মুক্তি পেতে খালেদার চাই চার মামলায় জামিন

কারামুক্তির জন্য বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে চারটি মামলায় জামিন পেতে হবে। এর মধ্যে বিচারিক আদালতে দুটি ও উচ্চ আদালত থেকে দুটি মামলায় তাকে জামিন নিতে হবে বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবীরা। এদিকে খালেদা জিয়ার জামিন নিয়ে হতাশা বাড়ছে তার আইনজীবীদের। তারা বলছেন, এক্ষেত্রে মামলার শুনানির চেয়ে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছাই বেশি জরুরি।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতে খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হয়। এরপর তাকে রাখা হয় রাজধানীর নাজিম উদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে। এ মামলায় আপিল শুনানির পর গত ৩০ অক্টোবর তার সাজা বাড়িয়ে ১০ বছর করে হাইকোর্ট। এর মধ্যে এ মামলায় দণ্ড থেকে খালাস ও জামিন চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করেছেন খালেদা জিয়া। এদিকে গত বছরের ২৯ অক্টোবর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসনকে ৭ বছর কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেয় ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালত। পরে দণ্ড থেকে খালাস ও জামিন চেয়ে হাইকোর্টে আপিল করেন তিনি। এ দুটি মামলাতেই তার আপিল শুনানির অপেক্ষায়।

এদিকে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের দুটি মামলায় বিচারিক আদালতে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি আছে। কারামুক্তি পেতে এই চারটি মামলাতে বিএনপি চেয়ারপারসনকে জামিন নিতে হবে বলে জানান তার আইনজীবীরা।

আইনজীবীরা আরও জানান, এই চারটিসহ বিএনপি চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে হত্যা, নাশকতা, দুর্নীতি, রাষ্ট্রদ্রোহ, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, মানহানিসহ বিভিন্ন অভিযোগে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় অন্তত ৩৭টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে হত্যার তিনটি, নাশকতার ১৬টি ও মানহানির চারটি মামলা রয়েছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশে নাশকতার ১০টির বেশিসহ অন্তত ২০টি মামলার বিচারকাজ স্থগিত রয়েছে। এ ছাড়া দুদকের দায়ের করা নাইকো, গ্যাটকো ও বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতি মামলাসহ ১৩টি মামলা বিচারাধীন। তবে বেশিরভাগ মামলাতেই জামিনে রয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন।

খালেদার আইনজীবীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে কটূক্তির মামলায় গত ৩০ এপ্রিল বিএনপি চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা-সংক্রান্ত তামিল প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল। ওইদিন প্রতিবেদন দাখিল না হওয়ায় ৩০ মে নতুন দিন ঠিক করেন ঢাকার সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালত। আর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের মামলায় গত ১৯ জানুয়ারি খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে ঢাকার একটি আদালত। বিচারিক আদালতে তার অন্যতম আইনজীবী জয়নাল আবেদিন মেজবা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ দুটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হলেও পরোয়না-সংক্রান্ত তামিল প্রতিবেদন পুলিশ এখন পর্যন্ত দাখিল করেনি। মনে হচ্ছে কৌশলগত কারণেই এটি করেনি। এ দুটি মামলায় খালেদা জিয়াকে জামিন পেতে হবে।’

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় দণ্ড থেকে খালাস চেয়ে খালেদা জিয়ার করা আপিল গত ৩০ এপ্রিল হাইকোর্ট গ্রহণ করে এবং বিচারিক আদালতের দেওয়া অর্থদণ্ড স্থগিত করে। একই দিন তার জামিনের জন্য জোরালো আবেদন করেন আইনজীবীরা। তবে বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ বিষয়ে শুনানি গ্রহণ না করে বিচারিক আদালতের নথি আদেশের দুই মাসের মধ্যে তলব করে। এরপর জামিন প্রশ্নে শুনানি হবে বলে আইনজীবীদের জানায় আদালত।

সম্প্রতি একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে নির্বাচিত ছয় সংসদ সদস্যের মধ্যে পাঁচজন শপথ নেওয়ার পর খালেদা জিয়ার জামিনের বিষয়ে শুরু হয় জোর আলোচনা। এরপর গত ৩০ এপ্রিল চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় জামিন না হওয়ায় হতাশা ঝরেছে তার আইনজীবীদের কণ্ঠে।

জ্যেষ্ঠ এক আইনজীবী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাত বছরের সাজার ক্ষেত্রে হাইকোর্ট সাধারণত জামিন দেয়। আমরা ওইদিন জামিনের ব্যাপারে খুবই আশাবাদী ছিলাম। কিন্তু হাইকোর্ট এ মামলার নথি চেয়েছে, যা সাধারণত দেখা যায় না। নথি তলবের জন্য দুই মাস সময় দিয়েছে আদালত। এর মানে নথি জমা না দেওয়া পর্যন্ত আমরা জামিন শুনানি করতে পারছি না, যা আমাদের জন্য হতাশার। বিচারিক আদালত এমনিতেই রেকর্ড দিতে দেরি করে। আর এটি রাজনৈতিক মামলা। এখন কত দিনে রেকর্ড মিলবে সেই অপেক্ষায় থাকতে হবে।’

ওই আইনজীবী ক্ষোভের সঙ্গে আরও বলেন, ‘দুটি মামলাতেই নানা অজুহাতে আমাদের আইনজীবীরা সময় নিয়েছেন। কিন্তু লাভটা কী হলো? আমাদের আইনজীবীদের একটি অংশ যতই বলুক আইনি লড়াইয়ে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা হবে, কিন্তু সেটি সহজে হবে বলে মনে হয় না। সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এটি সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।’

আইনজীবীরা বলছেন, চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় দ্রুত আপিল শুনানির স্বার্থে নথি তলবে হাইকোর্টে দেওয়া সময়ের অনেক আগেই তারা তা সংগ্রহ করে জমা দেবেন। খালেদা জিয়ার অন্যতম আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘বিচারিক আদালত থেকে এমনিতেই রেকর্ড পাঠাতে দেরি করে। এখানে সরকার যদি হস্তক্ষেপ করে তাহলে নথি পেতে সময় লাগবে। এখন নথিপ্রাপ্তি সাপেক্ষে এ মামলায় জামিনের শুনানি হবে। তবে আমরা দ্রুত রেকর্ড সংগ্রহের চেষ্টা করব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি বারবারই বলে আসছি খালেদা জিয়ার মামলাগুলো রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক। যে যাই বলুক এখন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেই তার কারামুক্তি হতে পারে।’ তার অন্যতম আরেক আইনজীবী অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন দাবি করেন, ‘ওইদিন (৩০ এপ্রিল) হাইকোর্টে জামিন না হওয়ায় আমরা হতাশ নই। দ্রুত নথি সংগ্রহ করে আমরা আপিল শুনানির উদ্যোগ নেব।’

এদিকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় গত ১৪ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল ও জামিনের আবেদন করেন খালেদা জিয়া। অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব বলেন, ‘আপিল বিভাগে এ মামলার শুনানি কবে হবে সে বিষয়ে এখনো কিছু জানি না। রাষ্ট্রপক্ষ চাইলে যেকোনো সময় শুনানি হতে পারে।’

এদিকে গতকাল সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম আয়োজিত আলোচনা সভায় খালেদা জিয়ার অন্যতম আইনজীবী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘যদি আইনকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে চলতে দেওয়া হতো এবং সেটির প্রয়োগ হতো তাহলে খালেদা জিয়া অনেক আগেই মুক্তি পেতেন।’

Comments

comments