বিষ খাই; ভাল্লাগে, ঠেলায়!

নিশাত সুলতানা

‘বিষ’ শব্দটি শুনলে আঁতকে ওঠার দিন বোধ হয় শেষ। বরং বিষের সঙ্গে এক ধরনের সখ্য গড়ে উঠেছে আমাদের। বিষ ছাড়া আমাদের চলেই না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত গান ‘আমি জেনেশুনে বিষ করেছি পান, প্রাণের আশা ছেড়ে সঁপেছি প্রাণ।’ মজার ব্যাপার হলো, আমরা এখন কিন্তু প্রাণের আশা ছেড়ে বিষের শরণাপন্ন হই না, বরং জেনেশুনে বিষ খাই প্রাণ বাঁচানোর নামে। বিষের মিশ্রণ কিংবা ভেজাল ছাড়া বাজারে কোনো খাবার নেই। বাঁচতে হলে খেতে হবে, আর খেতে হলে বিষের সঙ্গে সম্পর্ক নিবিড় করতে হবে—এটাই বাস্তবতা।

কারণ আমরা যা কিছু খাই তার সঙ্গেই বিষ ফ্রি। আমাদের রোজকার খাবারে ভেজাল আর বিষাক্ত উপাদানকে অবশ্যম্ভাবী জেনেই জীবন যাপন করছি আমরা। আমরা বিষ খাই, বিষ শিল্পের চর্চা করি আর বিষ ছড়িয়ে দিই সর্বত্র। এই বিষ এমন বিষ, যা খেলে আমরা একবারে মরি না। বরং আমরা মরি প্রতিদিন একটু একটু করে। আমাদের সন্তানেরা বিষের জ্বালায় প্রতিদিন নীল হয় গর্ভের ভেতরে বা বাইরে। কিন্তু তাতে কার কী আসে যায়! আমদের জীবন আজ পরিপূর্ণ রং মাখানো, ফরমালিনে ভেজানো, মোম কিংবা প্লাস্টিকের প্রলেপে মোড়ানো, সিসা-ক্রোমিয়াম-কার্বাইড-অ্যান্টিবায়োটিকে পরিপূর্ণ। মাছ, মুরগি, ফলমূল আর শস্য সম্ভার সবটাতেই। খাবারে ভেজাল আর বিষ যে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত হতে পারে, তা আগে কেউ কি জানত!

এসেছে পবিত্র সিয়াম সাধনার মাস, মাহে রমজান। সারা বছর ঢিলেঢালাভাবে ভেজালবিরোধী অভিযান চললেও এই মাসে মহাসমারোহে ঢাকঢোল পিটিয়ে চলে এই আয়োজন। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। মাননীয় খাদ্যমন্ত্রী স্বয়ং রমজান উপলক্ষে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সুসজ্জিত মোবাইল ভ্যানের মাধ্যমে ঢাকা মহানগরীতে প্রচার-প্রচারণা অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেছেন। রমজান উপলক্ষে র‌্যাব কিংবা বিএসটিআইয়ের ভ্রাম্যমাণ আদালতের ভেজালবিরোধী অভিযান চলছে হোটেলে-রেস্টুরেন্টে । ব্যস্ত ভ্রাম্যমাণ আদালত, ব্যস্ত প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকেরা। এর ফলে সাজানো গোছানো রেস্টুরেন্টের অন্দরমহলের তরতাজা খবর আর ছবি বেরিয়ে আসছে বাইরে। আমরাও হুমড়ি খেয়ে সেই ছবি দেখছি, ভিড়মিও খাচ্ছি।

এসব হোটেল রেস্টুরেন্টের ভিড়ে অভিজাত এলাকার হোটেল-রেস্টুরেন্টও রয়েছে। এসব হোটেল কিংবা রেস্টুরেন্টের রান্নাঘরের শেওলা ধরা দেয়াল, কর্দমাক্ত মেঝে, জীবাণুতে ঠাসা বাসনপত্র, ঝুলকালিতে পরিপূর্ণ চুলার চারপাশ, রান্নাঘরের লাগোয়া কাঁচা কিংবা পাকা টয়লেটের উপস্থিতি দেখে আমাদের চক্ষু চড়কগাছ। বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন তাঁর ‘রসনা-পূজা’ নামের রম্য রচনায় বর্ণনা দিয়েছিলেন রন্ধনশালার বাইরের নোংরা পরিবেশের। তিনি বলেছিলেন, পাকশালার ভেতরে জিহ্বায় জল উদ্রেককারী খাবারের সামগ্রী আর বাইরে আবর্জনার স্তূপ। বেগম রোকেয়া আজ বেঁচে থাকলে হয়তো তাঁকে নতুন করে এ রচনা লিখতে হতো। আজ আমাদের মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা শিখে গেছেন ময়লার স্তূপে বসে রান্না করে কীভাবে শতভাগ নিরাপদ আর হালাল খাবারের ধোয়া তুলে খাদ্যদ্রব্য বাজারজাত করতে হয়।

যদিও এত দিনে এসবেই অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার কথা ছিল আমাদের, কিন্তু কেন জানি না বিবেক বলে একটা জিনিস এখনো পীড়া দেয় আমাদের। মেয়াদোত্তীর্ণ বিবর্ণ হয়ে যাওয়া মাছ-মাংস, রসে টইটুম্বুর মিষ্টির পাত্রে জীবিত কিংবা মৃত তেলাপোকার উপস্থিতি, ইঁদুরের বিষ্ঠামাখা লাচ্ছা সেমাই আর ঘর্মাক্ত শ্রমিকের পায়ে দলিত বেকারির কাঁচামাল ইত্যাদি দেখে কদিনের জন্য আমরা মাতামাতি করি । সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, মেসেঞ্জারের চ্যাটবক্সে কিংবা গ্রুপে পোস্ট দিই। কেউ কেউ সাময়িকভাবে এড়িয়ে চলি এসব খাবারকে কিংবা খাবারের উৎস প্রতিষ্ঠানকে। তারপর কদিন পরে আবার পা বাড়াই সেই পথে। কারণ ভিন্ন পথ আমাদের অজানা। সব পথের গন্তব্যই যেন এক। একদিকে ওয়াসার দূষিত পানি আর অন্যদিকে ক্ষতিকর সিসামিশ্রিত দুধ, ট্যানারির বিষাক্ত বর্জ্য থেকে তৈরি পোলট্রি ফিডে গঠিত প্রাণিজ আমিষ, ফরমালিনসমৃদ্ধ মাছ, ফল আর নকল ডিমের আশঙ্কা নিয়ে আমরা রোজ খাবার তুলে দিই আমাদের সন্তানের মুখে। কষ্টার্জিত অর্থের বিনিময়ে জেনে-বুঝে বিষ খাওয়াই ওদের।

মাননীয় খাদ্যমন্ত্রী বলেছেন, খাদ্যে যারা ভেজাল মেশায়, তাদের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। সরকার নাকি প্রয়োজনে প্রচলিত আইনের সংস্কার করে শাস্তির মাত্রা বাড়াবে। দরকার হলে শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে যাবজ্জীবন বা মৃত্যুদণ্ড করা হবে। সরকারের জিরো টলারেন্স শুরুর স্তরটি আসলে কোথায় তা জানতে ইচ্ছে করে। মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করা এসব অসাধু ব্যবসায়ীদের যে জরিমানা করা হয়, তার অঙ্ক শুনলেও হাসি পায় মাঝেমধ্যে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই জরিমানার পরিমাণ হয় তাঁদের এক দিনের লভ্যাংশের চেয়েও কম। শুধু বাজারের খুচরা বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে ভেজালবিরোধী অভিযান বিষাক্ত খাদ্যের ব্যাপকতার বিপরীতে কি যথেষ্ট? বিষমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকারকে খাদ্যে বিষ মিশ্রণের উৎসমূল থেকে শুরু করে সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা কঠোর নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

সারা বাংলাদেশ আজ ছেয়ে গেছে নোংরা আর অস্বাস্থ্যকর খাবারে। খাবারে মিশ্রিত বিষ গ্রাস করছে আমাদের লিভার, কিডনি, হৃৎপিণ্ড ও অস্থিমজ্জা। লাখ লাখ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে ক্যানসারে, নবজাতক ভুগছে শারীরিক বৈকল্যে। আর কত সহ্য করা যায়! সরকারের কাছে প্রশ্ন, একবার বলুন কোথায় গেলে পাব একটু বিষমুক্ত খাবার? কেউ কি এর সন্ধান দেবেন? আমার সন্তান আমাকে প্রশ্ন করেছে, ‘মা, কলায় নাকি বিষ আছে? আমি কলা খেয়ে মারা যাব না তো?’ আরেক সন্তান প্রশ্ন করেছে, ‘মুরগির হাড়ে তো ক্যালসিয়াম থাকে। তুমি কেন আমাকে হাড় খেতে দাও না? হাড় না খেলে আমার মেরুদণ্ড শক্ত হবে কীভাবে?’ সরকারের কেউ কি আছেন এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পারেন। যদি না দিতে পারেন তবে পাঠ্যপুস্তক থেকে সরিয়ে ফেলুন খাদ্য উপাদান, এর প্রয়োজনীয়তা কিংবা সুষম খাদ্যাভ্যাসসংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়বস্তু। এর ফলে অন্তত আমাদের এসব প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে না। আমরা আমাদের সন্তানের জন্য চাই একটু নিরাপদ খাবার। আমরা চাই ওরা বেঁচে থাকুক, ওদের ছোট ছোট অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো সচল থাকুক, থাকুক ঝুঁকিমুক্ত। অন্তত ওদের জন্য চাই একটু বিষমুক্ত খাবার। কোথায় গেলে মিলবে সে খাবার?

নিশাত সুলতানা: লেখক ও গবেষক
[email protected]

Comments

comments