আইনের দুর্বলতায় পার পেয়ে যাচ্ছে ধর্ষণের আসামীরা

বাংলাদেশে আইনে দুর্বলতার কারণে ধর্ষণের মামলায় অনেক অভিযুক্ত পার পেয়ে যাচ্ছে বলে মানবাধিকার কর্মীদের অভিযোগ। তারা বলছেন – আইনের মধ্যে এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলো ধর্ষিতার বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

বেসরকারি সংস্থা নারীপক্ষ বলছে, তারা এক গবেষণার অংশ হিসাবে ২০১১ সাল থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত ছয়টি জেলায় ধর্ষণের মামলা পর্যবেক্ষণ করেছে। এ গবেষণাটির পরিচালক এবং নারীপক্ষের প্রকল্প পরিচালক রওশন আরা বলেন এ সময়ে ৪৩৭২টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে, কিন্তু সাজা হয়েছে মাত্র পাঁচ জনের।

সংস্থাটি বলছে, ঢাকা ছাড়াও অন্য যেসব জেলা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে – ঝিনাইদহ, জামালপুর, জয়পুরহাট, সিরাজগঞ্জ, নোয়াখালী ।

এই গবেষণাটি পরিচালনার জন্য নারীপক্ষের তরফ থেকে থানা, হাসপাতাল এবং আদালত – এ তিনটি জায়গা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ধর্ষণের ঘটনার পর বিচার প্রক্রিয়ার সাথে এ তিনটি জায়গা জড়িত। সাধারণত এ তিনটি জায়গায় নারীরা যায়। সেখানে তাদের সাথে কি ধরণের ব্যবহার করা হয় এবং মামলাগুলো কিভাবে দেখা হয় – এসব বিষয় উঠে এসেছে নারীপক্ষের গবেষণায়।

আইন এবং বিচার প্রক্রিয়া নারীর জন্য অবমাননাকর
ধর্ষণের মামলায় বেশিরভাগ অভিযুক্ত খালাস পেয়ে যাবার মূল কারণ সাক্ষীর অভাব।

কেন সাক্ষী পাওয়া যায়না – বিবিসির কাছে তার কিছু কারণ তুলে ধরেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সারা হোসেন।

“এখানে একটি বড় কারণ হচ্ছে, যিনি ঘটনার শিকার এবং অন্যান্য সাক্ষীরা যদি থেকে থাকেন, তারা অনেক সময় নানা ধরণের হুমকির সম্মুখীন হয়। সেই হুমকির ক্ষেত্রে তাদের কোন সুরক্ষা থাকেনা,” বলছিলেন সারা হোসেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং দণ্ডবিধিতে সাক্ষীদের রক্ষাকবচ সীমিত। কেউ ঘটনার শিকার হলে তার নাম প্রকাশ করা যাবেনা কিংবা প্রয়োজন হলে নিরাপদ জায়গার ব্যবস্থা করতে পারে আদালত। কিন্তু এর বাইরে তেমন কোন সুরক্ষার ব্যবস্থার নেই।

বাংলাদেশে এখনো ‘ধর্ষণ’ সংজ্ঞায়িত করা হয় ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি অনুযায়ী।

সারা হোসেন বলেন, “আমাদের আইনে এখনো বলা আছে যে একজন যদি ধর্ষণের অভিযোগ করেন, তাহলে বিচারের সময় তার চরিত্র নিয়ে নানান ধরণের প্রশ্ন করা যাবে।”

আইনে এ ধরণের বিষয় থাকার বিষয়টি নারীর জন্য বেশ অবমাননাকর বিষয় বলে উল্লেখ করেন নারী অধিকার কর্মীরা।

“আমাদের আইনে এখনো বলা আছে যে একজন যদি ধর্ষণের অভিযোগ করেন, তাহলে বিচারের সময় তার চরিত্র নিয়ে নানান ধরণের প্রশ্ন করা যাবে,” ব্যারিস্টার সারা হোসেন

আদালতের জেরা ‘দ্বিতীয়বার ধর্ষণের’ মতো।
ধর্ষণের মামলা নিয়ে যেসব নারী আদালতে দাঁড়িয়েছে তাদের অনেকেরই অভিজ্ঞতা খুবই খারাপ। অভিযুক্তের আইনজীবীর দ্বারা তারা এমন জেরার মুখে পড়েন যা তাদের মর্যাদাকে আরো ভূলুণ্ঠিত করে – এমটাই মনে করেন নারীপক্ষের রওশন আরা।

“আদালতে প্রশ্ন করা হয়, কেন তাকে রেপ করা হলো? কেন সে ওখানে গিয়েছিল? অন্যদের তো ধর্ষণ করা হয়নি, তাহলে তোমাকে কেন করলো? মানে দোষটা চাপানো হয় নারীর উপরে।”

সারা হোসেন বলেন, বিচারকের হাতে অনেক ক্ষমতা আছে। তিনি চাইলে এ ব্যাপারগুলো কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

“কেউ-কেউ করেন, কেউ-কেউ করতে পারেন না, কেউ-কেউ করেন না। একজন ধর্ষণের অভিযোগকারীকে তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে – এ বিষয়টা যেহেতু আইনে রয়েছে. সেখানে এ ধরণের প্রশ্ন আসলে বিচারক একেবারে থামিয়ে দিতে পারেন না। উনি হয়তো প্রশ্নের ধরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন, কিন্তু জেরা একেবারে থামিয়ে দিতে পারেন না।”

তিনি বলেন, এই আইন সংস্কারের জন্য বাংলাদেশের আইন কমিশনের তরফ থেকে সুপারিশও করা হয়েছে। কিন্তু সে বিষয়ে এখনো কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

সরকার কী বলছে?
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, ধর্ষণ সংক্রান্ত আইনের কিছু-কিছু বিষয় পরিবর্তন করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, নারী অধিকার এবং মানবাধিকার কর্মীরা যদি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবের মাধ্যমে আইনে পরিবর্তনের কথা বলেন তাহলে সে ব্যাপারে আলোচনা হতে পারে।

মি: হক বলেন, “আলাপ আলোচনা করে যেখানে দেখা যাবে এটা অবমাননাকর বা এটা থাকা উচিত না, এসব না রাখলেও একটা ধর্ষণের মামলা প্রমাণ করা যায়, তাহলে সেগুলো করতে আমাদের কোন বাধা নাই।”

সূত্র: বিবিসি বাংলা

Comments

comments