ফণা নামিয়ে ফণীর হানা: ১৪ প্রাণ ক্ষয়, বিপুল ফসলের সর্বনাশ, বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি

অনেকটা ফণা নামিয়ে আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড় ফণী। গতকাল ভোর ৬টায় ৬২ মিনিট থেকে ৮৮ কিলোমিটার গতিবেগে সাতক্ষীরা, যশোর, খুলনা অঞ্চলে আঘাত হানে ফণী। আগের দিন ফণীর আঘাতে ভারতের ওড়িশা রাজ্য লণ্ডভণ্ড হয়ে গেলেও বাংলাদেশে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে অনেক কম। শুক্রবার রাত থেকে গতকাল রাত পর্যন্ত ঝড়ে ঘর-গাছ চাপা ও পানিতে ডুবে সারাদেশে প্রাণহানি ঘটেছে ১৪ জনের। আগের দিন ফণীর প্রভাবে ঝড় বৃষ্টি চলাকালে বজ্রপাতে ৮ জনের মৃত্যু হয়। এদিকে সরকারিভাবে জানানো হয়েছে ফণীতে উপকূলীয় এলাকায় ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ৬৩ জন। বিধ্বস্ত হয়েছে বিভিন্ন এলাকার ঘরবাড়ি।

দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে গতকাল পর্যন্ত সারাদেশে নৌ যোগাযোগ বন্ধ ছিল। বিঘ্ন ঘটে বিমান চলাচলেও। তবে আজ থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সকালে আঘাত হানে ফণী। দুপুরের দিকে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল অতিক্রম করে। ফরিদপুর-ঢাকা অঞ্চল এবং এর পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে আরো উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর ও দুর্বল হয়ে স্থল গভীর নিম্নচাপ আকার ধারণ করে ফণী। সন্ধ্যার পর আরো দুর্বল হয়ে ময়মনসিংহ বিভাগের উপর দিয়ে ভারতের আসামের দিকে চলে যায়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ফণীর প্রভাবে গতকাল সরাদেশে ঝড়ো হাওয়া ও বৃষ্টিপাত হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলে বায়ুচাপের তারতম্যের আধিক্যের কারণে রোববারও বৃষ্টিপাত হবে। ফণীর প্রভাবে সাগর খুবই উত্তাল ছিল। তবে ফণী উপকূল অতিক্রম করায় মংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরকে ৭ নম্বর বিপদ সংকেত নামিয়ে তার পরিবর্তে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়। চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরকে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত নামিয়ে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে ঝোড়ো বাতাস বইছে। আন্ধারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঘর উড়ে গেছে। পড়ে গেছে পাশের চিংড়ি ঘেরে। মোংলা, বাগেরহাট, ৪ মে। ছবি: সুমেল সারাফাত

ফণীর গতিবিধি

গতকাল সকাল ৬টার দিকে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চল হয়ে উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হয় ফণী। সকাল ৯টার দিকে ফরিদপুর-ঢাকা অঞ্চলে অবস্থান করছিল। দুপুর দেড়টার দিকে ঘূর্ণিঝড়টি গভীর নিম্নচাপ আকারে অবস্থান করছিল টাঙ্গাইল, পাবনা ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে। গতকাল দুপুর ১২টায় আবহাওয়া দপ্তরের বিশেষ বুলেটিনে এসব তথ্য জানানো হয়। ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে সারা দেশে ঝড়-বৃষ্টি হয়, বয়ে যায় দমকা হাওয়া। উপকূলীয় এলাকায় নদ-নদীর পানি স্বাভাবিকের চেয়ে চার-পাঁচ ফুট উচ্চতায় প্রবাহিত হয়।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, গভীর নিম্নচাপের প্রভাবে দেশের আকাশ মেঘাচ্ছন্ন রয়েছে। দুপুরেও দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘণ্টায় ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে দমকা ও ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যাচ্ছিল।

আবহাওয়া কর্মকর্তা আফতাব উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা এলাকা দিয়ে ঘূর্ণিঝড় ফণী ভারতের আসামে চলে গেছে গতকাল রাতে। তবে ফণীর প্রভাবে আজ সারা দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি হবে। সমুদ্রে ৩ নম্বর এবং অভ্যন্তরীণ নদীগুলোতে ২ নম্বর দূরবর্তী হুঁশিয়ারি সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।

আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তারা বলছেন, এপ্রিল ও মে এই দুই মাস ঘূর্ণিঝড়ের সময়। প্রাক-বর্ষার আগে একাধিক ঘূর্ণিঝড় দেখা দেয় বঙ্গোপসাগরে। এখনো মে মাস পুরোটা রয়ে গেছে। তাই আরেকটি ঘূর্ণিঝড় হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অবশ্য সেই ঘূর্ণিঝড়ের নাম আগেই তৈরি রয়েছে। সেটির নাম দেওয়া হয়েছে বায়ু, যার নাম দিয়েছে ভারত। এর পরের দুটি ঘূর্ণিঝড়ের নাম হিক্কা ও কায়ার।

ঘূর্ণিঝড় ফণীর কারণে ৩ নম্বর পানখালি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানীয় লোকজন। দাকোপ, খুলনা,৪ মে। ছবি: সাদ্দাম হোসেন

প্রাণহানি :

ঘরের ওপর গাছ ভেঙে পড়ায় চাপা পড়ে ও পানিতে ডুবে গতকাল বরগুনায় দুই শিশুসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী ইউনিয়নের বাধাঘাটা গ্রামে শিশুসহ দুজন নিহত হয়। তারা হলো গ্রামের মৃত আব্দুল বারেকের স্ত্রী নুরজাহান বেগম (৬০) ও তাঁর নাতি জাহিদুল (৮)। এ ছাড়া শুক্রবার সন্ধ্যায় বরগুনার মাঝের চর থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথে উত্তর বিষখালী নদীতে ডুবে তরিকুল নামের এক শিশু নিহতের খবর পাওয়া গেছে। জেলায় অন্তত তিনজন আহত হয়েছে।

গতকাল সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার ভানুডাঙ্গা হাটে গাছে ডাল ভেঙে মাথায় পড়ে মারা গেছে ওই গ্রামের সাকার আলীর ছেলে ইসমাইল হোসেন (৫৫) ও তাঁর নাতনি বীথি আক্তার (৮)। আহত অবস্থায় দুজনকে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার পূর্ব বেতকা গ্রামে প্লাবনের পানিতে ডুবে মারা গেছে ওই গ্রামের সোহাগ খানের ছেলে মুরসালিন (৫)। লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার চর আলগী এলাকায় ঘর ভেঙে পড়ে মারা গেছেন আনোয়ারা খাতুন (৭৫) নামের এক নারী। তিনি মেয়ের বাড়ি বেড়াতে এসেছিলেন। আনোয়ারা একই উপজেলার চরপোড়াগাছা ইউনিয়নের পোড়াগাছা এলাকার মৃত শফিক উল্লাহর স্ত্রী। চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার কালুপুর এলাকায় বাড়ির পাশে জমে যাওয়া পানিতে ডুবে মারা গেছে গ্রামের সাইফুল ইসলামের ছেলে মোরসালিন (৩)। ঝালকাঠির রাজাপুরের নিজামিয়া গ্রামে পানিতে ডুবে সানিহা নামে দেড় বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সে উপজেলা সদরের মহিলা কলেজ এলাকার সৌদি আবরপ্রবাসী মো. শামিম খানের মেয়ে। খুলনা নগরের আলমনগর বাজারে দোকানে জমে থাকা পানি বিদ্যুতায়িত হওয়ায় এর স্পর্শে মারা গেছে সুজন হোসেন (১২) নামের এক স্কুলছাত্র। ভোলা সদর উপজেলার কোড়ালিয়া গ্রামে গাছচাপা পড়ে নিহত হয়েছেন রানী বেগম (৫০)। আহত হয়েছে অন্তত ১৫ জন। চাঁদপুরের কচুয়ায় দুজন আহত হয়েছে।

আগের দিন শুক্রবার মধ্যরাতে নোয়াখালীর সুবর্ণচরের চরওয়াপদা ইউনিয়নের চর আমিনুল হক গ্রামে ঘরচাপা পড়ে মারা গেছে ওই গ্রামের আবদুর রহমানের ছেলে ইসমাইল (২)। আহত হয়েছে আরো অন্তত ১০ জন। পটুয়াখালীর কুয়াকাটার লতাচাপলী এলাকার মো. হাবিব মুসুল্লী (৩৫) নামের এক মোটরসাইকেলচালক গাছচাপা পড়ে মারা গেছেন। একই রাতে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের গাইনবাড়ী আশ্রয় কেন্দ্রে বার্ধক্যজনিত কারণে আয়নামতি (৯২) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড় ফণীর আঘাতে লণ্ডভণ্ড ঘরবাড়ি। চর চান্দিয়া, জেলে পাড়া, সোনাগাজী, ফেনী, ৪ মে। ছবি: আমজাদ হোসাইন

প্রায় দুই হাজার বাড়িঘর বিধ্বস্ত

বরগুনার পাথরঘাটায় ঘূর্ণিঝড় ফণীর আঘাতে ৯০০ বসতঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নাসরিন সুলতানা কালের কণ্ঠকে জানান, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী ৮০৫টি ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৮৩টি সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জেলায় সাড়ে আট হাজার ঘরবাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলায় দুই শতাধিক কাঁচা, টিনশেড ও আধাপাকা ঘর ভেঙে গেছে। নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ইকবাল হাসান জানান, চরওয়াপদা ও চরজব্বর ইউনিয়নে শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক মো. মতিউল ইসলাম চৌধুরী জানান, জেলার আট উপজেলায় দুই হাজার ৯২টি ঘরবাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে কলাপাড়ায় ৪৬টি বসতঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪৮৭টি। দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চাঁদপুর সদরের মেঘনার দুর্গম চর রাজরাজেশ্বর, হানারচর, হাইমচরের গাজীপুর ও মাঝেরচর, হাজীগঞ্জের গন্ধর্বপুর, মতলব উত্তর উজেলার বোরোরচরের প্রায় দুই শতাধিক কাঁচা ঘর ও আধাকাঁচা বসতবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। হাজীগঞ্জের দেশগাঁও কলেজের টিনের চালা উড়ে গেছে। কচুয়ায় ৪০টি ঘরবাড়ি লণ্ডভণ্ড হয়েছে। কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে আটটি দোকানঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার জাহাপুর ও সদরের ইশান গোপালপুর ইউনিয়নে ২৮টি ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। বরিশালে এক হাজার ১৫টি কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে বিধ্বস্ত হয়েছে অন্তত ৫০টি বাড়িঘর।

বাঁধ ভেঙে শতাধিক গ্রাম প্লাবিত, ফসলের ক্ষতি : বরগুনায় বেড়িবাঁধ ভাঙার খবর পাওয়া যায়নি। তবে ঝড়-বৃষ্টিতে ৪৫ হেক্টর জমির ফসল আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাথরঘাটা উপকূলীয় এলাকায় শত শত গাছপালা ভেঙে গেছে। গতকাল দুপুর ২টা পর্যন্ত প্রায় ২৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রয়েছে উপজেলায়।

বগুড়ার ধুনট উপজেলায় ঝড়ের কবলে বিভিন্ন স্থানে গাছের ডালপালা ভেঙে পড়েছে। উপজেলার প্রায় ১০ হেক্টর জমির পাকা বোরো ধান মাটিতে হেলে পড়েছে। লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার চররুহিতাসহ বিভিন্ন এলাকায় কয়েকটি গাছ উপড়ে ও ভেঙে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে জেলা শহরের প্রেস ক্লাব সড়ক, ক্লাব সুপার মার্কেট, নিউ মার্কেট, ভেলুর মোড়, বালুবাগানসহ বিভিন্ন উপজেলায় ব্যাপক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।

খুলনার প্রায় সব নদ-নদীর জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে গড়ে চার ফুট উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে জেলার দাকোপের বানিশান্তা ও কয়রা উপজেলা সদরের গোবরা ও দশহালিয়া এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে ভাঙন দেখা দেয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কয়রা উপজেলার উপসহকারী প্রকৌশলী সেলিম আবেদ জানান, কমপক্ষে ২০টি স্থানের বেডিবাঁধ বেশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। পাউবো-২ (দাকোপ, পাইকগাছা ও কয়রা একাংশ) নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জি বলেন, দাকোপের বানিশান্তা এলাকায় ভাঙনের পানি আটকানো গেছে।

পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক মতিউল ইসলাম চৌধুরী জানান, পটুয়াখালীর আট উপজেলায় ছয় হাজার ১৮ একর ফসলের ক্ষতি হয়েছে। ১৭৫টি গবাদি পশুর ক্ষতি হয়েছে। ১০ কিলোমিটার বাঁধের ক্ষতি হয়েছে। তিন হাজার ১২৫টি গাছপালা ভেঙে গেছে। ৫০টি মাছের ঘেরের ক্ষতি হয়েছে। ভোলার মনপুরা উপজেলায় বেড়িবাঁধ ভেঙে ঈশ্বরগঞ্জ ইউনিয়ন, হাজিরহাট ইউনিয়নের সোনাচর, দাসের হাট ও কলাতলী চরের নিম্নাঞ্চল, চরনিজামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। চরনিজামে স্বাভাবিকের চেয়ে দু-তিন ফুট পানি বেশি ওঠায় শতাধিক ভেড়া মারা গেছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদ আলম ছিদ্দিক জানিয়েছেন, এক হাজার ৪৩৭ হেক্টর জমির বোরো ও অন্যান্য ফসল নষ্ট হয়েছে। চরফ্যাশন উপজেলা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ঢালচর ইউপি সদস্য আবদুস সালাম হাওলাদার বলেন, জোয়ারের পানিতে ৪১টি পুকুর ও একটি ঘেরের মাছ তলিয়ে গেছে। আড়াই হাজারের মতো বিভিন্ন ধরনের গাছগাছালি তছনছ করে দিয়ে গেছে। চাঁদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঝোড়ো বাতাসের কারণে পাকা বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

পাকা ধান ঘরে তোলা সম্ভব হয়নি। বৃষ্টিতে ধানগাছ নুয়ে পড়েছে। তাই নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন এই কৃষক। মঘি, মাগুরা, ৪ মে।ছবি: কাজী আশিক রহমান

ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া ও রাজাপুরে বিষখালী নদীর বেড়িবাঁধের বিভিন্ন স্থান ভেঙে অন্তত ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এসব গ্রামে পানি ঢুকে কাঁচা বাড়িঘর, বীজতলা ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ভেসে গেছে পুকুর ও ঘেরের মাছ। পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গতকাল সকাল থেকে সুগন্ধা ও বিষখালী নদীতে স্বাভাবিকের চেয়ে তিন-চার ফুট পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। কক্সবাজারে সামুদ্রিক জোয়ারের পানি গতকাল স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক ফুট বৃদ্ধি পায়। এতে করে কুতুবদিয়া ও মহেশখালী দ্বীপের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ায় দ্বীপ দুটির বিস্তীর্ণ মাঠে লবণ চাষ বন্ধ হয়ে গেছে। কুতুবদিয়া দ্বীপের ৪০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধর মধ্যে ১৪ কিলোমিটার ভাঙন বাঁধ এলাকার অন্তত ২০টি পয়েন্ট দিয়ে জোয়ারের নোনা পানি ঢুকে পড়ে। এতে তলিয়ে যায় এসব এলাকার নিম্নাঞ্চলের কয়েক শ বাড়িঘর। মহেশখালী দ্বীপের সাগর পারের ধলঘাটার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামরুল হাসান জানান, শুক্রবার এলাকাবাসী সম্মিলিতভাবে বেড়িবাঁধের দুটি ভাঙন এলাকা নিজেরাই মাটি দিয়ে বেঁধে জোয়ারের পানি ঠেকিয়ে দেয়। কিন্তু গতকাল বাঁধের আরো কয়েকটি ভাঙা স্থান দিয়ে পানি ঢুকে পড়ে। এতে ইউনিয়নটির কিছু লবণ মাঠ প্লাবিত হয়ে সাময়িক উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এলাকায় বড় একটি গাছ ভেঙে পড়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এতে করে এক হাজার ৩১৩ শয্যার এ হাসপাতাল ও পরমাণু চিকিৎসাকেন্দ্র পুরোপুরি বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়ে। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের বারোআউলিয়া ও সরেঙ্গায় খোলা বেড়িবাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকে এলাকার পুকুর ভেসে গেছে। প্লাবিত হয়েছে বসতবাড়ি। সরেঙ্গা এলাকায় ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে। বারোআউলিয়া এলাকায় সাতটি দোকান জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে। জেলার সন্দ্বীপে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নতুন বাঁধ ভেঙে সারিকাইত ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ডের কিছু অংশ প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বাঁধ এলাকায় থাকা কয়েকটি কাঁচা ঘর-বাড়ি ভেসে গেছে।

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার লালুয়া ইউনিয়নের চাড়িপাড়া গ্রামসহ আশপাশের বিধ্বস্ত বেড়িবাঁধ এলাকা দিয়ে রাবনাবাদ নদের অস্বাভাবিক জোয়ারের পানি প্রবেশ করে চারিপাড়া, পশরবুনিয়া, বড়পাঁচনং, ছোটপাঁচনংসহ ১৬টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দুই কিলোমিটার বেড়িবাঁধ আংশিক বিধ্বস্ত হয়েছে। উপজেলায় প্রায় ৬৫৮ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে কৃষি বিভাগ।

বরিশালে বিস্তীর্ণ এলাকার ৯ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নগরীর বঙ্গবন্ধু কলোনিসংলগ্ন শহররক্ষা বাঁধ ও উজিরপুর উপজেলার সাতলা-বাগদা বাঁধে ফাটল দেখা দিয়েছে। জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়ার রহমান জানান, ফণীর আঘাতে বড় ধরনের তেমন ক্ষতি না হলেও শুক্রবার রাতে উজিরপুর উপজেলার সাতলা-বাগদা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের শিবপুর এলাকায় এবং নগরীর বঙ্গবন্ধু কলোনিসংলগ্ন কীর্তনখোলা নদীর শহর রক্ষা বাঁধে ফাটল দেখা দেয়। তবে জিও ব্যাগ ফেলে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

সাতক্ষীরার শ্যামনগরে দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরা, পদ্মপুকুর ও মুন্সীগঞ্জে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বাঁধে ভয়াবহ ভাঙন ধরেছে। গাবুরা গ্রামে বাঁধের দুই কিলোমিটার অংশ নদীতে ভেসে গেছে। পদ্মপুকুর ইউপি চেয়ারম্যান আতাউর রহমান জানান, ইউনিয়নের কামালকাটি হাবলী থেকে স্লুইস গেট পর্যন্ত খোল পেটুয়া নদীতে ধসে গেছে। এ ছাড়া খুটিকাটা থেকে চাউলখোলা পর্যন্ত পাউবো বেড়িবাঁধ অতিঝুঁকিপূর্ণ।

মুন্সীগঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কাশেম মোড়ল জানান, ইউনিয়নের বড় ভেটখালী মোস্তফা সরদারের বাড়ির সামনে ৫০০ ফুট বাঁধ মীরগাং নদীতে ধসে গেছে। শরণখোলায় বলেশ্বর নদের বেড়িবাঁধের দুটি স্থান ভেঙে বগী, দক্ষিণ সাউথখালী ও চালতেবুনিয়া গ্রামে পানি ঢুকে পড়ে। আগের দিন শুক্রবার সকালে বগী এলাকায় বাঁধের দুটি স্থানে ভাঙনের কারণে গ্রামটি প্লাবিত হয়। বগী থেকে গাবতলা পর্যন্ত দুই কিলোমিটার বাঁধের প্রায় ১৫০ মিটার ভেঙে গেছে। রামপালেও গাছপালা ও কাঁচা ঘর-বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। পিরোজপুরের ইন্দুরকানী উপজেলায় বলেশ্বর, কচা ও পানগুচি নদীর জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে ১০টি গ্রাম।

এ ছাড়া যশোরের কেশবপুরে ফসলের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। রাজশাহীতে গতকাল দুপুর পর্যন্ত প্রায় ২৪ ঘণ্টা টানা বৃষ্টি হয়েছে। কিছুটা ক্ষতি হয়েছে পাকা ধানের। কুড়িগ্রামের ঝড়ের কারণে অনেক এলাকায় গাছপালা ভেঙে পড়েছে। জেলার নিচু এলাকার কিছু সবজি ও ধানক্ষেত নিমজ্জিত হয়েছে। মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার আধারা ইউনিয়নের কালীরচর গ্রামে ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে প্রায় ৩০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

নৌযান ও ফেরি চলাচল ব্যাহত : ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে পদ্মা উত্তাল শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি নৌরুটে অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। শুক্রবার রাত থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয় ফেরিসহ সব নৌযান চলাচল। নৌযান চলাচল বন্ধ থাকায় উভয় পারে ছয় শতাধিক যানবাহন আটকা পড়ে। অন্যদিকে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ও রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া রুটে ফেরি চলাচল বন্ধ রেখেছে ঘাট কর্তৃপক্ষ। বিআইডাব্লিটিএর বরিশালের বন্দর কর্মকর্তা ও নৌ নিরাপত্তা বিভাগের উপপরিচালক আজমল হুদা মিঠু জানান, ঘূর্ণিঝড় ফণীর সতর্কবার্তা পাওয়ার পর থেকে ঢাকা-বরিশাল নৌরুটসহ অভ্যন্তরীণ সব রুটের নৌ ও ফেরি চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। চাঁদপুরেও নৌ যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে।

Comments

comments