আমি হইলাম ১৮ তলা, আগে ১৭টা তলা শেষ করে আসেন: প্রতিবন্ধীকে মোস্তাফা জব্বার

আমি হইলাম ১৮ তলা, আগে ১৭ তলা শেষ করেন, তারপরে ১৮ তলায় আসবেন কামরুল নামের এক প্রতিবন্ধী মন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতের আবেদন জানালে এমনটা জবাব দেন টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার।

সম্প্রতি ‘বিপিও সামিট বাংলাদেশ ২০১৯’ অনুষ্ঠিত হয় রাজধানীর কাওরান বাজারে প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে। নিজের অভাব গুছাতে অনেক স্বপ্ন নিয়ে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার বল্লা ইউনিয়নের পাথালিয়া গ্রাম থেকে হুইলচেয়ারে চেপে এই অনুষ্ঠানে এসেছিলেন কামরুল। কিন্তু মন্ত্রীর এমন উত্তরে আবার গ্লানি আর হতাশা নিয়ে ফিরলেন তিনি।

বাংলা ডট রিপোর্টের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য। এই প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর বাংলার ওয়েব সাইটটির বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সংবাদের পাঠকদের জন্য রিপোর্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো:

তখন সবেমাত্র ডিগ্রি (পাস কোর্স) শেষ করেছেন কামরুল হাসান। এরপরই ক্রনিক মায়োপ্যাথি রোগে আক্রান্ত হন তিনি। রোগে অচল হয়ে যায় তার দুটি পা। হাতেও এর কিছুটা প্রভাব পড়ে। ধীরে ধীরে পরিবারের বোঝা হয়ে ওঠেন কামরুল। বাড়তে থাকে গ্লানি, ব্যর্থতা। হুইলচেয়ারে শুরু হয় তার পথচলা। এ অবস্থায় কেটে গেছে কামরুলের প্রায় ১০ বছর।

কিছু একটা করতে হবে, এই তাড়না সারাক্ষণেই কাজ করতে থাকে কামরুলের মনে। সম্প্রতি ‘বিপিও সামিট বাংলাদেশ ২০১৯’ সম্পর্কে টেলিভিশন থেকে জানতে পারেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে কামরুল সিদ্ধান্ত নেন, রাজধানীর কাওরান বাজারে প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিতব্য এই সম্মেলন থেকে ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে জানবেন এবং চেষ্টা করবেন, কাজের জন্য ভালো একটা প্লাটফর্ম পাওয়ার। কাজের মাধ্যমে দূর করবেন সব সীমাবদ্ধতা।

তাই টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার বল্লা ইউনিয়নের পাথালিয়া গ্রাম থেকে হুইলচেয়ারে চেপে একাই রওনা দেন কামরুল হাসান। এই দুঃসাহসিক যাত্রা শেষে দু’দিনব্যাপী এই সম্মেলনের প্রথমদিন গতকাল রবিবার (২১ এপ্রিল) কামরুল হাজির হন পাঁচ তারকা হোটেল সোনারগাঁওয়ের এই সম্মেলনে। আজ সোমবার (২২ এপ্রিল) সম্মেলনের শেষদিন দুপুরে তিনি বাড়ির উদ্দেশে রওনা করেছেন। তবে পূর্ণতায় নয়, শূন্যতা ও গ্লানি নিয়ে শুরু হয়েছে তার দুঃসাহসিক-অনিশ্চিত বাড়ির উদ্দেশে রওনা। তবে রওনার আগে শূন্যতা, গ্লানির কথা জানিয়ে গেছেন প্রতিবন্ধী কামরুল হাসান। সেই সঙ্গে তার গ্লানির কিছুটা ধরা পড়েছে অনুসন্ধানিতে।

এই আয়োজনের অংশ হিসেবে রবিবার বিকেল সাড়ে ৪টায় শুরু হয় এক সেমিনার। তাতে অংশ নেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার এবং এই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমসহ দেশি-বিদেশি অতিথিরা। সেমিনার শুরুর আগ মুহূর্তে স্টেজে থাকা মন্ত্রীসহ অতিথিদের সঙ্গে ছবি তোলায় ব্যস্ত সেমিনারে আগতদের একাংশ। এমন সময় মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের সঙ্গে কথা বলতে সেখানে হাজির হুইলচেয়ারে বসা কামরুল হাসান। সাধারণ মানুষের সহায়তায় মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হন মোস্তাফা জব্বারের।

কামরুল হাসানকে এ সময় স্টেজ থেকে মোস্তাফা জব্বার জানান, তিনি সেমিনারে এসেছেন। সাক্ষাৎ করতে পারবেন না। তার দপ্তরে যেন পরবর্তী সময়ে কামরুল দেখা করে।

এ সময় কামরুল হাসান বাংলা’কে বলেন, ‘প্রতিবন্ধী মানুষ, ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে জানবার আইছিলাম। মন্ত্রী স্যার অফিসে যাইতে কইল। অফিসে যোগাযোগ কেমনে করমু, আমারে কী যাইবার দিব? আমারে একটু হেল্প করেন। সারাদিন জার্নি কইরা কালিহাতী থেইকা আইছি।’

কামরুল আরও বলেন, ‘ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে আয়-ইনকাম হয়, অর্থ উপার্জন হয়। আমি আমার জীবনের মৌলিক চাহিদাও পূরণ করতে পারি না। আমার বাৎসরিক ইনকাম প্রতিবন্ধী ভাতা ৮ হাজার টাকা। আমি বিএ পাস লোক। ভাবছিলাম কোনো জবঠব, ফ্রিল্যান্সিংয়ের রাস্তা দেখাইয়া দেয়, সেজন্য আসছিলাম।’

এরপর সেমিনার শুরু হয়ে গেলে ঠাঁয় বসে থাকেন কামরুল। টানা চার ঘণ্টা চলে সেমিনার। রাত ৮টা ৩৩ মিনিটে শেষ হলে মোস্তাফা জব্বার যেদিক দিয়ে নামবেন, সেদিকে ধীরে ধীরে এগোতে থাকেন কামরুল। তার উদ্দেশ্য, দপ্তরে দেখা করার জন্য মোস্তাফা জব্বারের ভিজিটিং কার্ড নেয়া।

কামরুল আবার মনোযোগ আকর্ষণ করায় স্টেজ থেকে মোস্তাফা জব্বার নামার আগেই এগিয়ে আসেন বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ফারহানা এ রহমান।

ফারহানা এ রহমানকে কামরুল জানান, তিনি বিল্ডিং ডিজাইনের অটোক্র্যাটের কাজ জানেন এবং ফ্রিল্যান্সিংয়ে কর্মজীবন গড়তে চান। এ সময় ফারহানা বলেন, ‘আপনি আমাকে ফোন দিলেই হবে। আমি আপনাকে বলে দেব, কোথায় আপনি ট্রেনিং করতে পারবেন। ফ্রিল্যান্সিং করতে হলে তো আপনাকে কিছু শিখতে হবে। না শিখলে আপনি কাজ করবেন কীভাবে। সেটার ডিটেইল কে বলবে আপনাকে, তার সঙ্গে আপনাকে আমি যোগাযোগ করিয়ে দেব।’

পরক্ষণেই মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার স্টেজ থেকে নেমে যাওয়ার সময় একটু জোরে কামরুল হাসান বলে ওঠেন, ‘স্যার, আমি অফিসে আপনার সাথে সাক্ষাৎ করতাম। একটু ভিজিটিং কার্ড যদি দিয়ে যেতেন।’

মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের প্রশ্ন, ‘আমার সাথে কী বিষয়ে, আপনি কীসে কাজ করেন?’ কামরুলের উত্তর, ‘আমি একটু ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে একটু ধারণা…।’

এবার মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে মন্ত্রী যদি আপনাকে ধারণা দিয়ে দেয়, তাহলে বাকি লোক কী কারণে আছে? ফ্রিল্যান্সিং করবেন, আমার এখানে চারটা ডিপার্টমেন্ট আছে। ওদের সাথে কথা বইলা, পরে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করুন। আমি হইলাম ১৮ তলা, আগে ১৭ তলা শেষ করেন, তারপরে ১৮ তলায় আসবেন। ফ্রিল্যান্সিংয়ের আইডিয়া তো আমি দেব না। ফ্রিল্যান্সিংয়ের আইডিয়া দেবে লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং প্রজেক্ট। প্রজেক্টে যোগাযোগ করেন।’

তখন রাত ৯টা বেজে গেছে। এত রাতে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেয়ারও কোনো উপায় নেই। আগত সাধারণের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন, আশপাশেই একটা মসজিদ আছে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, সেখানেই রাতটা কাটিয়ে দেবেন। দু’জন ব্যক্তি তাকে নিয়ে রাত ৯টার পরে মসজিদের উদ্দেশে রওনা দেন।

পরদিন (আজ সোমবার) বাড়ি চলে যাওয়ার সময় রাতের দুঃসহ স্মৃতির কথা জানান বাংলা’কে জানান প্রতিবন্ধী কামরুল। তিনি বলেন, ‘কালকে রাত্রে যা হইছে, রাস্তায় রাত কাটানো। খোলা আকাশের নিচে। এইটার আর পুনরাবৃত্তি আর জীবনে কখনো করতে দিতে চাই না। এ রকম দুঃসাহসিক সাহস আর দেখাতে চাই না।’

তিনি জানান, মসজিদে ওঠার জন্য কয়েক ধাপ উপরে উঠতে হয়। কিন্তু তার পক্ষে সেটা সম্ভব হয়নি। কথা বলার সময় চোখ লালচে রাঙা হয়ে যাওয়া কামরুল বলেন, ‘রাতে একবার ঝটকা আইছিল, বাতাস। তখন খুব খারাপ লাগছিল। বাতাসে ধুলায়-ঠুলায় অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। আমার ঢাকায় আসার আর কোনো ইচ্ছা নাই।’

১০ বছরের প্রতিবন্ধী জীবনে অনেক আশ্বাস পেয়েছেন কামরুল। কিন্তু আশ্বাস বাস্তবে রূপ নেয়নি। বেসিসের কাছ থেকে পাওয়া আশ্বাসেও তার ভরসা নেই। তিনি বলেন, ‘প্রত্যাশা করছিলাম, এখান থেকে ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে একটা ভালো ধারণা নিমু। কিন্তু পারলাম না। গতকাল মোস্তাফা জব্বার বললেন, মন্ত্রী হয়ে আমি তোমাকে ফ্রিল্যান্সিং শিখামু নাকি।’ কথাটা বলার পর কয়েক সেকেন্ড ধরে হাসলেন কামরুল।

Comments

comments