ঈদযাত্রায় ভোগান্তির নাম ফিটনেসবিহীন বাস

মুসলমানদের সব চেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতরের কয়েকদিন বাকি। ঈদে নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন রাজধানীতে বসবাসকারী বিভিন্ন জেলার মানুষ। ঈদ সামনে রেখে বসে নেই পরিবহন সংশ্লিষ্টরাও। ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে ফিটনেসবিহীন লক্কড়ঝক্কড় বাস মেরামতের কাজ।

বরাবরই ঈদযাত্রায় ভোগান্তির নাম ফিটনেসবিহীন বাস। যাত্রাপথে ব্যস্ত সড়কে হঠাৎ যান্ত্রিক ত্রুটি। বিকল যানবাহনের যাত্রীরা পড়েন ভোগান্তিতে। বিকল পরিবহনের পেছনের পরিবহনগুলোও থমকে যায়। সড়কে দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর কারণও ফিটনেসবিহীন বাস। ফিটনেসবিহীন পরিবহন চলাচল বন্ধের হুঁশিয়ারির মধ্যে এবারও ঈদ সামনে রেখে সড়ক-মহাসড়কে ফিটনেসবিহীন, লক্কড়ঝক্কড় বাস নামানোর পুরোদমে তোড়জোড় চলছে।

রাজধানীর নিকটস্থ জেলা শহরে এবং রাজধানীর বিভিন্ন রুটে গেটলক হিসেবে চলাচলকারী গণপরিবহনগুলো প্রতিবছরই ঈদযাত্রায় দেশের বিভিন্ন দূরবর্তী জেলায় চলাচল করে। এবারও প্রস্তুতি চলছে এসব পরিবহনের।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্রেক, চাকা, স্টিয়ারিং, গিয়ারসহ গুরুত্বপূর্ণ পার্টস দুর্বল থাকায় অনেক সময়ই চালকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি। ফলে ঘটে দুর্ঘটনা।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যানুযায়ী, গত ঈদুল ফিতরের আগেপরে দেশের বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে ২৭৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৩৯ জন নিহত ও ১ হাজার ২৬৫ জন আহত হন। সড়ক, রেল ও নৌপথে সম্মিলিতভাবে ৩৩৫টি দুর্ঘটনায় ৪০৫ জন নিহত ও ১ হাজার ২৭৪ জন আহত হন। এর অধিকাংশ দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর কারণ ফিটনেসবিহীন বাস এবং অবহেলা ও বেপরোয়া গতিতে বাস চালানো।

এদিকে আনফিট বা ফিটনসেবিহীন পরিবহনের পরিসংখ্যান নেই বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কাছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি বলছে, এবারের ঈদযাত্রায় সড়কে অন্যান্য বছরের মতো ভোগান্তি হবে না। রুট পারমিট ছাড়া এবং ফিটনেস সার্টিফিকেট ছাড়া কোনো পরিবহন চলতে দেয়া হবে না।

গত বৃহস্পতিবার (২৩ মে) রাজধানীর গাবতলী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালের পেছনে খালের পাড়ে গিয়ে দেখা যায়, রঙচটা, লক্কড়ঝক্কড় ও ফিটনেসবিহীন বাস সারি সারি সাজিয়ে রাখা হয়েছে। ওয়ার্কশপ নেই কিন্তু সেখানে কাজ চলছে ঠিকই। কেউ বাসের নিচে শুয়ে মেরামতের কাজ করছেন, কেউ বা ঘষামাজা আর রঙ মাখাতে ব্যস্ত।

এ তোড়জোড় শুধু গাবতলী বেড়িবাঁধ এলাকাতেই নয় রাজধানীর আমিনবাজার, গাবতলী, মিরপুর, কোর্টবাড়ি, ডেমরা, কাজলা, শনির আখড়া, উত্তরার কামারপাড়ায় দেখা গেছে।

গাবতলী বেড়িবাঁধের সড়ক দিয়ে সামনে এগুলেই অনেকগুলো ওয়ার্কশপ। কোনোটার নাম আছে কোনোটার নেই। সবখানে বাসের সংখ্যাই বেশি। রবরব, ইতিহাস, শান্তি পরিবহন, এসপি গোল্ডেন পরিবহন, ইসলাম পরিবহন, ওয়েলকাম, আলম, শ্যামলী হানিফ, ডিপজল, সেন্টমার্টিন, সৌদিয়া, ইউনিক পরিবহনসহ অসংখ্য পরিবহনের বাস মেরামত ও রঙ লাগানোর কাজ করতে দেখা যায়। সেখানে অধিকাংশ গাড়িতেই দেখা গেছে রঙের কাজকেই বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

‘আলম মিয়া হাত চালাও। দ্রুত বাস ছাড়তে অইবো। আরও কাম আছে। ঈদ না সামনে! কাম শেষ করতে পারলে পেমেন্ট নগদ পাবা।’ এভাবেই নিজ কর্মচারীকে তাগাদা দিচ্ছেলেন গাবতলী বেড়িবাঁধ এলাকার ভাই ভাই ওয়ার্কশপের মালিক রইসুল। মালিকের কথায় গতি বেড়ে যায়। হাতুড়ি পিটুনিতে সমান করা হচ্ছে ভসকে যাওয়া বাসে বডি।

আলমের মতো অনেকের হাতই ব্যস্ত। ঘষায়-মাজায় আর রঙতুলিতে একেকটা বাস হয়ে উঠছে চকচকে। ফিটনেসবিহীন বাসগুলোকে ঈদ যাত্রায় তৈরি করা হচ্ছে ‘কাগুজে বাঘ’ রূপে।

মালিক রইসুল বলেন, ‘প্রতিবছরই দুই ঈদে কাম বাইড়া যায়। নতুন মিস্ত্রি আনতে হয়। মেরামতের বেশির ভাগই ঈদের জন্য চাপ দিতাছে। ঈদে রাস্তায় নামাব।’

শরিফুল ইসলাম নামে একজন শ্রমিক বলেন, ‘একেকটা গাড়ির পেছনে শুধু ঘষামাজাতে খরচ ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। আবার যান্ত্রিক মেরামতের জন্য আলাদা খরচা। ঢাকায় চলা সিটিং বাসগুলো বেশি আসছে এখানে।’

গাবতলী পেরিয়ে আমিনবাজার ঘেঁষে দুই ধারে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ওয়ার্কশপ। সেখানে চলছে পুরোদমে পুরনো ইঞ্জিন লাগানো, ডেন্টিং পেন্টিং, সিট ও সিটকভার তৈরির কাজ। আমিনবাজারের ওয়ার্কশপে রঙয়ের কাজের চেয়ে যান্ত্রিক মেরামতের কাজই বেশি। ফাটা, ভাঙা আর লক্কড়ঝক্কড় বাস জোড়াতালি দিয়ে প্রস্তুতির ভালো মহড়া চলছে সেখানে। গাবতলীর কোর্টবাড়ি, দিয়াবাড়ি সড়কেও চলছে ওয়ার্কশপে মেরামতের কাজ।

ঈদ সামনে রেখে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, মাতুয়াইল, কাজলা এলাকাতেও ছোটবড় ওয়ার্কশপে চলছে মেরামতের কাজ। সালাম অটোস, মিতালী ইঞ্জিনিয়ারিং মোটর ওয়ার্কস, বিসমিল্লাহ অটোমোবাইলস, মাতুয়াইল ইঞ্জিনিয়ারিং মোটর ওয়ার্কস, কবির ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ, বেঙ্গল বডি বিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপে ঈদযাত্রার জন্য আনফিট বাসে জৌলুস ফেরাতে মেরামতের কাজে ব্যস্ত শতাধিক পরিবহন শ্রমিক ও মিস্ত্রী।

ঈদযাত্রায় ফিটনেসবিহীন গণপরিবহন সম্পর্কে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঈদযাত্রা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে সড়ক-মহাসড়ক থেকে ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধ করতে হবে। বিগত ঈদযাত্রায় দেখেছি সড়কে যানজট ও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ ফিটনেসবিহীন পরিবহন। এবার সেই তোড়জোড় চলছে। আমাদের পেশ করা ২০ দফা দাবির প্রথমটাই হচ্ছে ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধ করা। দুঃখজনক যে, এ ব্যাপারে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের তৎপরতা নেই।’

তবে পরিবহন বাস মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে এ ধরনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে যে, কেউ আনফিট বাস রাস্তায় নামাতে পারবেন না। তবে ফিটনেস শুধু বাসের কালারে না যান্ত্রিক ফিটনেসটাই মেইন। রঙ নষ্ট হওয়া বাসে কেউ রঙ করতে চাইলে তো বাধা দেয়া যায় না।’

এ ব্যাপারে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা বলেন, ‘আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে এবং সড়কে ট্রাফিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী। মহাসড়কে নসিমন, করিমন, ভটভটি, ইজিবাইকসহ ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধ করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া যানবাহন না থামানোর জন্যও নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।’

বিআরটিএ পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার লোকমান হোসেন মোল্লা জাগো নিউজকে বলেন, ‘এবার আনফিট গাড়ি কোনোভাবেই চলতে দেয়া হবে না। আমরা হাইওয়ে পুলিশকে ‘‘হ্যান্ড হেল্ড’’ নামে ডিভাইস সরবরাহ করেছি। মহাসড়কে সন্দেহভাজন বাসের সামনের গ্লাসে অথবা নম্বর প্লেটে লাইট ধরলেই সিগন্যাল যাবে ফিটনেস সার্টিফিকেট আছে কী নেই। থাকলে চলবে নইলে চলবে না। আর রঙয়ের চাইতে যান্ত্রিক ফিটনেসকে আমরা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। আর রুট পারমিট ছাড়া কোনো বাস এবার চলতে দেয়া হবে না। আশা করছি, এবার ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন হবে।’

Comments

comments