ইতিহাসের পাতায় ১৬ জুন এবং আজকের প্রেক্ষাপট

এম মাফতুন আহম্মেদ

দিন যায়, কথা থাকে। মাস ঘুরে বছর আসে। জাতি কিছু কথা স্মরণে রাখে। কিছু কথা ভুলে থাকে। ১৬ জুন ১৯৭৫ সাল। এ দিনটির কথা সদ্য স্বাধীনচেতা গণতন্ত্রমনস্ক কোনো বিবেকমান মানুষ বিস্মৃতির অতল গহ্বরে কী ভুলে যেতে পারেন? এ দিনটি সংবাদপত্রের ইতিহাসে শুধু কালো দিবস নয়, গণতন্ত্রকামী প্রতিটি দেশপ্রেমিক জনগণের কাছে ঘটনাবহুল স্মৃতি বিজড়িত একটি বিষাদময় দিন। এ দেশের সংবাদকর্মীদের কাছে আজও বিয়োগান্তক একটি স্মৃতিময় অধ্যায়। সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বাংলাদেশিদের মৌলিক অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার হরণের বেদনাবিদ্ধ একটি দিন। তাই এই দিনটিকে ভুলে থাকা আমাদের উচিত নয়। তবে কেউ কেউ এদিনটির তাৎপর্য জাতির কাছে তুলে ধরলেও অন্য একটি পক্ষ আবার বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষাপটে স্রোতের বিপরীতে অবস্থান নেন, নিশ্চুপ থাকেন।

দেশে দেশে, যুগে যুগে সময়ের আবর্তে এক ঝাঁক জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমিক মানুষের আগমন ঘটে। তারা জাতিকে নিয়ে একান্তে ভাবেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কা-ারীর ভূমিকা পালন করেন। তারাই জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। সেই সব দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী শক্তিই ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন থেকে এই দিনটিকে কৃষ্ণ দিবস হিসেবে পালন করে আসছেন। বাঙালি জাতি কখনও চিন্তা করেনি সদ্য স্বাধীন দেশের পার্লামেন্টে ক্ষমতাসীন আ’লীগ সরকার ব্রুট মেজরিটির জোরে এক কলমের খোঁচায় তাদের প্রিয় স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলবে। শত বছরের লালিত স্বপ্ন সংসদীয় গণতন্ত্রকে কলঙ্কিত করবে। নব্য একটি স্বাধীন দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে ভেঙ্গে চূড়মার করে দেবে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে যাওয়া পরিকল্পনায় মেতে উঠবে। রাতারাতি স্বাধীনতাকামী জনতাকে একদলীয় শাসনের খাঁচায় বন্দি করবে। আষ্টে-পৃষ্টে বেঁধে রাখবে। সত্যিই এসব ছিল সহজ-সরল স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের কাছে কল্পনাতীত; এক আরব্য রজনীর গল্পের মতো বিষয়।

কারণ এই স্বাধীনতা একদিনে আসেনি। মুক্তিযুদ্ধ একদিনে শুরু হয়নি। শত আন্দোলন, শত সংগ্রামের ফসল আজকের প্রিয় স্বাধীনতা। স্বাধীনতার জয়গানে উদ্বুদ্ধু হয়ে অনেকেই এই বাংলার জমিনে শহীদ হয়েছেন, অনেকেই দীপান্তরিত হয়েছেন, ফাঁসির কাষ্টে জীবন দিয়েছেন অনেকে। অনেকে আবার লাল সবুজের পতাকায় আচ্ছাদিত হয়ে স্বাধীন বাংলার শ্যামল জমিনে গাজী হয়ে ফিরেছেন। তাদের অনেক আশা ছিল, একরাশ প্রত্যাশা ছিল। স্বাধীন বাংলাদেশে মানবাধিকার নিশ্চিত হবে। রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। গণতন্ত্রের অবাধ অধিকার ভোগ করবে সকল নাগরিক। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে। অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত হবে। স্বাধীনতার সুফল ঘরে ঘরে পৌঁছে যাবে।

দুর্ভাগ্য! দেশ স্বাধীন হলো। যেখানে জাতির ভাগ্য উন্নয়নে নিরন্তর প্রচেষ্টা থাকার কথা, সেখানে গণতন্ত্র পিষ্ট হলো। মানবাধিকার লুণ্ঠিত হলো। সাংবাদিক এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ভূলুণ্ঠিত হলো। আজাদি পাগল গোটা জাতির কাছে স্বাধীনতাটাই যেন এক ফাঁকি হয়ে ধরা দিল। চারিদিকে ঘোর অমানিশা। গোটা জাতি যেন মুখ থুবড়ে পড়ল। অঙ্কুরে বিনষ্ট হলো সকল আশা, সকল প্রত্যাশা। আশা নিরাশায় পরিণত হলো। একটি স্বাধীনতা প্রিয় জাতির বাকশক্তি প্রায় রুদ্ধ হয়ে গেল।

একরাশ হতাশা নিয়ে গোটা জাতি আবার সামনে এগিয়ে যাবার দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হলো। কারণ বাঙালিরা একটি প্রতিবাদি জাতি। অন্যায় অপশাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার একটি সাহসী জাতি। তারা জীবন দিয়েছে, রক্ত দিয়েছে। কিন্তু কারো কাছে মাথা নত করেনি। স্বাতন্ত্র্যতা বিকিয়ে দেয়নি। বিকিয়ে দিতে শিখেনি। এই বাঙালিরা একটি ভূ-খ- এবং শত বছরের হৃত স্বাধীনতা ফিরে পাবার আশায় ১৭৫৭ সাল থেকে ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত মরণপন আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে। অন্যায় অপশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ-পাকিস্তানি শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে রাজপথ রক্তে রঞ্জিত করেছে। তারপর স্বাধীনতা পেয়েও তা অধরা থেকে গেল। একদলীয় বাকশাল কায়েমের মাধ্যমে তাদের চেতনাকেই অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হলো।

ইতিহাস সময়ের আবর্তে জাতিকে স্মরণ করিয়ে দেয় কিছু কিছু ঘটনা। স্মরণ করিয়ে দেয়, কেন সেদিন আচমকা সংবাদপত্র দলনে ক্ষমতাসীন সরকার উদ্যোগ নিতে পারল? আসলে তারা কী করতে চেয়েছিল? সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে তারা কোথায় নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন? নেপথ্যে তাদের কী উদ্দেশ্য লুকায়িত ছিল? এক নেতার এক দেশÑএই চেতনার আলোকেই তারা এসব করেছিলেন? তাই তারা পথের কাঁটা দূর করতেই সংবাদপত্র দলনে ওই বাঁকা পথ বেছে নিয়েছিলেন?

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র তিন বছর পার না হতেই ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সরকার ব্রুট মেজরিটির জোরে সংসদে উত্থাপন করেছিলেন সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী। কণ্ঠভোটে প্রস্তাবটি পাশ হয়ে যায় মাত্র কয়েক মিনিটেই। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থি ওই সংশোধনীর ফলে বহু দলীয় গণতন্ত্রের পরিবর্তে কায়েম হয় এক দলীয় শাসন ব্যবস্থা ‘বাকশাল’। এরই ধারাবাহিকতায় বাকশাল সরকার প্রণয়ন করে ‘দ্য নিউজ পেপার এমেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট’। সরকারের ইচ্ছেমতো পত্রিকা নিন্ত্রণের লক্ষ্যেই সেদিন এই আইন প্রবর্তন করা হয়েছিল। এই কালো আইনটি ছিল গণতান্ত্রিক রীতিনীতি এবং একটি জাতির শিকড়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং তার আদর্শের বিপরীত।

বাকশাল সরকারের ওই সিদ্ধান্তের ফলে ৮ হাজার সাংবাদিক ও সংবাদপত্রসেবী পেশাচ্যুত হন। ফলে বেকারত্বের অবর্ণনীয় জ্বালা-যন্ত্রণা নিয়ে অনেক সাংবাদিককে দিন কাটাতে হয়েছিল। দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছিল। শুধুমাত্র দৈনিক ইত্তেফাক, বাংলাদেশ অবজারভার, দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ টাইমস পত্রিকা প্রকাশ হতে লাগল সরকারি ব্যবস্থাপনায়। অন্য সব পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করে দেওয়া হলো।

১৬ জুন ১৯৭৫ সালে এক অধ্যাদেশ বলে এদেশের সকল সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আর সংবাদপত্র বন্ধ মানে তো দেশের গণতন্ত্রের কবর রচনার তুল্য। তাই এ দিনটি শুধু সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে, বিকশিত করতেও আজকের দিনটি গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর এ দিনটি ঘুরে-ফিরে জাতির মাঝে আসে। কেউ কেউ স্মরণে রাখেন, কেউ কেউ ভুলে থাকার ভান করেন। কেউ কেউ দিনটি’র যথার্থতা তুলে ধরেন। আবার কেউ কেউ মুখ বোঝে থাকেন।

সেদিনের প্রেক্ষাপটের সাথে আজকের বাস্তবতা কতদূর, সেটাও বিবেচ্য। ’৭৫-এর ১৬ জুন কয়েকটি সংবাদপত্র বাদে দেশের বাকি সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আর আজকে! লীগ সরকারের অনেক দায়িত্বশীলরা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা উচ্চকণ্ঠে বলছেন। তারপরেও প্রশ্ন থেকে যায়, সংবাদপত্রের কতটুকু স্বাধীনতা রয়েছে। গণমাধ্যম কর্মীরা কতটুকু স্বাধীনতা ভোগ করছেন। নির্ভয়ে তারা কী জনতার কথা সংবাদপত্রের পাতায় তুলে ধরতে পারছেন?

সে দিনের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আজও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন। এখন তারা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা বলছেন। যদিও অনেকে মনে করেন না যে, হাল জামানায় সংবাদপত্রের পূর্ণ স্বাধীনতা আছে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা যদি থেকেই থাকে তাহলে ক্ষমতাসীন সরকারের কাছে বিনীতভাবে আরজ রাখতে চাই- আমার দেশ, দিগন্ত টেলিভিশন, ইসলামিক টেলিভিশন, চ্যানেল ওয়ান আজ বন্ধ কেন? মাহমুদুর রহমান, শওকত মাহমুদ, শফিক রেহমানের মতো সাংবাদিকরা কেন আজ জেলের প্রকোষ্টে থাকবেন? তারা ভিন্ন মতাবলম্বী, এটাই কী তাদের অপরাধ?

ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেন, আবার কেউ নেন না। যারা শিক্ষা নেন তারাই ইতিহাস হন, ইতিহাস গড়েন। এখন সময় এসেছে আমাদের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার, লাল সবুজের পতাকায় আচ্ছাদিত বাংলার এই জমিনে ১৬ জুনের নতুন কোনো পদধ্বনি আর যেন শুনতে না হয়। এ দিবসকে সামনে রেখে সকল সাংবাদিকদের অভিন্ন কণ্ঠে আওয়াজ তুলতে হবে; উচ্চকণ্ঠে বলতে হবে খুলে দিন সকল বন্ধ গণমাধ্যমকে। জনগণের মত প্রকাশের প্রশ্নে আপসহীন ভূমিকা পালন করতে হবে সকলকে। সকল সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সর্বোপরি সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতনের যে খড়গ, তার বিরুদ্ধে অভিন্ন সুরে রাজপথ প্রকম্পিত করে তুলতে হবে। আজকের এই দিবসে এটাই প্রত্যাশা। সময়ের প্রেক্ষাপটে এটাই একমাত্র দাবি।

 লেখক : আইনজীবী ও খুলনা থেকে প্রকাশিত আজাদ বার্তা পত্রিকার সম্পাদক

Comments

comments