সুপারের দুর্নীতির কবলে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল, চাকরি বাঁচাতে নিচ্ছেন গণস্বাক্ষর

ডা. মো: আব্দুস সালাম। নিজেকে যিনি বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ সভাপতি হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন। অনেক সময় নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা বলেও পরিচিত করেন মানুষের সামনে। ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল মতিঝিলের অস্থায়ী সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে সীমাহীন অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির মাধ্যমে অনেকটাই বদলে ফেলেছেন স্বাস্থ্যসেবায় সুনাম অর্জনকারী ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের চেহারা।

প্রতিটি বিষয়ে অনেকটা ঘোষণা দিয়েই চাঁদাবাজি ও উৎকোচ গ্রহণ করছেন তিনি। বিভিন্ন কোম্পানীর কাছ থেকে মোটা অংকের কমিশন গ্রহণ ও বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের নামে অনেকটা প্রকাশ্যেই চাঁদাবাজি করে চলেছেন তিনি। কনসালটেন্ট, কর্মকর্তাদের সাথে যাচ্ছেতাই ব্যবহার আর স্বেচ্ছাচারিতার ফলে দীর্ঘদিনের সুনাম থাকলেও ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল মতিঝিল সে সুনাম আর ধরে রাখতে পারছে না।

১ মার্চ ২০১৯ থেকে তিন মাসের জন্য অস্থায়ী নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও দুই মাস অতিক্রান্ত না হতেই সীমাহীন অনিয়ম আর দুর্নীতির অভিযোগ জমেছে তার বিরুদ্ধে। দীর্ঘ সময় ধরে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে তুলনামূলক কম খরচে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসলেও সে সুনাম চাপা পড়েছে সুপারিনটেনডেন্ট আব্দুস সালামের লাগামহীন কমিশন বাণিজ্যে।

ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল মতিঝিলের দীর্ঘ পথচলার ইতিহাসে এমন অনৈতিক লেনদেনের ইতিহাস না থাকলেও ডা. আব্দুস সালাম সে কদর্য ইতিহাস রচনা করেছেন। যে সমস্ত কোম্পানীর ঔষধ চিকিৎসকরা সাধারণত লেখেন না, মোটা অংকের টাকা খেয়ে ফার্মেসী ইনচার্জের অনুমতি ছাড়াই সেসব কোম্পানীর ঔষধ চালানোর নির্দেশ দেয়া হয় অস্থায়ী সুপার আব্দুস সালামের পক্ষ থেকে। তার নির্দেশেই ক্রয়কৃত RANGS, ORION, INCEPTA সহ বেশ কিছু নতুন কোম্পানীর ঔষধ অবিক্রিত অবস্থায় স্টকে পড়ে আছে। এতে লোকসানের মুখ দেখতে শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

এছাড়াও বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন নামে ভূঁইফোড় সংগঠনের নাম ব্যবহার করে নিজেই সংগঠনের নামে ফরম ছেপে ব্যাপক চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে এই ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল মতিঝিলের সুপারিনটেনডেন্টের বিরুদ্ধে । তিনি উক্ত সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ সভাপতি বলে দাবি করে থাকেন। এই পরিচয়ে ভিজিটিং কার্ডও বিতরণ করেন আব্দুস সালাম। হাসপাতালের চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কাছ থেকে উক্ত সংগঠনের সদস্য ফরম পূরণ করিয়ে অনেকটা প্রকাশ্যেই লাখ লাখ টাকা চাঁদাবাজি করছেন তিনি। সাধারণ স্বল্প আয়ের কর্মচারীরাও তার এই চাঁদাবাজি থেকে রেহাই পাচ্ছে না।

হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ পদে স্বজনপ্রীতি জনিত অবৈধ নিয়োগের অভিযোগও রয়েছে এই সুপারিনটেনডেন্ট আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে। ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনের (আইবিএফ) বিধি লঙ্ঘন করে হাসপাতালের মেইনটেইনেন্স বিভাগে নিজ পুত্র সুলতান মো: শাকিলকে নিয়োগ দিয়েছেন তিনি। সুপারের পুত্র হওয়ার কারণে প্রভাব খাটিয়ে হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে খারাপ আচরণের বহু প্রমাণ রয়েছে শাকিলের বিরুদ্ধে।

এছাড়া নারী কেলেঙ্কারিরও অভিযোগ মিলেছে এই করিৎকর্মা ব্যক্তির বিরুদ্ধে। আর এসব অনিয়মের খবর প্রকাশ হয়ে পড়ায় এবার চাকরি রক্ষায় জোরপূর্বক গণস্বাক্ষর সংগ্রহের অভিযানে নেমেছেন আব্দুস সালাম।

সম্প্রতি অনিয়মের অভিযোগ মাথায় নিয়ে ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান পদ থেকে সামীম আফজাল বিদায় নিলেও তার পছন্দের নিযুক্ত ডা. আব্দুস সালামকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রাখতে তার তৎপরতা রয়েছে বলে জানা যায়।

আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে কর্মকর্তারা জানান, নিজ পুত্র সুলতান মাহমুদ শাকিলকে ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রকার হুমকি ধামকি দিয়ে হাসপাতালের কর্মকর্তা কর্মচারীদের কাছ থেকে একাধিক স্থানে স্বাক্ষর নিচ্ছেন তিনি। যেখানে দুর্নীতির সুস্পষ্ট অভিযোগে অভিযুক্ত ডা. আব্দুস সালামকে নির্দোষ ও ষড়যন্ত্রের শিকার বলে উল্লেখ করা হচ্ছে।

এই গণস্বাক্ষর অভিযানে আব্দুস সালামের স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসাবে তার ছেলে সুলতান মাহমুদ শাকিলের নেতৃত্বে কাজ করছে ব্রাদার তোজাম্মেল, ব্রাদার খাদেম, নার্সিং সুপারভাইজার জাহানারা আক্তার ও রিসিপশনিস্ট আক্তার হোসেন।

এদের মধ্যে নিজ পুত্র সুলতান মাহমুদ শাকিলকে মেইনটেইনেন্স বিভাগে ও রিসিপশনিস্ট আক্তার হোসেনকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে নিয়োগ দিয়েছেন আব্দুস সালাম। আর নার্সিং সুপারভাইজার জাহনারা আক্তারের বিরুদ্ধে হাসপাতালের পরিবেশ বিনষ্ট করে সুপার আব্দুস সালামের মনোরঞ্জনের উদ্দেশ্যে বহিরাগত ও অভ্যন্তরীন কিছু নারীদের নিয়ে তার নির্জন কক্ষে আড্ডা ফূর্তির আয়োজনের অভিযোগ রয়েছে।

গণমাধ্যমে আব্দুস সালামের দুর্নীতি ও অনিয়মের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর টনক নড়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। তারা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে এমন আশঙ্কা থেকে ভালো সাজতে হাসপাতালের স্টাফদের কাছ থেকে জোরপূর্বক নিজের পক্ষে গণস্বাক্ষর নিয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টায় মরিয়া হয়ে উঠেছেন আব্দুস সালাম ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা। যারা তার পক্ষে এসব স্বাক্ষর করিয়ে নিচ্ছেন তাদেরকেই মূলত আব্দুস সালাম বিভিন্ন সময় তার দুর্নীতি ও অনিয়মের ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করে আসছে।

এই সিন্ডিকেট বাহিনী হাসপাতালের সুনাম অর্জনকারী কর্মকর্তাদের হয়রানির পাশাপাশি প্রাণনাশের হুমকি ধামকিও দিয়ে আসছে।

হাসপাতালের দুর্নীতি অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা দূর করতে দুর্নীতিবাজ আব্দুস সালামের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন সাধারণ কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। সেই সাথে স্বাস্থ্যসেবার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন বেশ কয়েকজন কনসালটেন্ট।

Comments

comments