আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে ধসের আশঙ্কা

  • ভারতীয় কাস্টমসের নতুন নির্দেশ : পেট্রাপোল বন্দর দিয়ে বাংলাদেশে পণ্য আমদানি-রফতানিতে প্রতিটি ট্রাকের পণ্য নামিয়ে পরীক্ষা করা হবে

ভারতীয় কাস্টমস কর্তৃপক্ষের এক নির্দেশনার কারণে বেনাপোল-পেট্রাপোল বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। ভারতের কলকাতার চিফ কাস্টমস কমিশনার স্বাক্ষরিত এক আদেশে বলা হয়, এখন থেকে ভারত থেকে যত পণ্য বাংলাদেশে রফতানি হবে তার প্রতিটি পণ্যের চালান পেট্রাপোল বন্দর এলাকায় ট্রাক থেকে নামিয়ে শতভাগ কায়িক পরীক্ষা করেই রফতানির অনুমতি দেবেন কাস্টমস কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে যেসব পণ্য ভারতে রফতানি হবে সেগুলোর প্রতিটি পণ্য ট্রাক থেকে নামিয়ে কায়িক পরীক্ষা করে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হবে।

এ বিষয়ে বেনাপোল কাস্টমসের সহকারী কমিশনার আকরাম হোসেন জানান, এ বিষয়ে ভারতীয় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ তাদের কোনো চিঠি দেয়নি। তবে ব্যবসায়ী ও চালকদের কাছ থেকে বিষয়টি শুনেছি। এ নিয়ম চালুর ফলে বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এর ফলে ভারত থেকে পণ্য আমদানি এবং বাংলাদেশ থেকে ভারতে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে বাড়তি সময় লাগবে। একই সঙ্গে পণ্য খুলে পরীক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ করে রাসায়নিক, খাদ্যপণ্যের গুণগত মান নষ্ট হবে। এসব মিলে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হবে। এছাড়া আসন্ন রমজান উপলক্ষে ভারত থেকে যেসব পণ্য আমদানি হবে সেগুলোও খালাস হয়ে দেশের বাজারে আসতে সময় বেশি লাগবে। এতে পণ্য সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হবে। ব্যবসায়ীরা বলেছেন, এ বিষয়ে অবিলম্বে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমস্যার সমাধান না করলে বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্য যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তেমনি পণ্য আমদানিও বাধাগ্রস্ত হবে। এতে দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজার ও শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সূত্র জানায়, দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোল দিয়ে প্রতিদিন ৫-৬শ’ ট্রাক বোঝাই পণ্য আমদানি হয় ভারত থেকে। বেনাপোল বন্দর দিয়ে গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজসহ বিভিন্ন শিল্পকলকারখানার শতকরা ৮০ ভাগ কাঁচামাল আমদানি হয়ে থাকে। এছাড়া ভোগ্যপণ্যও আমদানি হচ্ছে। দেশ থেকে বিভিন্নœ পণ্য রফতানিও হচ্ছে এ বন্দর দিয়ে।

ভারতীয় কাস্টমস কর্তৃপক্ষের হঠাৎ করে এ ধরনের নির্দেশনায় আমদানি বাণিজ্য অর্ধেকে নেমে আসবে বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের। কেননা বর্তমানে প্রতিটি ট্রাক তারা পরীক্ষা করে। এখন প্রতিটি ট্রাকের সব পণ্য পরীক্ষা করা হবে নামিয়ে। প্রতিদিন ৫-৬শ’ ট্রাকের পণ্য নামিয়ে পরীক্ষা করা একেবারেই অসম্ভব। ফলে আমদানি-রফতানির অপেক্ষায় ট্রাকের জট লাগবে বন্দরে।

এদিকে বর্তমানে ভারতের পেট্রাপোল বন্দর ও কালিতলা পার্কিংয়ে ৫ হাজার পণ্য বোঝাই ট্রাক আটকে আছে। পরীক্ষা সম্পন্ন হয়নি বলে এগুলো ছাড় পাচ্ছে না। এতে সরকারের রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারতের পেট্রাপোল বন্দর এলাকায় বিভিন্ন অব্যবস্থাপনায় এমনিতেই একটি পণ্য চালান ভারত থেকে আমদানি হয়ে বেনাপোল বন্দর পর্যন্ত আসতে ১৫ দিন সময় লেগে যায়। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া পেট্রাপোল বন্দরে এবার পণ্য চালান শতভাগ পরীক্ষাতে এ ভোগান্তি আরও বহুগুণ বাড়বে। এতে পণ্য খালাস একদিকে যেমন কঠিন হয়ে পড়বে তেমনি আমদানি খরচও বেড়ে যাবে। যার প্রভাব পড়বে দেশীয় বাজারে। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জরুরি পদক্ষেপ নেয়ার দাবি করেছে ব্যবসায়ীরা।

বেনাপোল কাস্টমস বলেছে, অফিসিয়ালি তারা এখন পর্যন্ত কোনো চিঠি হাতে পাননি। তবে এ নিয়ম চালু হলে আমদানি বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। ভারতের পেট্রাপোল বন্দরের স্টাফ অ্যাসোশিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কার্তিক চন্দ্র জানান, কাস্টমসের এ আদেশে দু’দেশের বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে পচনশীল পণ্য চালান রফতানি কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

ভারত-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের ল্যান্ডপোর্ট সাব-কমিটির চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান জানান, ভারতীয় পেট্রাপোল কাস্টমস সহ-কমিশনারের স্বাক্ষরিত একটি আদেশ পাওয়া মাত্রই বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার, সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনসহ বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি দফতরে অবহিত করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এখনই না বসলে এ বন্দর দিয়ে বাণিজ্য মুখ থুবড়ে পড়বে বলে জানান তিনি। বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের সঙ্গে প্রতি বছর ৩০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য সম্পাদন হয়ে থাকে। এ বন্দর থেকে প্রতি বছর সরকার প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে।

চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা। জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত গত ৬ মাসের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে আদায় হয়েছে মাত্র ২ হাজার ৪৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। ঘাটতি রয়েছে ৬০৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা।

Comments

comments