বিশ্বকাপে স্বপ্নযাত্রা

স্পষ্ট মনে আছে তার- সেদিন খেলা দেখতে দেখতেই বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল। টেলিভিশনে তাই দেখা হয়নি বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারানো বাংলাদেশের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি। শুধু রেডিওতে একটি চিৎকার শুনেই নড়াইলের রাস্তায় বন্ধুদের নিয়ে মিছিল বের করেছিলেন।

আজ কুড়ি বছর পর… সেই কিশোর মাশরাফি বিন মুর্তজার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ দল ষষ্ঠবারের মতো আরও একটি বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছে সেই ইংল্যান্ডে। টাইগারদের স্বপ্নযাত্রায় তিনিই যে সারথি। এবার তার খেলা দেখেই হয়তো তুমুল আবেগের স্রোত নিয়ে মিছিল বের করবে কোনো কিশোরের দল। রোজার মধ্যে তাদের জন্যই প্রার্থনা করবে বাংলাদেশ, টাইগারদের জয়ে চাঁদ ওঠার আগেই হয়তো ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে পড়বে ষোলো কোটি প্রাণে।

গতকাল মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে দোয়া নিয়ে চোখে বিশ্বজয়ের স্বপ্নিল ভাবনা সঙ্গী করে আজ বিশ্বকাপযাত্রায় রওনা হচ্ছে টাইগাররা। ঢাকা-দুবাই-ডাবলিন- আপাতত আয়ারল্যান্ডেই যাবে টাইগাররা। সকাল সাড়ে ১০টায় এমিরেটসের একটি ফ্লাইটে দেশ ছাড়ছে তারা। তবে গত রাতেই কাতার এয়ারওয়েজের একটি বিমান ধরে আয়ারল্যান্ড রওনা দিয়েছেন ফরহাদ রেজা। বিশ্বকাপ স্কোয়াডের পনেরো জনের বাইরে আয়ারল্যান্ড সফরে থাকা আরও চার ক্রিকেটার যাচ্ছেন এই বহরে। ডাবলিনে স্বাগতিক আয়ারল্যান্ড আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তিন জাতি ওয়ানডে টুর্নামেন্ট খেলার পর ইংল্যান্ডে রওনা দেবেন সাকিবরা। প্রায় আড়াই মাস বাড়ির বাইরে, ব্যাগভর্তি জামা-কাপড় গুছিয়েই আজ বিমানে উঠছেন সবাই। তাই গতকাল বেশ ব্যস্ততার মধ্যেই সময় কেটেছে টাইগারদের।

দুপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে গণভবনে গিয়েছিলেন টাইগাররা। প্রায় আড়াই ঘণ্টা দারুণ সময় কাটিয়েছেন তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। দুপুরের খাবারও একসঙ্গেই খেয়েছেন তারা। মাতৃস্নেহে তিনি মাশরাফি-সাকিব-তামিমদের কাছে টেনে নেন। এবারের স্কোয়াডে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলা ক্রিকেটার রয়েছেন সাতজন। তবে মাশরাফি, মুশফিক, তামিম আর সাকিবের মতো অভিজ্ঞরাও রয়েছেন দলটিতে, যারা কি-না এবার চতুর্থ বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন। সব মিলিয়ে তারুণ্য আর অভিজ্ঞতার মিশেলে বেশ ব্যালান্সড দল বাংলাদেশ। তবে এবারের বিশ্বকাপের ফরম্যাট যেহেতু ভিন্ন, অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দলের বিপক্ষেই ম্যাচ খেলতে হবে। তাই সেমিফাইনালে যাওয়াটা বেশ চ্যালেঞ্জিং মনে করেন কোচ স্টিভ রোডস। নয়টির মধ্যে অন্তত ছয়টি ম্যাচ জিততে পারলে তবেই সেমিতে ওঠা সম্ভব। যেটা কঠিন হলেও ‘অসম্ভব নয়’ বলে মনে করছেন মাশরাফি।

নিজের শেষ বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার আগে দর্শকদের উদ্দেশে তার একটাই প্রতিশ্রুতি, ‘আমরা সামর্থ্যের সবটুকু উজাড় করে দিয়েই খেলব। আমাদের প্রতি বিশ্বাস হারাবেন না।’ বিশ্বকাপের আগে ৫ মে শুরু হওয়া আয়ারল্যান্ডের ত্রিদেশীয় সিরিজটিকেই বেশ গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে টাইগাররা। চোটের কারণে এ টুর্নামেন্টে হয়তো বিশ্বকাপ স্কোয়াডের পেসারদের কাউকে কাউকে খেলানো হবে না। কেননা, টুর্নামেন্টটির ফাইনাল খেলার সুযোগ এলে আগামী দেড় মাসে অন্তত ১৬টি ওয়ানডে খেলতে হবে টাইগারদের। টানা এতগুলো ম্যাচ খেলার ধকল যাতে ইনজুরির কারণ না হয়ে যায়, তাই বিশ্বকাপের আগে বেশ সতর্ক টিম ম্যানেজমেন্ট।

৭ মে ডাবলিনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে টাইগারদের তিন জাতি সিরিজ। আয়ারল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ- দুই প্রতিপক্ষের সঙ্গে দুটি করে ম্যাচ রয়েছে বাংলাদেশের।

১৭ মে ওই টুর্নামেন্টের ফাইনাল। এরপর পাঁচ দিনের ছুটিতে মাশরাফি ফিরে আসবেন দেশে আর তামিম যাবেন দুবাইয়ে। বাকিরা সবাই ডাবলিন থেকেই লন্ডন রওনা দেবেন। লেস্টারশায়ারে পাঁচ দিনের ক্যাম্প সেরে কার্ডিফে পাকিস্তানের বিপক্ষে বিশ্বকাপের প্রথম প্রস্তুতি ম্যাচ খেলতে নামবে টাইগাররা ২৬ মে। এরপর একই ভেন্যুতে ভারতের সঙ্গে ২৮ মে দ্বিতীয় প্রস্তুতি ম্যাচ রয়েছে বাংলাদেশের। ৩০ মে বিশ্বকাপের ১২তম আসর শুরু হলেও টাইগাররা প্রথম ম্যাচ খেলতে নামবে ২ জুন দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে।

ইংল্যান্ডের কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য এবারে হাতে বেশ সময় পাচ্ছেন মাশরাফিরা। তা ছাড়া শেষ মুহূর্তে জাসি বদল করা ছাড়া তেমন কোনো বিতর্কও সঙ্গী হচ্ছে না তাদের। তাই সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ স্বপ্নযাত্রায় ষোলো কোটির আবেগ আর ভালোবাসা নিয়ে বেশ গোছানো একটি দলই যাচ্ছে রানীর দেশ ইংল্যান্ডে।

Comments

comments