জাতীয় মসজিদের পিলার কেলেঙ্কারি, পদত্যাগ করছে সামীম আফজাল

অবশেষে পদত্যাগ করছেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের (ইফা) মহাপরিচালক (ডিজি) সামীম মোহাম্মদ আফজাল। আজই তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেবেন বলে জানা গেছে।

গত সোমবার ধর্ম মন্ত্রণালয় তাকে শোকজ করার পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই তিনি পদত্যাগ করছেন বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে।

রাতের আধারে জাতীয় মসজিদের পিলার অপসারণ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতিসহ নানা অপকর্মের মূল হোতা এই বিতর্কিত ডিজি ।

এর আগে ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে ইফা ডিজিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় ধর্ম মন্ত্রণালয়। তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিলের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে কেন অবহিত করা হবে না তা সাত কার্যদিবসের মধ্যে ধর্ম মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে জানাতে বলা হয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মসজিদ মার্কেট বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ মহিউদ্দিন মজুমদারকে ইফা ডিজি সম্প্রতি সাময়িকভাবে বরখাস্তের আদেশকে কেন্দ্র করে এই শোকজের ঘটনা ঘটে। একই চিঠিতে ওই কর্মকর্তার সাময়িক বরখাস্তকে বেআইনি, ক্ষমতাবহির্ভূত, অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, স্বেচ্ছাচারী ও অকার্যকর আখ্যায়িত করে ওই সাময়িক বরখাস্তের আদেশটি বাতিল করা হয়।

রাতের আঁধারে বায়তুল মোকাররম মসজিদের একটি পিলার এক আওয়ামী লীগ নেতা কর্তৃক অপসারণের ঘটনা প্রকাশ এবং এ ব্যাপারে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করার কারণে ক্ষুব্ধ ইফা ডিজি মহিউদ্দিন মজুমদারকে পুরনো কিছু অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই তড়িঘড়ি করে গত ৩০ মে সাময়িক বরখাস্ত করেন। তার বরখাস্তের বিষয়টি সঠিক হয়নি মর্মে ধর্ম মন্ত্রণালয়কে দেয়া ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিলের বোর্ড অব গভর্নর্সের একটি চিঠিতে বলেন, মহিউদ্দিন মজুমদারও বরখাস্ত আদেশ বাতিল চেয়ে আবেদন করেন। তারই ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নেয়।

এদিকে গতকাল সরকারি ছুটির দিনে আগারগাঁও ইসলামিক ইসলামিক ফাউন্ডেশন ভবনে গিয়ে অফিসে বসে তিনি নিজের পদত্যাগপত্র লিখেন বলে জানা যায়। এসময় তিনি অফিস থেকে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও নথিপত্র সরিয়ে ফেলছেন- এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে সংস্থার শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী সেখানে ছুটে যান। তারা ডিজির অফিস ঘেরাও করে রাখেন। পরে ইফার বোর্ড অব গভর্নর্সের সদস্য মিজবাহুর রহমান চৌধুরী, ইফার সচিব কাজী নুরুল ইসলাম ও আইন উপদেষ্টা এ আর মাউদ সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। তারা ডিজির সাথে কথা বলেন এবং তার পদত্যাগের বিষয়েও আলাপ করেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বাসায় নেয়ার জন্য আনুমানিক ৪০টি ফাইল ডিজির গাড়িতে ওঠানো হয়েছিল। কিন্তু বাধার মুখে সেগুলো আবার গাড়ি থেকে অফিসের লকারে রাখতে তিনি বাধ্য হন। পরে দ্রুত অফিস ত্যাগ করলে বিক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তার কক্ষে অতিরিক্ত তালা লাগিয়ে দেন। রাত পর্যন্ত তারা অফিস পাহারা দেন। ডিজির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত দুই পরিচালকের কক্ষেও তালা দেয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে আলহাজ মেজবাহুর রহমান চৌধুরী বলেন, ফাইল সরানোসহ বিভিন্ন উত্তেজনাকর খবর কানে আসার পর আমি সেখানে যাই। আমি, সচিব ও আইন উপদেষ্টা সেখানে ছিলাম। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। ডিজির পদত্যাগের ব্যাপারে তিনি বলেন, আমি শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাকে পদত্যাগের পরামর্শ দিয়েছি। তিনি এতে না করেননি। বলেছেন, কালই (রোববার) সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেবেন। তিনি যে পদত্যাগ করছেন আমরা বলতে পারি কি না প্রশ্ন করা হলে আলহাজ মেছবাহুর রহমান বলেন, উনি রোববারই পদত্যাগের সিদ্ধান্তটি নিয়ম অনুযায়ী জানিয়ে দেবেন বলে আমাকে জানিয়েছেন। ফাইল সরিয়ে নেয়ার চেষ্টার ব্যাপারে বোর্ড অব গভর্নর্সের এই সদস্য বলেন, একজন কর্মকর্তার গাড়িতে কিছু ফাইল তোলা হয়েছিল। পরে সেগুলো ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

জানার জন্য সামীম মোহাম্মদ আফজালের মোবাইল ফোনে বার বার ফোন করেও কথা বলা যায়নি। তিনি বার বার লাইন কেটে দেন।

জানা গেছে, ডিজি বা তার ঘনিষ্ঠ কেউ যাতে অফিস থেকে কোনো নথি সরাতে না পারে তার জন্য রাত ৮টা পর্যন্ত ইফা ভবনে অবস্থান করে বিক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। পরে পুলিশ ভবনের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিলে তারা সরে আসেন।

বিগত ওয়ান-ইলেভেনের পর আওয়ামী লীগ সররকারের শুরু থেকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজি হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়ে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন সরকারের বিচারিক এই কর্মকর্তা। তিনি সাবেক জেলা জজ ছিলেন। দুই বছর আগে তিনি মূল চাকরিস্থলে অবসরে গেলেও দুই বছরের নতুন চুক্তিতে ইফায় বহাল থাকেন।

ধর্ম মন্ত্রণালয় ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন সূত্র জানিয়েছে, সামীম মোহাম্মদ আফজাল প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সাথে নিজের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে এমন কথা ইসলামিক

ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তাদের কাছে প্রায়ই বলে সবাইকে তটস্থ রাখতেন। তার বিরুদ্ধে এর আগে বিভিন্ন নিয়োগে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে পত্রপত্রিকায় খবরও প্রকাশিত হয়। দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনেও।

তবে সর্বশেষ বায়তুল মোকাররম মসজিদের পিলার অপসারণের ঘটনাকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা এবং পিলার অপসারণের বিষয়ে আইনিব্যবস্থা নেয়ায় মসজিদ মার্কেট বিভাগের পরিচালককে অন্য কিছু অভিযোগে বরখাস্তের ঘটনায় ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ক্ষুব্ধ হন। পিলার অপসারণের বিষয়টি গোপন রেখে জাতীয় মসজিদকে দীর্ঘ আট মাস ধরে বিপর্যয়ের মধ্যে রাখা হয় বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক অভিযুক্ত ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা না নেয়ায় মন্ত্রী নিজেই পুলিশ কমিশনারকে ফোন করে মামলা দায়ের করান বলে একটি সূত্র জানায়।

এতে ক্ষুব্ধ হয়েই ডিজি মসজিদ ও মার্কেট বিভাগের মহাপরিচালককে পুরনো কিছু তুচ্ছ অভিযোগের উল্লেখ করে চাকরি হতে সাময়িক বরখাস্ত করেন। এই পরিচালককে দৈনিক মুক্তখবর নামে একটি পত্রিকায় প্রকাশিত খবর, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীর ব্যানারে আনীত অভিযোগের ভিত্তিতে আকস্মিক বরখাস্তের কথা বলা হয়।

বিষয়টি নিয়ে বায়তুল মোকাররম, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। মহাপরিচালকের একজন পরিচালককে সাময়িক বরখাস্তের ক্ষমতা আছে কি না তা নিয়ে বোর্ড গভর্নর্সের সদস্যরা প্রশ্ন তোলেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বোর্ড অব গভর্নর্সের কর্মকর্তা-কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল কমিটির সভাপতিও সাবেক সচিব সিরাজ উদ্দিন আহমেদ এ সাময়িক বহিষ্কারাদেশ বেআইনি মর্মে ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর কাছে গত ৩ জুন একটি অফিস আদেশ পাঠান।

সেই আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্ম মন্ত্রণালয় গতকাল সোমবার বায়তুল মোকাররম মসজিদ ও মার্কেটের পরিচালক মহিউদ্দিন মজুমদারের সাময়িক বহিষ্কারাদেশ স্থগিত ঘোষণা করে। সে সাথে ইফা মহাপরিচালক সামীম মোহাম্মদ আফজালকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন।

এর আগে গত মে মাসের শুরুতে সামীম মোহাম্মদ আফজালকে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালকের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। আর কেন এই সিদ্ধান্ত তার কারণও ব্যাখ্যা করা হয়নি স্পষ্ট করে। বিষয়টি অনেকটাই গোপনে হয়েছে। ২০১৬ সালে তিনি এই নিয়োগ পেয়েছিলেন।

Comments

comments