তাকওয়া অর্জনের খোদায়ী ট্রেনিং রমাদ্বান

হাফেজ মাওলানা শিহাব উদ্দিন

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ كُتِبَ عَلَيْكُمُ ٱلصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
হে ঈমানদাগণ! তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেভাবে ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর,এ থেকে আশা করা যায়, তোমাদের মধ্যে তাকওয়ার গুণাবলী সৃষ্টি হয়ে যাবে।

রমজানের নামকরণ
‘রমজান’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে জ্বালিয়ে দেয়া, পুড়িয়ে দেয়া, বিনাশ সাধন করা, দহন করা বা পোড়ানো। যেহেতু রমজানের রোজা গুনাহসমূহ ও আত্মার সর্বপ্রকার কলুষতা ও অপবিত্রতাকে জ্বালিয়ে ভস্ম করে দেয় তাই এ মাসের নাম রমজান।

রোজার আভিধানিক সংজ্ঞা
রোজা ফারসি শব্দ। আরবিতে এর প্রতিশব্দ ‘সাওম’। যার বহুবচন হচ্ছে সিয়াম। এর আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা, কঠোর সাধনা করা, জ্বালিয়ে দেওয়া, পুড়িয়ে দেওয়া, অবিরাম চেষ্টা করা ইত্যাদি।

রোজার পারিভাষিক অর্থ
ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত যাবতীয় পানাহার ও ইন্দ্রিয় তৃপ্তিসহ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কর্তৃক নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকার নামই রোজা।

রোজার উদ্দেশ্য
শরিয়তের প্রত্যেকটা আমলের একটা সহিহ উদ্দেশ্য থাকে। প্রত্যেক সহিহ আমলের সেই উদ্দেশ্য যদি হাসিল করা যায়, তাহলে সেই আমলের পুরোপুরি ফায়দা পাওয়া যায়। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র রমজান মাসে রোজা ফরজ করেছেন তাকওয়া অর্জনের জন্য। আল্লামা ইবনুল কাইয়িম রোজার উদ্দেশ্য সম্পর্কে লিখেছেন- রোজার উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে তার পাশবিক ইচ্ছা ও জৈবিক অভ্যাস থেকে মুক্ত করা এবং জৈবিক চাহিদার মধ্যে সুস্থতা ও স্বাভাবিকতা প্রতিষ্ঠা করা। ইমাম গাজ্জালী (রহ) ইয়াহইয়াউল উলুমদ্দিন গ্রন্থে লিখেছেন, আখলাকে ইলাহি তথা ঐশ্বরিক গুণে মানুষকে গুণান্বিত করে তোলাই রোজার উদ্দেশ্য। সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মানুষ আত্মশুদ্ধি ও পবিত্রতা অর্জন করে। শারীরিক ও আত্মিক শক্তির উন্নতি সাধন করে।

  •  يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا
    হে ঈমানদারগণ! কুরআনুল কারিম যখন ‘মুমিনদের’ সম্মোধন করেন স্বাভাবিকভাবে বুঝতে হবে এরপর কোন বিধান, হুকুম অবতীর্ণ হবে। যখন ‘নাস’ কে খেতাব করা হয় তখন ঈমান গ্রহণ করার নির্দেশ দেয়া হয়। কুরআন তাদেরকে মুমিন বলে যারা শুধু মুখে ঈমানের ঘোষণা দেয় না বরং তাদের হৃদয়ে ঈমানের বিষয়গুলো গেঁথে নেয় ও জীবনে তার জন্য ত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকে। আর বিশ্বাসের মধ্যে থাকে না সন্দেহ।
  • إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا وَجَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أُوْلَئِكَ هُمْ الصَّادِقُونَ
    “নিশ্চয়ই তারাই মুমিন যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনে এবং তাতে আর সন্দেহ পোষণ করে না এবং জানমাল দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করে তারাই সত্যিকারের মুমিন।” (সূরা হুজুরাত : ১৫)

আল্লাহ তা‘আলা ঈমান বা মু’মিনের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন-
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آَيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ أُولَئِكَ هُمُ الْمُؤْمِنُونَ حَقًّا لَهُمْ دَرَجَاتٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَمَغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ
অর্থ: প্রকৃত মু’মিন তারাই যখন তাদের নিকটে আল্লাহর নাম স্মরণীত হয় তখন তাদের অন্তর কেঁপে উঠে। আর যখন তাদের নিকট তাঁর আয়াত পঠিত হয় তখন তাদের ঈমান বর্ধিত হয়। তারা তাদের প্রভুর উপরেই ভরসা করে। আর যারা নামায প্রতিষ্ঠা করে, এবং আমার প্রদত্ত রিযিক হতে (আল্লাহর পথে) ব্যয় করে। তারাই হলো সত্যিকার ঈমানদার। (সূরা আনফাল, আয়াত ২-৪)

  • (كُتِبَ عَلَيْكُمُ ٱلصِّيَامُ (صوم صيام এর (মাসদার/ক্রিয়ামূল)এর শরীয়তী অর্থ হল, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ফজর উদিত হওয়ার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার এবং রতিক্রিয়া (যৌনবাসনা) পূরণ করা থেকে বিরত থাকা।(তাফসীরে আহসানুল বায়ান) সমগ্র দুনিয়াব্যাপী গোটা মুসলিম উম্মাহ এ পবিত্র ইবাদাতে আল্লাহর রহমত, মাগফিরাত ও সওয়াবের এত বেশি বোনাস দেন যে এক নফল ইবাদত এক ফরজের সমান।যখন আকাশ থেকে ফেরেশতারা আল্লাহর হুকুমে ঘোষণা দিতে থাকেন ‘হে নেক আমলকারীগণ! সিদ্ধান্ত নাও, ইবাদত-বন্দেগির জন্য কোমর বাঁধ। হে বদকারেরা! অপরাধের জগৎ থেকে ফিরে আস, তাওবা কর।” (বায়হাকী) নবীজি (সা) বলেন, মিথ্যা কথা ও সাক্ষ্য দেয়া থেকে স্বীয় জিহবাকে যারা সংযত করে না আর অন্যায় ও সীমালংঘনের কাজ থেকে যার দুই হাত বিরত থাকে না তার সিয়াম করা আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই।” (সহীহ বুখারী) “তোমাদের ওপর সিয়ামের ফরমান অবতীর্ণ হয়েছে।” সিয়ামকে كُتِبَ শব্দ দিয়ে ফরজ করা হয়েছে। অর্থাৎ লিখিত বিধান অবতীর্ণ হয়েছে। শব্দটি সিয়ামকে অনেক বেশি তাৎপর্যবহ করে আরও বহু নির্দেশ হতে এটিকে ভিন্ন মাত্রার সংযোজন ঘটিয়েছে। এ কঠিন শব্দটির মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা কিসাসের বিধান নাজিল করেছেন, করেছেন মিরাসের অতীব গুরুত্বপূর্ণ ফরমান।

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ، رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ ، قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم : مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّورِ وَالْعَمَلَ بِهِ فَلَيْسَ لِلَّهِ حَاجَةٌ فِي أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ.
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি রোজা রাখলো অথচ অন্যায় কথা ও কাজ পরিত্যাগ করতে পারলো না ঐ ব্যক্তির রোজা রাখা, আর না রাখা আল্লাহর কাছে কোন গুরুত্ব বহন করবে না। (সহীহ আল-বুখারী)

রাসূল (সা.) রোজাদারের প্রতিদান সম্পর্কে আরো বলেছেন, কোন মুমিন যদি আত্মসমালোচনার মাধ্যমে রোজা পালন করে তাহলে তাকে ‘রাইয়ান’ নামক দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে। রোজাদার ছাড়া আর কেউ ঐ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না।

عَنْ سَهْلٍ ، رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ : إِنَّ فِي الْجَنَّةِ بَابًا يُقَالُ لَهُ الرَّيَّانُ يَدْخُلُ مِنْهُ الصَّائِمُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
হযরত সাহাল (রা.) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, জান্নাতে ‘রাইয়ান’ নামক একটি দরজা আছে কিয়ামতের দিন শুধু রোজাদারগণ ঐ দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (সহীহ আল-বুখারী)

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الْقِصَاصُ فِي الْقَتْلَى
“হে মুমিনগণ নিহতদের ব্যাপারে তোমাদের জন্য قِصَاص এর বিধানের লিখিত ফরমান নাজিল হয়েছে।” (সূরা বাকারা-১৭৮ )
অনুরূপভাবে ‘মিরাজের’ অতীব কঠিন ও জটিল বিষয়েও এই একই শব্দ ব্যবহার করেছে আল-কুরআন। বিষয়টিতে চিন্তাশীলদের জন্য অনেক ভাবার বিষয় লুকিয়ে রয়েছে। এই একটি শব্দ একটি গ্রন্থ সদৃশ, এর মধ্যে লুকিয়ে আছে সিয়ামের গুরুত্ব ও তাৎপর্যের হাজার ইশারা।

রমজান মাস শুধু কোরআন নাজিলের মাস নয়; সকল আসমানী কিতাব নাজিলেরও মাস। এ মাসেরই ৬ তারিখে মুসা (আ:) এর ওপর তাওরাত, ১৮ তারিখে দাউদ (আ:) এর ওপর যবুর, ১৩ তারিখে ঈসা (আ:) এর উপর ইনযিল এবং শেষ ১০ দিনের কোন এক বিজোড় রাতে আল কোর আন অবতীর্ণ হয়। কোর আন নাজিলের এ রাতকে ‘লাইলাতুল কদর’ বা ‘কদরের রাত’ বলা হয়। শুধু তাই নয় এ মাসের ২য় হিজরির ১৭ই রমজান বদর যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং মুসলমানরা বিজয়ী হয়, ৮ম হিজরির ২০ শে রমজান মক্কা বিজয় হয়, রমজানের প্রথম রাত্রি হযরত ইবরাহিম আ:-এর ওপর সহিফা নাজিল হয়, ১৩ই রমজান আমর বিন আসের নেতৃত্বে জেরুসালেম বিজয় হয়, রমজান মাসেই হযরত সুমাইয়া নির্মমভাবে শহীদ হন, ৯২ হিজরিতে রমজান মাসেই তারেক বিন জিয়াদ কর্তৃক স্পেন বিজয় হয়, রমজান মাসে মুসলমানদের পবিত্রস্থান বায়তুল মোকাদ্দাস বিজয় হয়। আর এ কারণে মাসটি অতি মহিমান্বিত।

  •  كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ “যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপরও অনুরূপ লিখিত সিয়ামের ফরমান অবতীর্ণ হয়েছিল।” “এ সিয়ামের বিধান শুধু উম্মতে মুহাম্মদীর ওপর নয় সকল কালের সকল নবীর শরিয়তে ফরজ করেছিলাম। এ কথাটি সংযুক্ত না হলেও সিয়াম পালন করা ফরজ হয়ে যেতো। এর মাধ্যমে সিয়ামের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ফুটে উঠেছে। এ বিধানটি এতই গুরুত্বপূর্ণ সকল নবীর শরিয়তে সিয়াম সাধনা ফরজ করা হয়েছিল। আর তা এই জন্য যে এর মাধ্যমে এমন কতগুলো গুণাবলি অর্জন হয় যা পরকালীন মুক্তি ও ইহকালীন কল্যাণ অর্জনে অপরিহার্য। শরিয়তের বহু আইন এমন রয়েছে যা এক জাতির ওপর জরুরি হলেও অপর আর এক জাতির ওপর পালনীয় ছিল না। কিন্তু সিয়াম ওই বিধানের অন্তর্ভুক্ত যাকে আল্লাহ তায়ালা সার্বজনীন করেছেন। সময়ের প্রতিটি অধ্যায়ে সকল শ্রেণী পেশার ওপর অবশ্য পালনীয় হিসেবে নির্ধারণ করেছেন।

এ মাসের প্রতিটি মুহূর্ত অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এ মাসেই আল কুরআন নাজিল হয়েছে। অবতীর্ণ হয়েছে সব আসমানি বিতাব। এ মাসের মধ্যে একটি রাত আছে, যার মধ্যে আল কুরআন নাজিল হয়েছে সে একটি রাতের মর্যাদা সমস্ত মাসের চেয়েও বেশি। এ পবিত্র মাসের প্রথম দশ দিন রহমত অবতীর্ণ হয়, সিক্ত করে দেয় তামাম পৃথিবী ও পৃথিবীর অধিবাসীকে, বান্দাহরা যেন রহমত লাভে ধরনা দেয় হাত তোলে প্রভুর কাছে। মধ্য দশ রমজানে প্রভুর পক্ষ থেকে অসংখ্য বনি আদমকে মাফ করে দেয়া হয়।

( شهر رمضان أوله رحمه و أوسطه مغفرة و آخره عتق من النار )
“রমযান মাসের প্রথম অংশ রহমত, মধ্যম অংশ মাগফেরাত ও শেষ অংশ জাহান্নাম থেকে মুক্তির” এ হাদিস মুনকার। “কিতাবুদ দুয়াফা” লিল উকাইলি: (২/১৬২), “আল-কামেল ফি দুয়াফায়ির রিজাল” লি ইবনু আদি: (১/১৬৫), “কিতাবু ইলালিল হাদিস” লি ইবনু আবি হাতেম: (১/২৪৯), “সিলসিলাতিল আহাদিসুস দায়িফা ওয়াল মাওদুয়াহ” লিল আলবানি: (২/২৬২) ও (৪/৭০) হাদিসের মানঃ মুনকার (সর্বদা পরিত্যক্ত)

চোখের পানি ও তাওবার মাধ্যমে করতে হবে শবেকদরের দুর্লভ রজনীর অনুসন্ধান। এ রাত যারা হারালো তারা যেন সব কিছু হারালো।

  •  لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ “সিয়ামের মাধ্যমে তোমরা তাকওয়ার গুণ অর্জন করতে পার।” আয়াতের শেষে তাকওয়া অর্জনকে সিয়ামের মূল লক্ষ্য হিসেবে স্থির করা হয়েছে। এ তাকওয়াকে কুর আন ও হাদিসে বিস্তারিত ও গুরুত্বের সাথে আলোচনা করা হয়েছে। আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের সাথে তাকওয়া নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত।
  •  তাকওয়া শব্দটি (وقي) মূল ধাতু থেকে নিষ্পন্ন হয়েছে। এর অর্থ বেঁচে থাকা, পরহেজ করা এবং সাবধান হওয়া। তাকওয়া বলতে আল্লাহভীতিকে বোঝায়। তাই আল্লাহর ভয়ে ও তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে যাবতীয় নাফরমানি থেকে পরহেজ করে চলাই তাকওয়ার মূল উদ্দেশ্য। এর পরিধি সমগ্র জীবনের সব কিছুতে বিস্তৃত। যারা নিজ জীবনে তাকওয়ার অনন্য বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে তারা মুত্তাকি। কুরআনুল কারিম মুত্তাকিদের বৈশিষ্ট্য আলোচনা দিয়ে আল-কুরআনের সূচনা করেছেন।

ذَلِكَ الْكِتَابُ لا رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِلْمُتَّقِينَ o
الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلاة وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ o
وَالَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ وَبِالآخرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ o

“এই কিতাবটি সেই কিতার যাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই এবং মুত্তাকিগণ এ কিতাবের হিদায়ত লাভে সমর্থ হবেন। আর তাকওয়ার অধিকারী তারা যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে গায়েবের ওপর, সালাত প্রতিষ্ঠা করে, আল্লাহপ্রদত্ত রিজিক থেকে ব্যয় করে পূর্বের কিতাব সমূহে ও আখেরি কিতাবের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং আখেরাতের জীবনে দৃঢ় একিন পোষণ করে।” (সূরা বাকারা : ২-৪)

তাকওয়ার সাথে রয়েছে মর্যাদা। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে সাদা-কালো ধনী-দরিদ্র আরব-অনারব প্রাচ্য-পাশ্চাত্য এর ভিত্তিতে মর্যাদার মূল্যায়ন হবে না। বরং মূল্যায়নের ভিত্তি কী হবে তা তিনি নিজেই বলেছেন। “নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে যারা তাকওয়ার অধিকারী তারাই আল্লাহর নিকট অধিক সম্মানিত।”(সূরা হুজুরাত : ১৩)

তাকওয়াই হচ্ছে জান্নাত লাভের অপরিহার্য শর্ত। কুরআনে যেখানে জান্নাতের আলোচনা করা হয়েছে, সেখানে তাকওয়ার উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা মরিয়ামে আল্লাহ বলেন, “সে জান্নাতের উত্তরাধিকারী আমি অবশ্য তাদেরকে বানাব, আমার বান্দাদের মধ্যে যারা তাকওয়ার অধিকারী।” (সূরা মরিয়াম ৬৩)

তাই আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাকওয়ার গুণসম্পন্ন মুক্তাকি সৃষ্টির জন্য রমজান মাসের সিয়াম সাধনা অপরিহার্য করেছেন। অন্য কোন ইবাদাতে এই গুণ অর্জন সম্ভব নয়, যেভাবে সিয়ামের মধ্যে সম্ভব। প্রত্যেক ইবাদাতে লৌকিকতা তথা প্রদর্শনের সুযোগ রয়েছে। মানবিক দুর্বলতায় কারো মধ্যে হয়তো বা এমন প্রবণতা সৃষ্টি হতেও পারে। কিন্তু সিয়াম এমন হক ইবাদাত কেবলমাত্র আল্লাহর ভয় না থাকলে, আত্মশুদ্ধির চরম ইচ্ছা না থাকলে তা পালন সম্ভব নয়। রোজা রাখলাম কী রাখলাম না, এটি আল্লাহ ছাড়া কারো বোঝার কোনো উপায় নেই। ইসলামের মৌলিক ইবাদাতগুলোর মধ্যে যেমন নামাজের মাধ্যমে মানুষকে দেখানোর সুযোগ রয়েছে, জাকাতের মাধ্যমে মানুষ দেখতে পায়, অন্তত যাকে জাকাত দেয়া হল সে তো জানতে পারে।

হজ পালনে মানুষ বুঝতে পারে। কিন্তু রোজা যদি কেউ একান্তে গোপনে ঘরে নিভৃত কোণে বসে পানাহার করে তা কোনো মানুষ দেখতে পায় না, সেই ক্ষেত্রে কেবলমাত্র আল্লাহভীতি বা তাকওয়ার গুণাবলিই লোকচক্ষুর অন্তরালে ব্যক্তিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত রাখতে পারে। আর তাকওয়ার এই প্রশিক্ষণ শুধুমাত্র রমজান মাসের জন্য নয় বরং তার জীবন চলার পথে যাবতীয় অন্যায়, দুর্নীতি, পাপ, খারাপ কাজ থেকে লোক ভয় নয়, আল্লাহর ভয়ে বিরত থাকার এক উন্নততর প্রশিক্ষণ তৈরি করে দেয়।

জীবনে মূল সফলতা এ তাকওয়ার সাথে সম্পৃক্ত। কুর আন বলছে- وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجا- وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لا يَحْتَسِبُ “আল্লাহ তায়ালা মুত্তাকিদের জন্য জীবন চলার পথ বের করে দেন আর ধারণার অতীত জায়গা থেকে রিজিকের ব্যবস্থা করেন।” (সূরা তালাক :২-৩) বান্দাদের সম্মান, মর্যাদা এর সাথে সম্পর্কিত إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ “আল্লাহর নিকট মুত্তাকির অধিক মর্যাদা সম্মান, তিনি সবকিছু জানেন ও খবর রাখেন।” মানুষকে কর্মক্ষম করতে ও মোটামুটি আরামে থাকতে যা প্রয়োজন তাতে সন্তুষ্ট হতে হবে। বিলাসিতাকে পরিহার করে সাদাসিধা জীবন যাপনে অভ্যস্ত হতে উম্মতকে নবীজি (সা) উপদেশ দিয়েছেন আর পরিশ্রমী হওয়াকে মুমিনের গুণ বলা হয়েছে।

‘সিয়াম’ পালনকারীগণ রাতে ক্লান্ত দেহে অতিরিক্ত ২০ রাকাত সালাত আদায় করতে হয় আবার শেষ রাতে তাহাজ্জুদ ও সেহেরির জন্য উঠতে হয়। অতিরিক্ত আরামের পথে সিয়াম বাধা হয়। শিক্ষা দেয় কঠোর পরিশ্রমী হতে। তাকওয়া অর্জনে সিয়াম সাধনার চেয়ে কার্যকর আর কোনো বিধান নেই। তাই কুরআন শরীফ তাকওয়ার উচ্চশিখরে আরোহণ করার জন্য সিয়ামকে বলছে মাধ্যম ও সিঁড়ি হিসেবে। যে সিয়াম মুত্তাকি তৈরির এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম সে সিয়াম হতে হবে অবশ্যই যথার্থ ও আল্লাহর পছন্দমত। রাসূল (সা) বলেন, উপবাস রোজা নয়।

قالَ قالَ ( صلعم ) كَمْ مِنْ صاءِمِ لَيْسِ لهُ مِنْ صِيامِه اِلاَّ الظَّمأُ وكِمْ قاءِمِ لَيْسِ لِهُ مِنْ قِيَمِه الاَّ شَهَرُ- (الدارمي)
নবীজি (সা) বলেন, “অনেক রোজাদার এমন রয়েছে যাদের রোজা শুধু উপবাসের যাতনা ছাড়া আর কিছুই নয়, আবার অনেক তাহাজ্জুদ গুজার ব্যক্তির রাত জাগরণ অনিদ্রার কষ্ট ছাড়া আর কিছু নেই।” (দারামী)

নবীজি (সা) আবার বলেন, “যে রোজাদারকে মিথ্যা কথা বলা ও পাপকর্ম থেকে তার সিয়াম বিরত রাখতে পারেনি তার শুধু খাদ্য ও পানীয় বর্জন করার উপবাস আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই।” (সহীহ বুখারী) (৬০৫৭) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৭৬৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১৭৭৯)

অতীত ইতিহাস অনুযায়ী রমজান যে শুধু উপবাস, সেহেরি ইফতার আর তারাবিহর আনুষ্ঠানিকতা নয়।

ইহা যে কায়েমি স্বার্থবাদী তাগুতি শক্তির বিরুদ্ধে মুসলমানদের রণহুঙ্কারে গর্জে ওঠার ও বিজয়ের মাস তা কি আমাদের জানা আছে? এ মাসে দান খয়রাত করলে, নফল ইবাদাত করলে অন্যান্য মাসের চেয়ে সত্তর গুণ বেশি সওয়াব আমরা জানি। কিন্তু এ মাসে যে কুফরি শক্তিকে পরাজিত, পরাভূত করে বদরের ময়দানে ইসলামের বিজয়ের ঝাণ্ডা উচ্চকিত হয়েছে তা কি জানি? আর জানলেও বা কী করার আছে আমাদের? এক মাস রোজা শেষে আমরা নতুন জামা, সেমাই, পায়েস, ফিরনি, ঈদের নামাজ, কোলাকুলি, গলাগলির মাধ্যমে ঈদের আনন্দ উপভোগ করবো। কিন্তু এ রোজার মাসেও ইহুদিদের মোকাবেলায় সিরিয়া-ফিলিস্তিনি মুসলমানদের জীবন দিতে হচ্ছে। ভারতীয় হায়েনাদের গুলির মুখে নিরস্ত্র কাশ্মিরিদের রক্ত দিতে হচ্ছে, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তরে মুসলমানেরা শহীদ হচ্ছে, আহত-নিহত হচ্ছে অগণিত বনি আদম। দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আপসহীন নেতৃত্ব দেয়ার অপরাধে যুগের জঘন্যতম মিথ্যাচার আর মানবতাবিরোধী নির্যাতনের কশাঘাতে কারাগারে নিষ্পেষিত-অবরুদ্ধ ইসলামী আন্দোলনের অকুতোভয় নেতৃত্ব। এমনকি আমরা যখন ঈদের নামাজ পড়ে আনন্দ উল্লাস করবো তখন তারা ঈদের দিনেও আপনজনকে হারিয়ে জানাজার নামাজ আদায় করে বুকফাটা আহাজারি আর চোখের অশ্রু সাগরে সাঁতরিয়ে আনন্দঘন মুহূর্তগুলো কাটাবে।

ইসলামে রোজার তিনটি উদ্দেশ্য নির্দেশ করা হয়েছে-
তাকওয়া, তাকবির ও শোকর। বান্দা রোজার মাধ্যমে তাকওয়ার গুণে ভূষিত হবে, ঐ তাকওয়ার বলিষ্ঠতা নিয়ে জাহেলিয়াতের সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করত বাতিল মতাদর্শের উত্তপ্ত উনুন দলিত মথিত করে বিশ্বব্যাপী আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করবে। আর মহান আল্লাহর নিয়ামতের শোকর আদায় করার জন্য তার নির্দেশ মেনে চলবে। কিন্তু আজ বিশ্ব মুসলমানগণ রোজার মূল উদ্দেশ্য হতে আত্মবিস্মৃত। রোজার তথাকথিত আধুনিকায়নে (?) তা উপবাসের ফ্যাশন, ইফতারিতে হরেক রকম আয়োজনই যেন তার মূল লক্ষ্য। ‘শাহরু রমাদান’ আজ যেন ‘শাহরুন নাওম’ বা নিদ্রার মাস এবং ‘শাহরুত তায়াম’ বা খাওয়া দাওয়ার মাস। রোজার নামে উপবাসের ফ্যাশন হিসেবে পুরাকালে কেল্ট, রোমান, আসিরীয় ও বেবিলনীয়দের মধ্যে রোজার প্রচলন ছিল। ইহুদি, খ্রিষ্টান, জরথুস্থ, কনফুসিয়াস, বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মেও রোজা বা উপবাসব্রত পালিত হয়। ভারতের হিন্দু ব্রাহ্মণরা একাদশীর দিন উপবাস ও কার্তিক মাসের প্রতি সোমবার রোজা রাখে। জৈন ধর্মাবলম্বীরা হিন্দু যোগীদের ন্যায় ৪০ দিন পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকত। ইহুদিরা হজরত মূসা (আ)-এর তুর পাহাড়ে ৪০ দিন পানাহার ছাড়া অতিবাহিত করাকে স্মরণ করে ৪০ দিন উপবাস থাকে। অতএব মুসলমানদের রোজা নিছক উপবাস নয়, নয় কোন আনুষ্ঠানিকতা। কুরআন নাজিলের মাস হিসেবে কুরআনি সমাজ বিনির্মাণের প্রশিক্ষণ তথা শপথ গ্রহণই এর মূল লক্ষ্য।

আল্লামা ইকবাল বলেছিলেন- “কাফের কি ইহ্ পহ্চান কি আফাক মে গুম হা, মুমিন কি ইহ্ পহ্চান কি গুম উসমে হায় আফাক” অর্থাৎ কাফেরের পরিচয় সে পৃথিবীর মধ্যে হারিয়ে যায়, আর মু’মিনের পরিচয় তার মধ্যে পৃথিবীই হারিয়ে যায়। রমজান মাস জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের, শোষণের বিরুদ্ধে শোষিতের, অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর, অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের বিজয়ের মাস। ইসলামের ইতিহাসে ১৭ রমজান ‘বদর দিবস’ অর্থাৎ এ রমজান মাসেই তাগুতের বিরুদ্ধে ইসলামের জয়-যাত্রার অভিষেক হয়। বদর প্রান্তরে এক হাজার রক্ত মাতাল আবু জেহেলের নেতৃত্বে চকচকে ধারালো তলোয়ার হাতে ক্ষুধিত ব্যাঘ্রের মত মুসলিম মুজাহিদদের রক্ত দিয়ে মনের আনন্দে স্নান করার জন্য একত্রিত হয়। আর বিশ্ব সমর সেনাপতি মাত্র তিনশত তের জন মুজাহিদ সংগঠিত করে রমজান মাসে যাদের না আছে সেহেরি-ইফতারের ব্যবস্থা, না আছে পর্যাপ্ত রণসামগ্রী। এতদসত্ত্বেও কাফেরগোষ্ঠীর অহমিকার হুঙ্কার তরবারির ঝনঝনানি ইসলাম নির্মূলের আস্ফালন নিমেষেই রহমতে বারি তা’য়ালার অপূর্ব শক্তি সাহস ও মনোবলের জোগানে স্তিমিত করে দেন।

বর্তমান মুসলিম মিল্লাত এক চরম ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। কেন আমাদের রক্ত নিয়ে হোলি খেলায় মেতে উঠেছে অমুসলিম বিশ্ব? আমাদের লাশ নিয়ে কেন ওদের আনন্দ উল্লাসের মিছিল? আসলে আজ আমরা ইসলামের মূল আদর্শচ্যুত হয়েছি। আমাদের হৃদয় থেকে উঠে গেছে ঈমানের সঠিক ¯পৃহা। আল্লাহর ইবাদাত নিরেট তাঁর গোলামির জন্য হয় না এখন তা আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম মুসলমানদের যথার্থ আত্মোপলব্ধি না থাকায় ক্ষোভে দুঃখে বলেছেন-

“যে বলে সে মুসলিম জিভ ধরে টান তার
বেঈমান জানে শুধু জানটা বাঁচানো তার
আনোয়ার ধিক্কার/কাঁধে ঝুলি ভিক্ষার
তলোয়ারে শুরু যার স্বাধীনতা শিক্ষার
যারা ছিল দুর্দম আজ তারা দিকদার।”

রোজা আসে রোজা যায় অথচ এ রোজাতেই ইসলামের বিজয় কেতন উড়িয়েছে বদরের ময়দানে শাহাদাতের অমিয় পেয়ালা পান করে কাফেরদের মোকাবেলায় চৌদ্দজন সাহসী মর্দে মুজাহিদ। তাই আজ আর জেগে জেগে ঘুমিয়ে দুস্যু তস্করকে খুশি রাখার সুযোগ নেই। ভয়ের কোন কারণ নেই বাতিলের রক্তচুকে। আর কতোই বা ভয় পাবো আমরা মুসলিম? ৮৭ ভাগ মুসলমানের দেশে সংবিধানে আল্লাহর ওপর আস্থা-বিশ্বাস কয়েকটি শব্দ পর্যন্ত সহ্য করেনি খোদাদ্রোহী শক্তি। বিসমিল্লাহ, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম আজ গুটিকয়েক মুশরিক-মুরতাদের কাছে ভিক্ষা চেতে হচ্ছে আমাদের। সুযোগ নেই রমজানে আপসহীন জিহাদে ভূমিকা রাখতে সম্পদ ও রক্তের নজরানা পেশের আতঙ্কে তসবিহ ও জায়নামাজকে নাজাতের শ্রেষ্ঠ অবলম্বন বানানোর। আফসোস করে তাই বলতে হয়-

‘‘শের কি সের পে বিল্লি খেল রহি / ক্যায়সা হায় মুসলমাঁ কা বদনসিব
শাহাদাত কি তামান্না মরগয়ি / তসবিহ কা দানো মে জান্নাত ঢুঁঢ রহি।”

অর্থাৎ ব্যাঘ্রের মাথায় বসে বিড়াল খেলা করছে, কি বদনসিব এ মুসলমানের? নিঃশেষ হয়েছে শাহাদাতের তামান্না, জান্নাত খুঁজে ফিরছে তসবিহর দানার মধ্যে। সুতরাং আজ প্রয়োজন গতানুগতিক উপবাসের অক্টোপাস থেকে বেরিয়ে মাহে রমজানের পূর্ণ মর্যাদা রক্ষার্থে খালিদ বিন ওয়ালিদ, উক্ববা ইবনে নাফে, তারেক বিন যিয়াদ, মুসা বিন নুসায়ির, মাহমুদ গজনবী, মুহাম্মদ বিন কাশিম, জওহার দুদায়েভ, আহমাদ শাহ আবদালী, আর সালাহ উদ্দিন আয়ুবী (রহ), সাইয়েদ কুতুব, হাসান আল বান্না, বদিউজ্জামান নুরসী, মাওলানা মওদূদী (র)-এর মতে বিশ্ব কাঁপানো শহীদ গাজীদের ন্যায় অসম সাহস নিয়ে বাতিলের তখতে তাউস গুঁড়িয়ে দিয়ে বাস্তব জিহাদে অবতীর্ণ হওয়া। তাহলেই মুক্তি পাবে মজলুম মানবতা। মুক্তি পাবে বিশ্ব মুসলমান। বিজয়ী হবে মুসলিম মিল্লাত।

খোদাহীনতা, অনৈতিকতা, দুর্নীতি, মানবতার ওপর জুলুম পৃথিবীকে যেন মানব বাসের অযোগ্য করে তুলেছে। সীমালংঘনের প্রকার ও বহু মাত্রিকতার উল্লাস দেখে সভ্যতা মানবিকতা আজ কোণঠাসা। সত্য ও সত্যের ধারকেরা মিথ্যার দাপটের নিকট আজ কম্পমান। সমস্ত পরাশক্তি ও তাদের দালালদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা, তাদের অঢেল অর্থ ও বৈভব আর অপরিমেয় মারণাস্ত্র অসহায় মুসলিম ও ইসলামের দিকে তাক করে রয়েছে। তাদের বোমার আগুনে মরছে অগণিত মুসলিম নারী ও শিশু, আগুনের লেলিহান শিখা পড়ে ভস্মীভূত করছে বিশ্বাসীদের জনপদ।

এ দৃশ্যপট পরিবর্তনের সময় আসন্ন বলে মনে হচ্ছে। মজলুমদের চোখের পানি আর ঘুরে দাঁড়ানোর বিশ্বব্যাপী প্রস্তুতি যেন আর একটি সুবহে সাদিকের সূচনা। এ সময়ে প্রয়োজন ‘তাকওয়ার’ হাতিয়ার যা আমাদের হৃদয় থেকে সৃষ্টির সমস্ত খাওফ বিদূরিত করে আল্লাহর ভয়কে গালেব করবে। যে ভয় দিয়ে সকল ভয়কে আমরা জয় করব। সে সিয়াম সাধনার মাস আমাদের দারে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের সওগাত নিয়ে উপস্থিত। এ পবিত্র মাহে রমজানে এক একটি মুহূর্ত সময়ও অনেক মূল্যবান। হাজার হাজার বছরের নফল ইবাদত একত্র করলেও একটি ফরজের সমান হবে না। কিন্তু এ মাসের একটি নফল ইবাদত একটি ফরজতুল্য সুবহানআল্লাহ।

রোজার ফজিলত
১. হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন, যে ঈমান ও সওয়াবের নিয়তে রমজানের রোজা রাখবে, আল্লাহ তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ করে দেবেন। (বুখারি ও মুসলিম)
২. রমজান মাস এলে জান্নাতের দরজা খুলে দেয়া হয়। (বুখারি ও মুসলিম)
৩. রমজান মাস এলে রহমতের দুয়ার খুলে দেয়া হয়। (বুখারি ও মুসলিম)
৪. রমজান সবরের মাস, আর সবরের পুরস্কার হলো জান্নাত। (বায়হাকি)
৫. রমজানের মোমিনের জীবিকা বৃদ্ধি করে দেয়া হয়। (বায়হাকি)
৬. যে ব্যক্তি রমজান মাসে কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে ঐ রোজাদারের পুরস্কারের কমতি হবে না। (বায়হাকি)
৭. রোজাদারের মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশকের সুঘ্রাণের চেয়েও উত্তম। (বুখারি ও মুসলিম)
৮. যে ব্যক্তি রমজান মাসে কোনো রোজাদারকে তৃপ্তি সহকারে আহার করাবেন; আল্লাহ তাকে হাউজে কাওসার থেকে পান করাবেন। এরপর জান্নাতে প্রবেশ পর্যন্ত সে আর তৃষ্ণার্ত হবে না। (বায়হাকি)
৯. জান্নাতে আটটি দরজা আছে। এর মধ্যে একটির নাম রাইয়ান। রোজাদারদের ছাড়া আর কেউ এই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। (বুখারি ও মুসলিম)
১০. রোজাদারদের জন্য দু’টি আনন্দের সময় একটি হলো ইফতারের সময় আর অপরটি তার প্রভুর সাথে সাক্ষাতের সময়। (বুখারি ও মুসলিম)
১১. রাসূলে করিম (সা) বলেছেন, আদম সন্তানের প্রত্যেকটি কাজ দশ থেকে সাতশত গুণ বৃদ্ধি করা হয়। কিন্তু আল্লাহ বলেন, রোজাকে এর মধ্যে গণ্য করা হবে না। কারণ রোজা খাস করে কেবল আমারই জন্য রাখা হয় আর আমিই এর প্রতিফল দেবো। (বুখারি ও মুসলিম)

ঈমান ও ইহতেসাবের সাথে পালন করতে হবে এক একটি রোজা। ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিতে হবে সকল পাপাচার থেকে। তারাবিহ ও তাহাজ্জুদ নিয়মিত আদায় করতে হবে। রহমতের মাসে সবচেয়ে বড় আল্লাহর অনুগ্রহ আল-কুরআন। অর্থসহ এক খতম কুরআন পড়ার সিদ্ধান্ত নিতে হবে সবাইকে এ মাসের মধ্যে। হাজার ব্যস্ততার পরও রাসূলুল্লাহ (সা) প্রতি রমজানে ইতিকাফ করেছেন। আসুন আমরা এ পবিত্র মাসে কঠিন এক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি । (আমিন)

Comments

comments