নৌকার সমর্থক আকন বাড়ী, নয়াকান্দি, সাবেক চেয়ারম্যানের বোনের বাড়ী, পেয়ারপুরের গাছ বাড়িয়ায় নৌকার সমর্থক ইদ্রিস ও ইউনুস চৌকিদারের বাড়ীসহ কয়েক বাড়ীতে হামলা, দত্ত কেন্দুয়ায় চিত্ত বৈদ্যের বাড়ীতে হামলা, খোয়াজপুরে নৌকার অফিসে হামলা, কালিকাপুরে সরোয়ার বেপারীর বাড়ীতে হামলা ও আগুন ধরিয়ে দেয়। নির্বাচন পরবর্তী সকল অন্যায়, জুলুম, সহিংসতার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই এবং সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার পূর্বক আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানাই।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পাভেলুর রহমান শফিক খান, জেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সম্পাদক ও পৌর মেয়র মো. খালিদ হোসেন ইয়া, দফতর সম্পাদক গোলাম মাওলা আকন্দ প্রমুখ। পরে নেতাকর্মীদের নিয়ে বিচারের দাবীতে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিন করেন।

Comments

comments