গায়েবি মামলার চার্জশিট দিতে পারছে না পুলিশ!

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ঢাকার বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া ‘গায়েবি’ মামলাগুলোর চার্জশিট দিতে পারছে না পুলিশ। ডিএমপি’র বিমানবন্দর, উত্তরখান, উত্তরা পূর্ব, উত্তরা পশ্চিম, তুরাগ ও দক্ষিণখান এই ছয়টি থানায় দায়ের হওয়া বেশ কয়েকটি মামলা নিয়ে অনুসন্ধানে জানা গেছে এমন তথ্য। এসব মামলায় ঘুরেফিরে একই আসামির নাম এবং মামলার এজাহারেও মিল পাওয়া গেছে। মামলাগুলোর বিষয়ে কিছুই জানেন না অনেক সাক্ষী। এছাড়া মামলার আলামত হিসেবে পুলিশ যেসব জব্দ করার কথা উল্লেখ করেছে তা অনেকের কাছে হাস্যকর বলে ঠেকছে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গত বছরের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে দায়ের হওয়া এসব মামলার এজাহার নিয়ে অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিমানবন্দর থানায় গত বছরের ১২ই সেপ্টেম্বর করা ২২(৯) ১৮ নম্বর মামলার এজহারে বলা হয়, থানা এলাকায় আশকোনার হজ্জ ক্যাম্পের সামনে হজ্জ ক্যাম্প পার্কিংয়ে নাশকতা চালানোর জন্য বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রস্তুতি চালাচ্ছিলো। এমন সময় বিমানবন্দর থানার টহল দল সেখানে উপস্থিত হলে বিএনপির নেতাকর্মীরা পুলিশের উপর এলোপাতাড়ি ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যায়। এ সময় তাদের ছোঁড়া ইট-পাটকেলে একাধিক পুলিশ সদস্য আহত হন। এসময় পুলিশ সদস্যরা এলাকার একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন আসামিদের নাম। এই মামলায় আসামি করা হয় ১১২ জনকে, সঙ্গে আছে আরো অজ্ঞতনামা ১০ থেকে ১২ জন।

প্রায় শতাধিক ব্যক্তি পুলিশের উপর হামলা চালিয়েছে অথচ ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে স্কচটেপের একটি টুকরা, দুইটি জর্দার কোটা, এগারোটি ভাঙ্গা ছোট-বড় ইটের টুকরা, ১৩টি বাঁশের লাঠি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ মামলার একজন আসামি বলেন, যদি আমরা এক-দেড়শ জন পুলিশের উপর হামলা চালাই তাহলে এখান থেকে কিভাবে মাত্র এগারোটি ভাঙ্গা ইটের টুকরা উদ্ধার হয়, মানুষ হিসেব করলে তো অন্তত কয়েকশ ইটের টুকরা বা আলামত উদ্ধার করার কথা। মামলায় দেখানো জব্দ আলামত থেকে বোঝা যায় এসব মামলার কোনো ভিত্তি নেই।

শুধু নির্বাচনের আগে আমাদের হয়রানি করতে তারা সরকারকে সহযোগিতা করেছে। এদিকে একই তারিখে দক্ষিণখান থানার আরেকটি মামলার এজহার থেকে জানা যায়, ওই দিন দক্ষিণখান থানাধীন দক্ষিণ আজমপুর জামতলা ২ নম্বর রেলগেইট সংলগ্ন ৩৩ নম্বর কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের নেতাকর্মীরা গাড়ি ভাংচুর করছিল। এমন সময় পুলিশ ঘটনাস্থলে আসলে নেতাকর্মীরা পুলিশের দায়িত্ব পালনে বাধা দিয়ে পুলিশের উপর ইটপাটকেল ছুঁড়ে মারে। এতে পুলিশের কয়েকজন সদস্য আহত হন বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়। পরে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নেতাকর্মীরা পালিয়ে যায়। তখন ঘটনাস্থল থেকে যানবাহনের ভাঙ্গা অংশ, তিনটি অবিস্ফোরিত ককটেল পাওয়া যায় বলে এজাহারে লেখা হয়। এই মামলায় যে তিনজনকে সাক্ষী দেখিয়ে স্বাক্ষর রেখে আলামত জব্দ করা হয়েছে এমন তিনজনের স্বাক্ষর দেখতে হুবহু একই রকম। আলামতের জব্দ তালিকার লেখকের হাতের লেখার সাথে মিলে যায়।

ডিএমপির এই দুই থানার মামলার মতো ছয়টি থানার মামলার এজাহার বিশ্লেষণ করে প্রায় একই রকম চিত্র পাওয়া যায়। শুধু ঘটনার স্থান, কাল ও সময়ের সামান্য হেরফের রয়েছে। ছয়টি থানার অন্তত বিশটি মামলায় দেখা গেছে, মামলার এজাহারে ঘুরে ফিরে একই ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। এমন একটি মামলার আসামি পিয়াল হাসান । তার বিরুদ্ধে উত্তরা পূর্ব, দক্ষিণখান ও বিমানবন্দর থানায় এগারোটি মামলা করা হয়। এসব মামলায় তিনি আগাম জামিনে আছেন। পিয়াল বলেন, কখন কবে কি করলাম নিজেও জানি না। অথচ আমার বিরুদ্ধে এগারোটি মামলা। নির্বাচনের আগে শান্তিতে নিজের বাড়িতে ঘুমাতে পারিনি। পুলিশ নানাভাবে হয়রানি করেছে। আর এসব মামলা মিথ্যা বা সাজানো মামলা সেটা মামলা গুলোর এজাহার দেখলেই বোঝা যাবে। সবগুলোর এজাহার একই রকম। এখন পুলিশ হয়রানি করছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, যা করার নির্বাচনের আগেই করেই ফেলেছে এখন তো আমি আগাম জামিনে আছি, তাই কোনো ধরনের হয়রানি করতে পারছে না।

গায়েবি মামলার আরেক আসামি শওকত। তুরাগ ও দক্ষিণখান থানায় প্রায় ১৩টি মামলা আছে তার বিরুদ্ধে। শওকত বলেন, তুরাগ থানায় যেদিন আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে সেদিন আমি হজ করে দেশে ফিরেছি। আমার পাসপোর্টেও সেই তারিখ আছে। কিন্তু আমাকে পুলিশ নাশকতা মামলা দিয়ে দিলো। হজ করে ফেরার দিনই কেউ নাশকতা চালায়? আমি কোনো রাজনীতি করি না, তারপরও আমার বিরুদ্ধে এ মামলা দিয়ে হয়রানি করেছে। এর বিচার আমরা কার কাছে চাইবো? এসব মামলার এজাহারে উল্লেখ থাকা সাক্ষীদের সঙ্গে কথা বলে বেরিয়ে আসে আরো তথ্য।

বিমানবন্দর থানার ২২ নম্বর মামলার স্বাক্ষীদের ফোন দেয়া হলে বেরিয়ে আসে হতাশাজনক উত্তর। কারণ স্বাক্ষীরদের প্রায় সকলে জানেন না যে তারা নাশকতামূলক কোন মামলার স্বাক্ষী তাদের মধ্যে একজন আশকোনা পুলিশ বক্স এলাকার চা দোকানদার। প্রতিবেদকের কাছে তিনি একটি মামলার স্বাক্ষী এমন কথা শুনে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি মানবজমনিকে বলেন, কয়েকমাস আগে পুলিশের কয়েকজন এসে তার কাছ থেকে স্বাক্ষর নিয়ে যায়, কিসের স্বাক্ষর বা কেন দিচ্ছে কিছুই বলেনি পুলিশ। তার সঙ্গে আরেকজন ডাব বিক্রেতারও স্বাক্ষর নিয়েছিলো পুলিশ। বেশ কয়েকজন স্বাক্ষীর সঙ্গে কথা বলে একই রকম চিত্র পাওয়া যায়। এমন আরো বিভিন্ন মামলার বেশ কয়েকজন স্বাক্ষীকে ফোন দিলে ফোন নম্বরের সাথে নামের মিল পাওয়া যায়নি বা এজাহারে উল্লেখ করা নম্বর ও ঠিকানা ছিল ভুল। জাতীয় নির্বাচনের আগে দায়ের হওয়া এসব মামলা নিয়ে বিপাকে আছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তারাও। নানা জটিলতায় ঘেরা নাশকতা মামলাগুলোর চার্জশিট দিতে পারছে না তারা।

ঘটনার প্রায় আট মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো কোন মামলায় চার্জশিট দিতে পারেনি পুলিশ। এমনকি কবে নাগাদ দিতে পারবে তাও জানেন না তদন্তকারী কর্মকর্তারা। বিমানবন্দর থানার একটি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও উপ-পরিদর্শক সবুজ রহমান বলেন, মামলার তদন্ত চলছে, এর বেশি কিছুই বলতে পারবো না। তবে তার মামলার সাক্ষীর ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাক্ষীরা জেনে বুঝে সাক্ষী দিয়েছে। তারা তো বিষয়টা জানার কথা। এ বিষয়ে তিনি আর কথা বলতে রাজি হননি। দক্ষিণখান থানার আরেক মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কবির হোসেন বলেন, সব থানার মামলার এজহারের বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারবো না। আমি একটি মামলার কথা বলতে পারবো। একই দিনে বা এক দুই দিন পর একই ব্যক্তি বিভিন্ন থানায় ঘুরে ফিরে কিভাবে আসামি হয় এমন প্রশ্নে তিনি উত্তর দিতে রাজি হননি। এসব বিষয়ে সিনিয়র কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি। উত্তরা পূর্ব থানার আরেক ততন্তকারী কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আমি কিছু বলতে পারবো না । আমি এখন আর নাশকতা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নেই। তবে যতটুকু বলতে পারি, এসব মামলার তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হলেই চার্জশিট দেয়া হবে।

দক্ষিন খান থানার আরেক তদন্তকারী কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ বলেন, চার্জশিট দিতে দেরি হচ্ছে না, মামলাগুলো তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হলেই চার্জশিট দেয়া হবে। মামলার এজহার প্রায় এক এ বিষয়ে তিনি কথা না বললেও একই ব্যক্তি বিভিন্ন থানায় আসামি হয় কি করে প্রশ্নে তিনি বলেন, যারা নাশকতার সঙ্গে যুক্ত ছিল তাদেরকেই আসামি করা হয়েছে। ভালো মানুষদের করা হয়নি।

উত্তরা পশ্চিম থানার তদন্ত কর্মকর্তা মুশফিকুর রহিম বলেন, সব থানার এজাহার কিভাবে একরকম হয় সেটা আমি বলতে পারবো না। আমার থানার টা আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম এবং আমি নিজেই বাদি হয়ে মামলা করেছি। যারা নাশকতার সঙ্গে যুক্ত ছিল তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে । সময় হলেই চার্জশিট দেবো।

এসব মামলার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজিবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, এই ধরনের গায়েবি মামলাগুলোর চাচর্জশিট আগামী পাঁচ বছরেও দিতে পারবে না পুলিশ। কারণ ঘটনা যেখানে ঘটে নাই, সেটা ঘটেছে দেখাবার জন্য পুলিশ স্বাক্ষী প্রমাণ কোথায় খুঁজে পাবে? অন্যদিকে আমার কাছে মনে হয়, এসব মামলা নিঃসন্দেহে আইন এবং ক্ষমতার অপপ্রয়োগ। বেশিরভাগ গায়েবি মামলা হওয়া সত্ত্বেও এগুলো খারিজ হচ্ছে না।

সূত্র: মানবজমিন

Comments

comments